# 'বিশ্বকবিরসন্তানবাৎসল্য'
(১ম পর্ব)
✍ মৃদুল কুমার দাস।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহল ও বাহিরমহলে কত ঘটনারই না ঘনঘটা। সে যেন বিশ্ব ছাড়িয়ে মহাবিশ্ব পরিক্রমণ। তারই খন্ডাংশ নিয়ে এই পরিক্রমন। সমুদ্র থেকে এক আঁচলা জল তুললে বা সমুদ্রে শিশির পড়লে যেমন ব্যাপার লাগে, এও ঠিক তেমনি।
কবি মানে কোনো ভীন গ্রহের বাসিন্দা নন,এই মাটির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্বন্ধ। তবে স্রষ্টা যেমন জীবের সৃষ্টি করেন তেমনি কবি-সাহিত্যিকও সাহিত্যের স্রষ্টা। তাবলে কবি মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন নন। এই কথা বোঝাতে আমাদের বিশ্বকবি শিল্প সৃষ্টিকে 'বড় আমি' বলেছেন। আর পারিবারিক, সাংসারিক কবিকে 'ছোটো আমি' বলেছেন।
সেই হিসেবে রক্তে মাংসে গড়া এক মানুষের জীবনে সন্তান বাৎসল্যের স্থান কতটা জায়গা জুড়ে ছিল তা নিয়ে কৌতূহল নিরসন করার লক্ষ্যে এই ধারাবাহিক আলোচনা।
কবিও যে সাংসারিক এক পিতা, সংসারের সকল প্রকার জীবন রসরসিকতায় তিনি কতটা ও কীভাবে পূর্ণতা পেয়েছিলেন,এক নৈর্ব্যক্তিক ভাবনার মধ্যে গৃহী কবিকেও সন্তানদের নিয়ে নীলকন্ঠ হতে হয়েছিল কীভাবে, সেই কথায় এই আলোচনা।
সন্তানের দায়িত্ব কবির উপরেই বেশি বর্তে ছিল। কারণ স্ত্রী বিয়োগ বেশ তাড়াতাড়ি এসেছিল বলে। ঠাকুর বাড়ির অন্দরে মৃত্যুর একটা মিছিল ছিল। কবি মৃত্যুকে প্রথম দেখেছিলেন যখন বয়স চৌদ্দ বছর। মা সারদা দেবির মৃত্যু। ঐ বয়সে অবশ্য মৃত্যু সম্পর্কে ততটা বোধ জন্মায়নি। কিন্তু মৃত্যু যে কত ভয়ঙ্কর সেই প্রথম অনুভব করেছিলেন বৌঠান কাদম্বরীর দেবির আত্মহত্যা জনিত মৃত্যুকে ঘিরে।
তারপর একে একে ঘরে বাইরে এত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন যে শেষে মৃত্যুকে চরম সত্য জ্ঞাণ করবেন ও তা থেকে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠবেন। স্ত্রী মৃণালিনী দেবির মৃত্যু ১৯০২ সালে। বছর না ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় কন্যা রাণীকে হারালেন। তার ঠিক দেড় বছর পরে হারালেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ১৯০৭ সালে প্রাণাধিক প্রিয় ছোট ছেলে সমীন্দ্রনাথকে হারালেন কলেরা রোগে। ১৯১৮ সালে বড় মেয়ে বেলাকে। তারপরেই মীরার ছেলে প্রাণাধিক প্রিয় নাতি নীতিন্দ্রনাথকে। এ তো মাইল ফলকের মতো প্রিয়দের হারানোর কথা বললাম,এর মধ্যে ঠাকুর বাড়িতে আরো অনেকের মৃত্যু ঘটনা প্রায়ই লেগে থাকত।
কেন রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতেই কবির বড় দিদি সৌদামিনী দেবির স্বামী সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় জমিদারীর কাজে শিলাইদহে ছিলেন। সেখানেই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ আসে পরদিন। শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। তাই কবির পরদিন বাসি বিয়ের যাবতীয় অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে জন্ম ও মৃত্যুর আনাগোনা একটা রীতিমত গতিশীল একটা প্রক্রিয়া। তবে মৃত্যু তো আর আনন্দের খবর নয়। এই দুঃখটা একটা গা সহা ব্যাপার ছিল। একটা প্রাণ গেলে আরেকটার জন্য দিন গোনা চলত, এবার কার পালা। তাই তো কবি মৃত্যু নিয়ে এক গভীর দার্শনিক চেতনা অনায়াসে লাভ করেছিলেন। 'পরিশেষ' কাব্যের 'মৃত্যুঞ্জয়' কবিতাটি কবির মৃত্যুচেনার প্রকাশ ঘটেছে-
"আরো কিছু আছে নাকি
আছে বাকি
শেষ বজ্রপাত?"
আর 'আমার ধর্ম' রচনায় বলেছিলেন -
"জীবনকে সত্য বলে জানতে গেলে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার পরিচয় পাই।"
এই পটভূমির উপর দাঁড়িয়ে কবির সন্তান বাৎসল্যের মধ্যেও কিভাবে সুখ দুঃখে ভরা ছিল কবির জীবন।
স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ও কবির পাঁচ সন্তান। তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। সবার বড় মেয়ে মাধুরীলতা (বেলা), তার পরে ছেলে রথীন্দ্রনাথ। এবার দ্বিতীয় মেয়ে রেনুকা (রাণী)। তারপরে তৃতীয় ও কনিষ্ঠা কন্যা অতসীলতা(মীরা)। এর পরে এসেছিল ছোটো ছেলে প্রাণধিক প্রিয় সমীন্দ্রনাথ।
পত্নী মৃণালিনী দেবির অকাল বিয়োগের ফলে(১৯০২) কবির সন্তানেরা কবির মধ্যে মা ও বাবার স্নেহের সবটাই যেন উজাড় করে পেতে চাইত। কবিও যথাসাধ্য তাই দিতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখতেন না। কিন্তু কবিকে এক পরাজিত পিতার ব্যর্থতা সারাজীবন কিভাবে তাড়া করে বেড়িয়েছে। প্রথম আসব বড় মেয়ে মাধুরীলতার কথায়।
(ক্রমশ)
***********
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
পর্ব - দুই
✍মৃদুল কুমার দাস।
রবি বিলেত গেলেন আইন পড়তে। আইন পড়বেন কি পাশ্চাত্য সঙ্গীতে মজে গেলেন। আইন পড়া উঠল লাটে। সেখান থেকে গানের পসরা নিয়ে এমন ফিরলেন বাংলা গানের আঙ্গিকে রূপান্তর ঘটিয়ে দিলেন তো বটেই, সেই সঙ্গে বাংলা গানের জোয়ার বইয়ে দিলেন।
ওরকম সুপুরুষ, গানের অত সুন্দর গলা মেয়েদের মন চুরি হবে না সে কি হয়! কিন্তু ঠাকুর বাড়ির সংস্কারের বাঁধন ততোধিক শক্তপোক্ত ছিল। নিজের বিয়ের কনে দেখা নিয়ে খুব মজা করে ১৯৩৮ সালে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে গল্পটা বলেছিলেন -
এক মাদ্রাজি জমিদারের কবিকে পাত্র হিসেবে খুব পছন্দ। সেই জমিদারের অনুরোধে তাঁর মেয়ে দেখতে গেছেন ক'জন মিলে। দেখলেন অপরূপ সুন্দরী অল্প বয়সী দু'টি মেয়ে সামনে এসে বসেছে। একটি নেহাত সাদাসিধে। জড়ভরতের মত। অপরটি যেমন সূন্দরী তেমনি চটপটে। প্রচন্ড স্মার্ট। ইংরাজিতে চোস্ত। উচ্চারণ অতীব বিশুদ্ধ। ভালো পিয়ানো বাজানোর হাত। পিয়ানো বাজাল। মিউজিক নিয়ে কথাও হল। তারপর জমিদার ম'শায় মেয়েদের পরিচয় দিলেন ঐ সাদাসিধে মেয়েটি তার কন্যা,আর পিয়ানো বাজাল যে সে তার স্ত্রী। এর পরে মানসিক অবস্থা কি হতে পারে! কবি শুধু আপন মনে বললেন -
'... ভদ্রলোকদের ডেকে এনে এমন নাকাল করা কেন!'
সব পূর্ণতার মাঝে একটা অপূর্ণতা সন্তানদের নিয়ে, সেই কবে স্ত্রী বিয়োগ, তার উপর বিশ্বভারতী নিয়ে আর্থিক সঙ্কটে নাঝেহাল কবি এ সব রসিকতায় হতাশা কাটাতেন সহজ রসিকতার সুর দিয়ে।
এই ঘটনা নিয়ে নিজের সঙ্গে রসিকতা করতে এর আরো অনেক আগেই 'পুণ্যস্মৃতি'-তে বলেছিলেন - "সে বিয়ে যদি করতুম, তাহলে আজ কেউ কি কাছে দাঁড়াতে পারতে? সাতলাখ টাকা আয়ের জমিদারির মালিক হয়ে কানে হীরের কুন্ডল পরে মাদ্রাজে বসে থাকতুম। তা না, এখন two ends meet করাতে পারিনে, বসে বসে কবিতা লিখছি।"
কবির বিয়ের সম্বন্ধ এল যশোর থেকে। যশোরের দক্ষিণডিহি গ্রামের একটি পাড়া ফুলতলা। মেয়ের ডাকনাম ফুলি। ভাল বা পোশাকি নাম ভবতারিণী। বাবা বেণীমাধব চৌধুরী। জোড়াসাঁকোর সেরেস্তার কর্মচারী। মেয়ের ডিগ্রি বলতে ঐ পল্লীজীবনের রান্নাবান্না- ঘরকন্না-সেলাইফোঁড়াই- ব্রতকথা এই আরকি! বয়স বছর এগারো। পাত্রের বয়স বাইশ।
রবি ঠাকুরের বিয়ের সম্বন্ধীয় পাত্রীপক্ষের সঙ্গে তুলনা আকাশ পাতাল পার্থক্য। সামাজিক-আর্থিক কোনো দিক দিয়ে তুলনার মতো নয়। শুধু মিল বলতে উভয় পরিবার ছিলেন পিরালি ব্রাহ্মণ। ইন্দিরা দেবী একসময় বলেছিলেন তাঁর প্রিয় কাকার সম্পর্কে-
"রবিকাকার মতো অমন গুণবান, রূপবান, ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান (ভবিষ্যতের মতো অত না হলেও যথেষ্ট) যুবাপুরুষ,গুরুজনেরা যে মেয়েকে হাতে তুলে দিলেন,বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বিবাদে কি করে তাকেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলেন ও সুখে- স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর করতে লাগলেন, ভাবতে আশ্চর্য হতে হয়।"
অনুমান করা যেতেই পারে কবি ভেবেছিলেন মাদ্রাজের মেয়েটি হোক বা এই ফুলির মতো মেয়েদের যে কোনো একটি তাঁর ভাগ্যে তোলা আছে। এই ভেবে বিয়ে তো করতে হবেই,সে মেয়ে হলেই হল। আর বিয়ে শুধু তিনি করছেন না,গোটা পরিবারের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে। পরিবারের মতে সায় দেওয়ার কথাও তো ভাবতে হবে। এরকম একটা ভাবনা কবির মধ্যে আসা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না বলে মনে হয়।
যাই হোক এই বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন কবির মামা ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের পিসিমা আদ্যাসুন্দরী দেবী।
১৮৮৩ সালের ৯-ডিসেম্বর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে বিবাহবাসর বসে। আর এই জোড়াসাঁকোতে বিয়ে হয়েছিল কবির একরোখা দাবীতে। সে কথা মংপুতেই মৈত্রেয়ী দেবীকে বলছেন -
"আমি বলেছিলুম আমি কোথাও যাব না। এখানেই বিয়ে হবে।"
মৈত্রেয়ী দেবী জিজ্ঞেস করলেন - "সে কি আপনি বিয়ে করতেও যশোর যাননি?"
কবি সহাস্যে বললেন - "কেন যাব? আমার একটা মান নেই?"
পারিবারিক বেনারসী শাল ছিল একখানা। যার যখন বিয়ে হত, সেইখানি ছিল বরসজ্জার উপকরণ। নিজের বাড়ীতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে কবি বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে। বরযাত্রী জোড়াসাঁকোর অন্দরমহলের সকলে। আর কবিকে বরণ করেছিলেন নববধূর কাকিমা, যিনি 'বড় গাঙ্গুলির স্ত্রী' বলে সবার কাছে খুব পরিচিত ও প্রিয়জন ছিলেন। কবিকে অপূর্ব লাগছিল সেই বরসজ্জার শালখানিতে। আর বর বরণের সময় কাকিমার পরণে ছিল একখানা কালো রঙের ডুরে বেনারসী। কিন্তু আগেই বলেছি পরের দিন বাসি বিয়ের আনন্দ কবির কপালে আর জোটেনি কেন।
বিয়ের পর কবি স্ত্রীর নাম ভবতারিণীর পরিবর্তে মৃণালিনী নাম দিয়েছিলেন। নামটি দ্বিজেন্দ্রনাথের 'যৌতুক কি কৌতুক' কাব্যের থেকে খুব পছন্দের এই মৃণালিনী নামটি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর নবধূর নতুন করে পুঁথিগত শিক্ষা, ই়ংরেজি শেখার জন্য লরেটোতে ভর্তি হওয়া এসব কথা ইতিহাস খুব আপন করে তার ঘরে তুলে রেখেছে। এখানে আর এ নিয়ে আলোচনা বেশি বেশি না গড়ানোই ভালো। একপ্রকার অপ্রাসঙ্গিকও বটে। শুধু কবির সন্তানদের কথা বলা মূল লক্ষ্য। তা পালন করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে কবির বিবাহ পর্বের কথা এলাম একটা বাধ্যবাধকতার জন্যই। সন্তানের তো বাবা ও মায়ের বিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয় না, সন্তানেরা কেবল বাবা মার বিয়ের গল্প শোনে। তাই এখানে সেই বিয়ের গল্প করলাম।
প্রথম সন্তান মেয়ে। নাম মাধুরীলতা। কবিগুরুর আদরের বেলা,বেলি বা বেলুবুড়ি। নাকরণ করেছিলেন জ্ঞাণদানন্দিনী। গায়ের রঙ ফর্সা। অপূর্ব সুন্দরী। বেলা হল 'কাবুলিওয়ালা' গল্পের মিনি। মাধুরিও অল্প বয়সে বাবার মতো লিখিয়ে হয়ে উঠেছিলেন। বাবার অনুপ্রেরণা পেতেন। কিন্তু লিখতেন না। তাই কবিগুরু একদিন আফশোস করে প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের কাছে বলেছিলেন -
"ওর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু লিখত না।"
মাধুরীলতা পড়তে খুব ভালোবাসতেন। ছোটো বোন মীরা তাঁর স্মৃতিচারণায় বলছেন -
"রাত্তিরে শুতে যাওয়ার আগে হলঘরে বসে শরৎবাবুর সঙ্গে দিদি সংস্কৃত কাব্য নাটক পড়তেন। কখনও মেঘদূত,কখনও বা শকুন্তলা।"
মৃণালিনী দেবী তাঁর প্রিয় মহাকাব্য রামায়ণ অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন। বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অকাল মৃত্যুতে সেই কাজ থেকে গেল অসম্পূর্ণ। সেই অসম্পূর্ণ কাজ করতে কবি মাধুরীলতার কাছে অনুবাদের খাতাটি গচ্ছিত রাখতে দিলেন ও সেই সঙ্গে মৃণালিনী দেবীর অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে বলেছিলেন। সেই প্রমাণ পাই কবিকে মাধুরীলতার লেখা একটি চিঠি থেকে -
"মা সহজ করে রামায়ণ খানিকটা লিখেছিলেন, সেই খাতাটা বাবা আমাকে দিয়েছেন, তার থেকে এবার অনুবাদ করব।"
মাধুরীলতা সবসময় অন্তর্মুখী থাকতে ভালোবাসতেন। আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রচারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবু বাবার উৎসাহে অনেকগুলি গল্প লিখেছিলেন। যেমন- 'মাতাশত্রু', 'সৎপাত্র' প্রভৃতি। 'প্রবাসী' পত্রিকায় ছাপা হতো। কবি খসড়া দেখে দিতেন, সেই সঙ্গে প্রুফও।
সেই মেয়ের বিয়ে, শ্বশুরবাড়ি, সংসার... মা হারা মেয়েকে নিয়ে কবির সংসার কেমন ছিল সেই কথা নিয়ে আসব পরের আলোচনায়।
( ক্রমশ)
*********
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ৩য় পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
মাধুরীলতার বিয়ে হল চোদ্দতে পা দিয়ে। ১৯০১ সালের ১৫ জুন। পাত্র গীতিকবি( ভোরের পাখি) বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে শরৎকুমার চক্রবর্তী। বিবাহ সম্পন্ন হয় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রাত ন'টায়। বিয়ের দিন পনের আগে (৩০মে ১৯০১) জোড়াসাঁকোর লালবাড়ি 'গৃহপ্রতিষ্ঠা' অনুষ্ঠানে মাধুরীলতাকে কবি উপহার হিসেবে 'যৌতুক লাইব্রেরী' ( ইংরাজি, বাংলা, সংস্কৃতের দুর্লভ গ্রন্থসম্ভারের) দান করেছিলেন।
বিয়ের দিন জগদীশ চন্দ্র বসু লন্ডনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকে গিয়েছিলেন বলে আসতে পারেননি। তিনি স্নেহের উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন 'Joan of Arc', সঙ্গে একটি কবি-বন্ধুকে চিঠি কবি-কন্যাক আশীর্বাদ জানিয়ে। আর বিয়ের ছাব্বিশ দিন পরে জগদীশ চন্দ্র বসু আরেকখানি পত্রে লিখেছিলেন-
"তোমার মিনির বিবাহ হইল, কাবুলিওয়ালা তাহাতে উপস্থিত থাকিতে না পারিয়া অত্যন্ত দুঃখিত আছে।"
বড়বাড়ির বিয়ে বলে কথা। কিছু ঘটবে না তাই কি হয়! চোদ্দ বছরে বিয়ে এখন ভাবা না গেলেও তখন যেত। কবি তিন মেয়ের বিয়ে যৌবনে পা দেবে দেবে করতেই বিয়ে দিয়েছিলেন। এবং তারই পক্ষপাতী ছিলেন। আর এর পেছনে আরো একটা গুঢ়তর কারণও ছিল।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর মেয়েদের বিয়ের খরচ বাবদ পারিবারিক তহবিল থেকে প্রত্যেকের জন্য তিন হাজার টাকা বরাদ্দের নিয়ম করেছিলেন। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন এই নিয়ম চালু থাকবে। এই নিয়মের সুবিধা নিতে কবি মহর্ষির জীবদ্দশাতেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার উপর সুপাত্র পাওয়াও দুষ্কর ছিল। যতই কবির নাম ডাক হোকনা কেন। সেই সঙ্গে পিরালি খটকা একটা শিয়রে বোঝা হয়ে থাকত। তার উপর ব্রাহ্মপরিবার। আর যৌতুকতো আছেই।
মাধুরীর জন্য অনেক সাধ্যসাধনা করে উপযুক্ত পাত্র মিলল। পাত্র শরৎকুমার চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনের কৃতি ছাত্র ও ওকালতি পাশ করে মজঃফরপুরে প্র্যাকটিস করছেন। বিয়েতে শরতের বিধবা মা কাদম্বরী দেবী ( বিহারী লাল চক্রবর্তীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ও শরৎকুমার তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র) দশ হাজার টাকা বরপণ দাবি করলেন। কবির এতে সায় না থাকলেও কিছুই করার ছিল না। কারন পাত্র হাতছাড়া হলে আরো বেশি মুশকিল। তাই রাজি হতে বাধ্য হলেন। সুপাত্র বলে মহর্ষি প্রথা ভেঙে তিনের জায়গায় পাঁচ হাজার করলেন। আর কবি নিজের থেকে ব্যক্তিগতভাবে আরো পাঁচ যোগ করলেন। শরৎকুমার বরপণ নেওয়া একপ্রকার অন্যায় জেনেও পরিবারের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও যে করেছেন এমন প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি।
ব্রাহ্ম মতে বিয়ে হয়। তৎসহ প্রচুর শাড়ি,গহণা ও অসামান্য রূপ নিয়ে মাধুরী গেলেন বিহারের মজঃফরপুরে স্বামীর ঘরকন্না করতে। বিয়ের একমাস পরে কবি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে দিতে এসেছিলন।
মাধুরীর রূপে মজঃফরপুরের আবালবৃদ্ধবনিতার মুগ্ধতার শেষ নেই। তা উপর স্বয়ং কবিকে তাঁদের মাঝে পেয়ে সে কি আনন্দ! কবিকে সম্বর্ধণার ব্যবস্থাও পর্যন্ত করেছিলেন মজঃফরপুরের কবির ভক্তকুল। কবি এতো আপ্লুত হয়েছিলেন, কবির নিজেরই বাকহারা অবস্থা। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বছর বারো আগে এমন ঘটনা সত্যিই কবির কাছে ছিল এক দুর্লভ পাওয়া। আর সেই সঙ্গে মাধুরীও তার বাবাকে কথা দেন -
"তুমি আমাকে যা যা উপদেশ দিয়েছ তা আমি প্রাণপণে পালন করতে চেষ্টা করব। আমার স্বামী যে আমার চেয়ে সকল বিষয়ে শ্রেষ্ঠ এবং আমি যে তাঁর সমান নই,এটা বরাবর মনে রাখব। তাঁর ঘরের শ্রী যাতে বৃদ্ধি পায় , যথাসাধ্য তাই করব। এ বাড়ির মেয়ে বলে উনি আমাতে অনেক সদগুণ আশা করেন, তাতে যাতে নিরাশ না হন আমি সেই চেষ্টা করব।"
মাধুরীলতা মজঃফরপুরে প্রাণের সঙ্গী হিসেবে পেলেন অনুরূপা দেবীকে। তখনও অবশ্য অনুরূপা দেবী ততটা লেখিকা হিসেবে জনপ্রিয়তা পাননি। তবে দুই সখীতে মিলে বেশ রসেবসে ছিলেন। মাধুরীলতা সম্পর্কে অনুরূপা দেবী বলছেন -
" কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে পাইলাম, তখন নিতান্ত জবরদস্ত নিন্দুক দু'একজন মাত্র ছাড়া, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত ধনী-দরিদ্র পরিবারের প্রত্যেককেই সে জয় করিয়া লইয়াছিল। মাধুরীলতা বলিতে লোকে গলিয়া পড়ে, প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ হয়। মাধুরীর মা ছিলেন খাঁটি 'বাঙাল' দেশের মেয়ে। হয়তো সেই জন্যই তাঁর হাতের তৈরি সমস্ত খাদ্যই অতি পরিপাটি। মেয়ের সঙ্গে এবং পার্সেল করিয়া তিনি নিত্য নিত্য আচার,জেলি, নারকেলের খাদ্যদ্রব্য সর্বদাই পাঠাইতেন। মাধুরী কোনো জিনিসই পাঁচজনকে না দিলে তৃপ্তি পাইত না। মজঃফরপুরের অধিকাংশ বাঙালি ঘরের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় ঘটিয়াছিল। সুতরাং ভাগ-বাঁটোয়ারা তাঁহাকে ভালো করিয়াই করিতে হইত। তাঁর বাড়ির নিমন্ত্রণ তো লাগিয়াই থাকিত। স্বামীর বন্ধুদের নিজের হাতে নানারকম রান্না করে খাওয়ানো তাঁর একটা বিশেষ সখের মধ্যে ছিল।"
মজঃফরপুরে মাধুরীলতার মেয়েদের শিক্ষা দানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। মজঃফরপুরে সমাজসংস্কারে শরৎকুমারের অবদানের কথা ততটা না পেলেও তবে স্ত্রী মাধুরীলতার কাজে কোনোদিন বাধা দেননি। বরং উৎসাহ দিতেন।
তারই উপর ভরসা করে অনুরূপা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে জোড়াসাঁকোর আদলে নারী শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নেন। এজন্য একটা 'লেডিজ কমিটি' গড়ে তোলেন। দু'জনেই যুগ্ম সম্পাদিকা। তারপর একটা গার্লস স্কুল গড়লেন। নাম 'চ্যাপম্যান বালিকা বিদ্যালয়'। স্কুল গড়া হলেও ছাত্রী পেতে সে বেগ বলতে বেগ। ঠিক ভগিনী নিবেদিতার ছাত্রী জোগাড়ের সমস্যার মতো। পর্দানসীন মেয়েদের বাইরে আনা চাট্টিখানি কথা ছিলনা। অভিভাবক মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায় নাকি! সে অক্লান্ত প্রয়াস ভোলার নয়। মেয়েদের সামাজিক রীতিনীতি মেনে প্রথম প্রথম গাড়ি থেকে মেয়েদের নামিয়ে চাদরের আড়াল তৈরি করে একে একে স্কুলে ঢোকাতেন। এইভাবে একটু একটু করে মেয়েদের মধ্যে আড়ষ্টতা কাটিয়ে স্কুলকে স্ত্রী শিক্ষার উন্নয়নে জোয়ার যেই আসার উপক্রম হল,ঠিক তখনই মাধুরীলতাকে মজঃফরপুর ছেড়ে চলে আসতে হলো বাপের বাড়ি জোড়াসাঁকোতে। মজঃফর যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। সাধের বিদ্যালয়, স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের যে উদ্যম পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিতে হলো। বিহারে মেয়েদের শিক্ষা লাভ পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও খুব সঙ্গীন অবস্থা ছিল। বাঁকিপুরে অঘোরকামিনী, ভাগলপুরে রোকেয়া বেগম,আর মজঃফরপুরে মাধুরীলতা - বিহারে নারী শিক্ষায় তিন মহীয়ষীর কথা চিরস্মরণীয়। অঘোরকামিনী অনেকখানি সফল হলেও রোকেয়া বেগম (বোরখা সরিয়ে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষা যেন একটু বেশি তাড়াতাড়ি ভেবে ফেলেছিলন) ও মাধুরীলতার উদ্যোগ ততটা সাফল্যের মুখ দেখেনি। দু'জনকেই জন্মস্থানেই দ্রুত ফিরে আসতে বাধ্য হন।
মাধুরীলতাকে কেন এই চিরতরে মজঃফরপুর ছেড়ে চলে আসতে হয় তাই নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে।
(ক্রমশ)
************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ৪ র্থ পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
মাধুরীলতার স্বামী শরৎকুমার চক্রবর্তী বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবেন। কবি শ্বশুর ম'শায়ের খরচে। অবশ্য এতে কবিরই তাই ইচ্ছে ছিল। কারণ কবির বিলেতে আইন পড়তে গিয়ে আইন আর পড়া হয়নি। পরিবর্তে পাশ্চাত্য সঙ্গীতে সওয়ার হয়ে দেশে ফিরলেন। ফলে আইন পাঠ অধরাই থেকে গিয়েছিল। এখন জামাতা শরতের মধ্য দিয়ে সেই আশা স্বেচ্ছায় পূরণ করতে অভিলাষী হলেন।
মাসিক দশ পাউন্ড (তখনকার হিসেবে দেড়শ' টাকা নেহাত কম ছিল না) খরচে শরৎ গেলেন বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে। ১৯০৭এর ১১সেপ্টেম্বরে কলকাতা থেকে পি.এন.ও. কোম্পানির সুমাত্রা জাহাজে চেপে। আর নিঃসন্তান মাধুরীলতার শরীরে সেই সময় একটা কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে। ডাক্তাররা রোগের কারণ ঠিক ধরতে পারছেন না।
এই অবস্থায় মাধুরীলতার স্থায়ী ঠিকানা হল পিতার কাছে শান্তিনিকেতনে। ফলে মজঃফরপুর তাঁকে ছাড়তে হল। নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের স্মৃতি শান্তিনিকেতনে থাকতে থাকতে প্রথম প্রথম তাঁকে বড়ই ব্যথিত করত। কিন্তু নিরুপায় কঠিন ব্যবহারিক জীবনের বাস্তবতার কাছে। মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তবে পীড়িত শরীরেও সময়টা যে নেহাত মন্দ কাটছিল না- ছোট ছোটো ছেলেমেয়েদের পড়ানো ও পিতার সঙ্গ লাভের ফলে। সেই সঙ্গে পাশাপাশি বিধুশেখর শাস্ত্রী ম'শায়ের কাছে সংস্কৃত শেখাটায়ও তাঁকে বেশ খুশি দেখাতো। কবিও জানতেন তাঁর আদরের বেল বা বেলি বুড়ি পড়াশোনা পেলে আর কোনো কিছুরই অভাব বোধ করে না। এই সময়েও কবি তার বেলকে গল্প লেখার খুব উৎসাহ দিতেন। বেলও সেই উৎসাহে বেশ কয়েকটা গল্পও লিখে ফেললেন। আর আনন্দের খবর দিতে স্নেহের ভাই রথীন্দ্রনাথকে ( রথীন্দ্রনাথও তখন বিলেতে ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.sc. ডিগ্রির জন্য) প্রায়ই চিঠি লিখতেন শান্তিনিকেতনে তার কেমন কাটছে তা জানিয়ে। এমন একটি পত্রে লিখছেন -
"পড়ানো জিনিসটা আমার বেশ লাগছে,আর আমার ছাত্রদেরও বেশ লাগছে। কেন তা জানিস? বাবা এক টিন লজঞ্জুস আনিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা সেটা বেশ enjoy করে। যে দিন লজঞ্জুস বিলি করি - আমাকে আর বেশি দেখা যায় না - চারদিক থেকে ঘিরে ধরে আমাকে একেবারে অস্থির করে তোলে - আমার পড়ানো (তখন) একেবারে বন্ধ।"
জামাতা শরৎকুমার বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়ে ফিরলেন ১৯০৯ সালের এপ্রিল মাসে। প্র্যাকটিস শুরু করলেন কলকাতা হাইকোর্টে।
এবার মাধুরীলতাকে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদান পর্বে ইতি টেনে আসতে হলো জোড়াসাঁকোর লালবাড়িতে। ওখানে থাকার ব্যবস্থা হল। বাড়িটা মাধুরীর বিয়ের দিন পনর আগে যে উদ্বোধন হয়েছিল তারপর থেকে একপ্রকার ফাঁকাই পড়েছিল। মেয়েদের শ্বশুর বাড়ির ঠিকানাকে কবি যেন নিজের ঠিকানায় মেয়েকে টেনে নিলেন। সেই সঙ্গে ছোটো মেয়ে মীরা ও জামাতারও এই লালবাড়িতেই সংসার পাতার দায় কবি নিজের কাঁধে তুলে নেন। কারণ তাঁদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে কবির মনে হতো তাঁরা বড়ই অনাথ। কবি ছাড়া তাঁদের কেউ নেই। কবিই তাঁদের মা,কবিই তাঁদের বাবা। তাই কাছে রেখে বড়ই আশ্বস্ত লাভ করতেন। শরতের সংসার রোজগারপাতি নিয়ে অধ্যাপক ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে বলেছিলেন -
"...শরৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে আমার সংসারের একটা দিকের চিন্তার অবসান হবে। "
সংসারের আরেকটা দিক ছিল ছোট মেয়ে মীরা ও জামাতা নগেন্দ্রনাথাকে নিয়ে। তাঁরা থাকতেন দোতলায়। মেজ রানুর সংসারের দায়ও কবি নিয়েছিলেন। কিন্তু রানুর স্বল্পায়ুর জন্য তাঁকে নিয়ে কবিকে ততটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। সেকথায় অব্যবহিত পরেই আসছি।
মাধুরীলতা জোড়াসাঁকোর লালবাড়িতে ছিলেন ১৯০৯ থেকে ১৯১৩- এই পাঁচ বছর। কবি তখন নানা কাজে বিদেশের এখানে ওখানে। এই সময় জোড়াসাঁকোর তদারকির দায়িত্ব দিয়েছিলেন ছোটো জামাই নগেন্দ্রনাথের উপর। নগেন্দ্রনাথ কেমন ধাতের সে কথায় মীরার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন নিয়ে আলোচনার সময় আসব।
তবে নগেন্দ্রনাথের ব্যবহারে শরৎ ও মাধুরীলতা খুব আঘাত পেতেন। তা থেকে দুই বোনের মধ্যে ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে প্রায়ই খটামটি লাগত।
কবির কানে তা পৌঁছত সহজেই। কবি খুব কষ্ট পেতেন। শেষে সহ্যের সীমা একদিন ছাড়িয়ে গেল। ১৯১২ সালে কবি বিদেশ থেকে সবে ফিরেছেন। সব ঘটনা শুনে একটি ইচ্ছাপত্র তৈরি করলেন। উক্ত পত্রে মাধুরীর জন্য মাসিক পঞ্চাশ টাকা ও ছোটো মেয়ে মীরার জন্য একশ' টাকা বরাদ্দ করলেন। মীরার তুলনামূলকভাবে আর্থিক অবস্থা মাধুরীলতার চেয়ে একটু খারাপ বলে মীরাকে পঞ্চাশ টাকা বেশি দিয়েছিলেন। তাই নিয়েও দুই বোনের মধ্যে সম্পর্ক আরো খারাপের দিকে গড়ায়। তার উপর নগেন্দ্রনাথের ঠাকুরবাড়ির উপর ম্যানেজারির দৌরাত্ম দিনকে দিন একটু বাড়াবাড়ি হতে থাকল। ঠাকুরবাড়ির অনেকেই অসন্তুষ্ট নগেন্দ্রনাথের উপর। মাধুরী ও শরত ক্রমেই নগেন্দ্রনাথের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ট। শেষে তাঁরা বাধ্য হলেন লালবাড়ি ছাড়তে। তাঁরা উঠে গেলেন ডিহি শ্রীরামপুরের বাড়িতে।
এই সময় মাধুরীলতা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এমনিতেই মাধুরীলতা শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। তার উপর সন্তান ধারণের ধকলে শারীরিক অবস্থা দিনকে দিন আরো শোচনীয় হয়ে পড়তে লাগল। তাই শিশুটিরও অকাল মৃত্যু ঘটল।
এর পরিণামে মাধুরী ও শরতের সকল অভিমান কবির উপর গিয়ে পড়ল। কোনোদিন আর সেই অভিমান শরৎ ও মাধুরীলতার ভাঙেনি। মাধুরীর আরো দিনকে দিন মানসিক ও শারীরিক অবস্থা শোচনীয় হতে থাকে। শেষে নিশ্চিত হওয়া গেল মাধুরীলতা যক্ষ্মা নামক রাজরোগে আক্রান্ত। অনুরূপ রোগে ইতিপূর্বে তার পরের বোন রেনুকার মৃত্যু ঘটেছে। এবার তার পালা। মৃত্যু অনিবার্য। কবিও নিশ্চিত হয়ে গেলেন তার বেলিকে আর ধরে রাখা যাবে না। এক পত্রে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখছেন-
"জানি বেলার যাবার সময় হয়েছে। আমি গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতে পারি এমন শক্তি আমার নেই।"
শরৎকুমার কবির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাইলেন না। এমনকি বিশ্ববিখ্যাত শ্বশুর মশাইয়ের সম্মানটুকুও তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। কবির সঙ্গে সাক্ষাত করতে অনীহা প্রকাশ করতেন শরৎ। যদিও এক আধবার কোনো ক্রমে মেয়েকে দেখতে গিয়ে শরতের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার সময় শরতের দুর্ব্যবহার কবিকে খুব মর্মাহত করত। হেমলতা দেবী মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন -
"অত আদরের মেয়ে বেলা তার মৃত্যুশয্যায়,সব অপমান চেপে দেখা করতে যেতেন। শরৎ তখন টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট খেত। পা নামাত না পর্যন্ত - এমনি করে অপমান করত। উনি সব বুকের মধ্যে চেপে মেয়ের পাশে বসতেন, মেয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকত।"
কবির জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন এই অপমান এড়াতেই কবি রোগশয্যায় বেলাকে দেখতে যেতেন দুপুরে, যখন শরৎকুমার থাকতেন আদালতে।
মাধুরীর আয়ু আর বেশি বাকি নেই। কবিকে বেলার শেষ শয্যায় পাশে বসে থাকতেই হয়। বিছানার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বেলা। তিল তিল ক্ষয়ে যাওয়া রুগ্ন শরীরের শীর্ণকায় দুখানি হাত দিয়ে কবিকে আঁকড়ে ধরে সেই ছোট্টবেলার মত বলে -
" বাবা গল্প বলো।" এই কিছুদিন আগে মেজো মেয়েও মৃত্যুর সময় একই ভাবে বলেছিল "বাবা গল্প বলো"- সেই শোক ধূসর হতে না হতে আবার একজনের গল্প শোনার বায়না পূরণ করতে হবে! গল্পের ঝুলি যে বাড়ন্ত! কবির কন্ঠ রুদ্ধ। বুঝি আর গল্প সরে না। মাধুরী চলে গেলেন নিঃশব্দে। এমনও বলা হয় মেয়ের মৃত্যুর দিন আর মুখ না দেখে শোকে দুঃখে সিঁড়ি থেকেই ফিরে গিয়েছিলেন কবি। সেদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ছিল এক জরুরি সভা। বেলার মৃত্যুতেও সভা নাকচ করেননি। মৃত্যুর কথা অন্তরে চেপে রেখে সভা সারলেন। সভাস্থ অভ্যাগতগণের কাছে কোনো রূপ শোক প্রকাশ তো দূরের কথা, কেউ জানতেই পারলেন না কতবড় একটা বেদনা নিয়েও সুষ্ঠুভাবে সভা সম্পন্ন করে গেলেন কবি। সভার শেষে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী কবিকে জিজ্ঞেস করছেন -
"আজ কন্যার অবস্থা কেমন?"
কবির সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল -
"সে আর নেই।"
এক সন্তান হারা পিতার আর্তিতে যেন শুধু ব্যর্থতার হাহাকার। অনুশোচনায় নিঃস্তব্ধতা। মাধুরীর দাম্পত্য জীবনের যত দুঃখের দায় যেন নিজের। সেই আত্মদর্শনের বীজ বপন করেছিলেন 'হৈমন্তী' নামক ছোট গল্পে।
জানা যায় শরৎকুমার স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে চিরতরে চলে যান মজঃফরপুরে। সেখানে একটা নীলকুঠি কিনে গাছপালা, বাগান শোভিত এক মনোরম পরিবেশে নিরালায় একাকী বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেন তিনি।
( চলবে )
***************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ৫ম পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
দ্বিতীয় সন্তান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর স্ত্রী প্রতিমা দেবী,কবির পালিতা কন্যা। এঁদের কথায় পরে আসব।
এখন তৃতীয় সন্তান তথা দ্বিতীয় কন্যা রেনুকা তথা রাণীর কথায় আসি। রেনুকার জন্ম ১৮৯১ এর ২৩- জানুয়ারী। কবির একদিকে কন্যা রেণুকা আর অন্যদিকে সদ্য 'মানসী' কাব্য প্রকাশিত হওয়ার আনন্দে মন একেবারে ডগমগ। প্রমথ চৌধুরীকে এক চিঠিতে কবি তাঁর আনন্দের কথা বলছেন -
"মানসী জন্মাবার পর আমার ঘরে আর একটি শরীরী জন্মগ্রহণ করেচে,সে খবর বোধহয় এতদিনে পেয়েছ - অতএব আমাকে যথানিয়মে Congratulation করতে বিলম্ব করবে না।"
রাণী কবির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ছোটোবেলা থেকে বেশ দুরন্ত প্রকৃতির। জেদি, একরোখা ধরনের অথচ মন ছিল এক অদ্ভুত রকমের সংবেদনশীল ও কল্পনাপ্রবণ। ঠাকুর বাড়ির আবহাওয়া থেকে যেন একেবারেই আলাদা। গ্রন্থানুরাগী, পিতৃভক্তিতে একনিষ্ঠা হলেও সব ব্যাপারে একটা ঔদাসীন্য তাঁকে ঘিরে থাকত। তাই অনেকের কাছে বড়ই দুর্বোধ্য ঠেকতেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন উর্মিলা দেবী তাঁর সম্পর্কে পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন -
"রাণী এক অদ্ভুত মেয়ে ছিল। কি যেন এক সন্ন্যাসিনীর মন নিয়ে এসে জন্মেছিল এই ঐশ্বর্যের মধ্যে। বিধাতার অনেক অদ্ভুত খেয়ালই বোঝা যায় না তো! খুব যে সুন্দর দেখতে ছিল তা নয়, কিন্তু চোখদুটির মধ্যে এমন একটি ভাব ছিল যে,তা থেকে চোখ ফেরানো যেত না। শিশুকাল থেকে তার সাজগোজ ভালো লাগত না। চুল বাঁধা তো একটা বিরক্তিজনক ব্যাপার ছিল। খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধেও তার ঔদাসীন্যের অন্ত ছিল না। মাছ-মাংস খাওয়ার স্পৃহা ছিল না। কিন্তু জেদ ছিল প্রচন্ড। সে যখন এক দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়াত, তখন কারো সাধ্য ছিল না তাকে দিয়ে কিছু করায়। এ জন্য শাসন সে যথেষ্ট পেত। তার মা তো একেবারে অস্থির হয়ে পড়তেন এক এক সময়ে - 'কি যে সৃষ্টিছাড়া মেয়ে জন্মেছে,আর পারিনে বাপু!' এক এক সময় বলতেন।"
একমাত্র দাদা রথীন্দ্রনাথের প্রতি অধিকার মাত্রাতিরিক্তভাবে প্রকাশ করতেন রেনুকা। বিশেষ করে রথীন্দ্রনাথ যদি চুপচাপ শুয়ে থাকতেন, তখন রাণী তার গায়ের উপর দুমদাম পড়তেন,চুল ধরে টানতেন, মুখে চুমু খেতেন - একপ্রকার অস্থির করে তুলতেন রথীন্দ্রনাথকে। রথীর শান্তিতে ঘুমোনোর উপায় ছিল না। যখন রাণীর নির্বিচারে উৎপাত চলত তখন দাদা রথীন্দ্রনাথ স্নেহের সুরে বলতেন -
" রাণী আমাকে একটু ঘুমোতে দে।"
আর ছাদের উপর যদি কোনোপ্রকারে উঠতে পারতেন তাহলে সারা ছাদময় তেজি ঘোড়ার মতো দৌরাত্ম করে বেড়াবেন। তবে এই একরত্তি দস্যি মেয়েটারো মধ্যে একটা কোমল প্রাণের ফল্গু স্রোতোধারা বইত। রান্নাঘরে দুটো ইয়া বড় কাৎলা মাছ দেখে সকলে যখন উৎফুল্ল তখন রাণী সেই মাছ দেখে বলে ওঠেন -
"ও মা মাগো,এই মাছ তোমরা খাবে? ওরা যে এখনোও বেঁচে আছে" - দু'হাত মুখে ঢেকে সে কি কান্না।
আর একবার ঠাকুরবাড়ীর পোষা পাখি মারা যাওয়ার জন্য রাণীর সে কি ঘুমরে গুমরে কান্না!
বেলা তথা মাধুরীলতার বিয়ের মাত্র চব্বিশ দিন পরে রাণীর বিয়ে দেন কবি। বরের নাম সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ডাক্তার এল.এম.এফ.পাশ। তাঁর বিলেতের ডিগ্রি খুব দরকার। কবি-কন্যার পাণি গ্রহণে রাজী। শর্ত ছিল আমেরিকায় দু'বছরের জন্য হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি পড়তে পাঠাতে হবে।
কবিরও মনে মনে এমন মিশন ছিল এ হেন কাউকে বিলেতে পাশ করিয়ে এনে শান্তিনিকেতনে শিক্ষা দানের কাজে লাগাবেন।
কবির আবার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি অগাধ আস্থা। শান্তিনিকেতনের আশপাশের গ্রাম থেকে কবির কাছে অনেক রোগী আসত। সব বিনি পয়সার রোগী। কবি বই পড়ে পড়ে তাদের ওষুধ দিতেন। এই করে কবির বেশ ভালই নাম যশ হয়েছিল। এক ইরিসিপেলাস তথা মারাত্মক বিসর্প রোগ,যা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন রোগীকে বাঁচানো যায় না। দরকার হাই ডোজের সিরাম ইঞ্জেকশন। কবি রোগীকে বই মিলিয়ে কয়েক মাত্রা ওষুধ দিলেন। সেই মরণাপন্ন রোগী কবির ওষুধে পুরোপুরি সেরে উঠল। এই ছিল কবির সখের চিকিৎসা। হোমিওপ্যাথিতে প্রবল আস্থা। কেউ হোমিওপ্যাথি পড়াশোনা করছে শুনলে কবির খুশির শেষ হত না। আর সত্যেন্দ্রনাথ হলেন কবির সেই খুশীর স্বপ্ন পূরণের বাজী।
এরকম একজনকে খুঁজছিলেন কবি। সত্যেন্দ্রনাথকে পেয়ে কবির যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা হল।
এই বিয়ের ঘটক ছিলেন প্রেমতোষ বসু। কবির 'ক্ষণিকা' কাব্যের মুদ্রক ছিলেন এই প্রেমতোষ বসু। সেই সূত্রে যোগাযোগ। এই যোগাযোগে বাড়ীর কাকপক্ষীও টের পায়নি।
রাণীর বয়স তখন ১০ বছর ছ'মাস ১৭ দিন। এগারো বছর হতে ক'টা দিন বাকি। মাত্র এইটুকু বয়সে বিয়ে! মৃণালিনী দেবী তো অবাক হয়ে বললেন -
" তুমি বল কি গো? এরই মধ্যে মেয়ের বিয়ে দেবে তুমি ? "
কবি বললেন -
"ছেলেটিকে আমার বড্ড ভালো লেগেছে ছোটো বউ। যেমন দেখতে সুন্দর তেমনি মিষ্টি অমায়িক স্বভাব। রাণীটা যে জেদি মেয়ে,ওর বর একটু ভালোমানুষ গোছের না হলে চলবে কেন? আর সত্যেন বিয়ের দু'দিন পরেই বিলেত চলে যাবে। সে ফিরতে ফিরতে রাণী বেশ বড় হয়ে যাবে।"
রাণীর বিয়ে হয়ে গেল ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দের ৯ আগষ্ট। রাণী এই বিয়েতে মত দিয়ে ছিলেন বিয়ের পর বর বিলেতে চলে যাচ্ছেন বলে।
রাণীর বিয়েতে কবির বড্ড তাড়াহুড়ো ছিল। মাধুরীর বিয়েতে যে হৈ হুল্লোড় হয়েছিল এখানে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। রাণীর বিয়েটা যেন 'ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে'। পাঁচজন বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়স্বজনকে নেমন্তন্ন করার পর্যন্ত ফুরসৎ দেননি। তিন দিনের ব্যবস্থাপনায় একেবারে চুপচাপ বিয়ে হয়ে গেল।
শর্তানুযায়ী বিয়ের দু'দিন পরে সত্যেন্দ্রনাথ চলে যাবেন আমেরিকায় ডাক্তারি পড়তে। এজমালি থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে জাহাজের ভাড়া, পোশাক ও অন্যান্য টুকিটাকি সব ব্যবস্থা করে জাহাজে তুলে দিলেন কবি। সত্যেন্দ্রনাথ জাহাজে রওনা দেওয়ার পর কবি দেখলেন - বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট সহ দরকারি সব কাগজপত্র ছেড়ে গেছেন। কবির উদ্যোগে ডাকযোগে সেগুলো সব পাঠানো হয়।
সত্যেন্দ্রনাথ আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, কিন্তু আস্তানা গাড়লেন লন্ডনে। লন্ডনে থেকেই অধ্যয়ন করতে থাকেন। কবি জামাতার নিয়মিত খবর পেতেন দুই প্রবাসী বন্ধু জগদীশ চন্দ্র বসু ও প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে।
অচীরেই সেখান থেকে ব্যর্থতার দায় নিয়ে খালি হাতে ফিরে এলেন সত্যেন্দ্রনাথ। সত্যেন্দ্রনাথ কিছুই হতে পারলেন না।
কবির অচিরেই বোধোদয় হল সত্যেন্দ্রনাথ আদতে আত্মবিশ্বাসহীন,সঙ্কল্পহীন বাউন্ডুলে গোছের। কিন্তু জামাতা বলে কথা। কন্যার সুখের জন্য কবি নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিলেন। জামাইকে জীবিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক অর্থ ব্যায়ে ডিসপ্যানসারী ও আসবাবপত্র কিনে দিলেন। কিন্তু কোনো কাজের কাজ হলো না। শেষে শান্তিনিকেতনের কাজে লাগালেন।
তাতেও কবির লক্ষ পূরণ হলো না। সত্যেন্দ্রনাথের বাউন্ডুলে মন। তাকে কি আর সংসারের প্রয়োজনে বাঁধা যায়! না কেউ বাঁধতে পারে! হঠাৎ একদিন সত্যেন্দ্রনাথ বেরিয়ে পড়লেন পাঞ্জাব প্রদেশ ভ্রমণে। আশ্চর্যের বিষয় সেখানেও কবিকে টাকা পাঠাতে হয়েছিল।
এই সমস্ত ঘটনাবলি- মায়ের মৃত্যু, স্বামীর বিলেত থেকে ফেরা ও উপর বাউন্ডুলেপনার জন্য কবির ব্যায়ভার বহন রাণীর মনের উপর প্রবল চাপ পড়ে। নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। মারণ ব্যাধি যক্ষ্মা রোগ শরীরে বাসা বাঁধল। অসুস্থতার সময় রাণীর পাশে সত্যেন্দ্রনাথ থাকবে কি এইভাবে বাউন্ডুলে হয়ে ঘোরাটা রাণীকে আরো বেশি মর্মাহত করল।
অবশেষে কবিই কন্যাকে নিয়ে ১৯০৩ এর জুলাইয়ে চললেন হাওয়া বদলের জন্য হিমালয়ের আলমোড়ায়। আলমোড়ার পাইনের হাওয়া যক্ষ্মা রোগ উপশমের পক্ষে বড্ড উপকারী বলে। কিন্তু কোনো কাজের কাজ হলনা। শেষে রাণীর বারবার অনুরোধে কবি ফিরতে বাধ্য হলেন। ফিরেই অকালে রেনুকা পরপারের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯০৩ এর ১৯ সেপ্টেম্বর চিরতরে চলে গেলেন। মৃত্যুকালে বয়স মাত্র ১২ বছর ৭ মাস। তখনো স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু শোকে অশান্ত হৃদয়ের উপর ঐটুকু মেয়ের কি-ই বা জীবন! তাকেও বিদায় দিতে কবির মন একেবারে নিস্তব্ধ নিথর - যা সত্য তাকে সহজে মেনে নেওয়ার জন্য জোর ঠেলা অনুভব করলেন অন্তর থেকে।
রেনুকার মৃত্যু হলেও কবিকে সত্যেন্দ্রনাথ ছেড়ে গেলেন না। কবিরও কেমন মায়া পড়ে গেছে সত্যেন্দ্রনাথের উপর। শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দানের কাজে লাগালেন। রেনুকার স্মৃতি ভোলাতে বিপত্নীক সত্যেন্দ্রনাথের বিয়ের সম্বন্ধ করলেন পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ির সতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বালবিধবা কন্যা ছায়াময়ীর সঙ্গে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সত্যেন্দ্রনাথ ও ছায়ার বিয়ে দিলেন ১৯০৮এর ১৮ জুন। এই বিয়েতে কবি প্রয়াতা কন্যা রেণুকার সব গহণা দিয়েছিলেন ছায়াকে।
বিয়ের পর সত্যেন্দ্রনাথ ছায়াকে নিয়ে শান্তিনিকেতন ছেড়ে কাশীতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় প্রবৃত্ত হন। কিন্তু সেখানেও ততটা পসার জমাতে পারলেন না। অক্টোবরে পূজোর ছুটির আগে শান্তিনিকেতনে সত্যেন্দ্রনাথ এলেন 'সারদোৎসব' নাটক দেখতে। অভিনয় দেখার পর সেই ছুটিতে সত্যেন্দ্রনাথ- ক্ষিতীন্দ্রমোহন সেন,দীনেন্দ্রনাথ প্রমুখের সঙ্গে পশ্চিম ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। ভ্রমণকালে দীনেন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ জ্বরে পড়লেন। অসুস্থ অবস্থায় সত্যেন্দ্রনাথ ফিরে এসে ১৯০৮ এর ২৬ অক্টোবর মারা গেলেন। ছায়ার আবার অকাল বৈধব্য!
( ক্রমশ)
****************
# "বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য
( ৬ ষ্ঠ পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
কবি জীবনে মাত্র এগারো বছরের আয়ুষ্কাল নিয়ে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ এসেছিলেন। কনিষ্ঠ পুত্র শমীর বিরাট আশা নিয়ে আসা ও নীরবে চলে যাওয়া - আরেকটি প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর বজ্রাঘাতে কবি নিথর হয়ে আবার স্বগতোক্তি করেছিলেন -
'সত্যরে লও সহজে।'
শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর একেবারে কবির আদল পেয়েছিলেন। গৌরবর্ণ। দিব্যকান্তি। যেন হুবহু রবিঠাকুর। ইন্দিরা দেবীর কথায় জানতে পারি-
"লোকে বলে যে,রবিকাকার ছোটো ছেলে শমীন্দ্রই বেশি তাঁর মত দেখতে ছিল।"
শমী অল্প বয়সেই বিসর্জনের মতো শক্ত নাটকের কবিতাও অনর্গল মুখস্থ করে বলতে পারতেন। শান্তিনিকেতনে দাদারা 'বিসর্জন' নাটক করছে দেখে শমীও জেদ ধরেন দু'তিনটা পাঠ করবে, যেখানে কবিতা অংশ আছে। সেই অভিনয় দেখে সকলেই তো কি মুগ্ধই না হয়েছিলেন। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন বড় হলে বাবার মত ভালোই অভিনেতা হবেন। রবিকাকার উপাসনা ঢংটিও হুবহু নকল করতেন। হেমলতা দেবি বলতেন -
"বাপের টেবিলে বসে তাঁর মতো লেখক হবার অভিনয় করত।"
কবির 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতাটি জ্যাঠাম'শাই জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর শমীকে আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন। কবিতাটি অপূর্ব নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করার অনায়াস দক্ষতা লাভ করেছিলেন শমী ঠাকুর। বিশেষ করে হাতের যখন ভঙ্গি করে 'কেষ্ট বেটাই চোর' বলতেন , সেই বলাটাতে এতো নাটকীয় ভঙ্গি থাকত যে সকলে না হেসে পারতেন না।
কবিও তাঁর স্মৃতি কথায় জানিয়েছেন - "ওর জন্য অনেক কবিতা লিখেছি। শমী বলত, বাবা গল্প বলো। আমি এক একটা কবিতা লিখতুম আর ও মুখস্ত করে ফেলত,সমস্ত শরীর মাথা ঝাঁকিয়ে আবৃত্তি করত। ঠিক আমার ছেলেবেলার মতো। ছাতের কোণে কোণে ঘুরে বেড়াত। নিজের মনে কতরকম ছিল ওর খেলা। দেখতেও ছিল ঠিক আমার মতো।" প্রশান্ত চন্দ্রকে এই কথাগুলো বলতে বলতে কবির কন্ঠ ভারী হয়ে এসেছিল, চোখের কোণে জল।
শমী ঠাকুর বাবার কতো গান গলায় তুলে নিয়ে প্রায় গেয়ে গেয়ে বেড়াতেন আপন মনে। বিশেষ করে স্কুলে যাওয়ার পথে গলা ছেড়ে সে কি গান গাইতে গাইতে স্কুলে যেতেন। শমী ঠাকুরের গান সম্পর্কে সুধাকান্ত রায়চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন -
".... শমীন্দ্রনাথ তাঁর পিতৃদেব আমাদের আশ্রমগুরু শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের অনেক সদ্গুণ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি যেমন সুন্দর নির্মল স্বভাব ছিলেন তেমনি আবার সারা দেহে এক সৌন্দর্য ও লাবণ্য জড়িত ছিল। কন্ঠ্যস্বরও কোকিলের ন্যায় মধুর ছিল। আমার বেশ মনে পড়ে সে সময়কার সঙ্গীত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত অজিতকুমার চক্রবর্তী মহাশয় তাঁহাকে একদিন একটি সঙ্গীত করিতে বলেন। আমাদের কয়েকজনকে নতূন দেখিয়া প্রথমত তিনি যৎসামান্য সঙ্কোচ বোধ করেন। কিন্তু কিয়ৎক্ষণ পরেই সুমধুর কন্ঠে গুরুদের রচিত 'পূর্ণ প্রাণ প্রাণেশ' সঙ্গীতটি গাহিলেন,তৎপরেই পুনরায় 'বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা' গাহিলেন। তৎপূর্বে কোনো বালক কন্ঠে তেমন মধুর সঙ্গীত শুনি নাই...."
শমী ঠাকুর শান্তিনিকেতনে একবার লাইব্রেরীর বই গোছাতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য প্রবল জ্বরে পড়েন। জ্বরের ক্লান্তি দূর করতে- 'এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ' - এই গানটি গেয়েছিলেন। তারপরেও এই গানের অত্যন্ত উৎসাহে গোটা শান্তিনিকেতন জুড়ে গানটি গেয়ে গেয়ে বেড়াতেন। শমী ঠাকুরের অকাল বিয়োগে এই গানটি তাই কবির কাছে একটা অনন্য মাত্রা পেয়েছিল।
এছাড়া শমীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কবি পেয়েছিলেন একটি বাদামী মলাটের নোটবুক বা গানের খাতা। মলাটের উপরে লেখা 'বন্দেমাতরম্'। খাতা ভর্তি বাবার গান। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ যে সব গান বেঁধেছিলেন তার মধ্যে এগারোখানা গান শমী লিখে রাখেন তাঁর গানের খাতার পাতায় পাতায়। যেমন-
'সার্থক জনম আমার', 'আমার সোনার বাংলা', 'ও আমার দেশের মাটি', 'নিশিদিন ভরসা রাখিস', 'যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা' ইত্যাদি। প্রতিটি গানের শেষে পিতার অনুকরণে স্বাক্ষর করেছিলেন 'শমীন্দ্রনাথঠাকুর'।
শমীর ঐ কতটুকু বয়সে রসবোধ কি অতুলনীয়! শমীকে জিজ্ঞেস করা হতো -
" শমী কাকে সবচেয়ে ভালোবাসিস?"
তিনি উত্তর দিতেন - "বলব? কাউকে বলবে না তো? বা আ আ আ বা আ আ আ।" সবসময় মুখে মিষ্টি হাসি লেগে থাকত। সেই সঙ্গে এক অপূর্ব সৌম্য মূর্তি তার চারধারে বিরাজ করত।
ঐটুকু বয়সে আত্মমর্যাদা বোধ বা আত্মসম্মানবোধ কি প্রখর ছিল! প্রমাণ শিলাইদহের কাছারিবাড়িতে দাদা রথীন্দ্রনাথকে দেখে প্রজারা উঠে দাঁড়িয়ে সমীহ দেখাল যেভাবে শমীকে দেখে প্রজারা তো ততটা সমীহ দেখাল না। তাই নিয়ে মা মৃণালিনী দেবীর কাছে গিয়ে অভিযোগের সুরে শমী বললেন -
"মা, দাদাকে দেখে অনেকেই কাছারিতে দাঁড়ায়,আমায় দেখে কেন দাঁড়ালো না - আমি আর কাছারিতে যাবো না।"
শমীর একটা পোষা কুকুর ছিল। তার নাম রেখেছিল বাঘু। সদাই শমীর সঙ্গী হতো বাঘু। বলতে গেলে ছায়াসঙ্গী। বাঘু একটু চোখের আড়াল হলেই শমীর প্রাণ ছটপট করত। পোষ্যকে না খাইয়ে নিজে খেতেন না।
শমী যখন উপাসনা করতে যেতেন - বাঘু চলত পিছনে পিছনে। যখন শমী উপাসনায় ঘোরতর নিমগ্ন,তখন বাঘু চুপচাপ বসে থাকে প্রভুর দিকে তাকিয়ে।
একদিন হয়েছে কি একটা দুষ্টু গোছের ছেলে স্বভাব চপল ভঙ্গিতে বাঘুর গায়ে দিয়েছে একটা আস্ত ইঁট ছুঁড়ে। বাঘু ইঁটের আঘাতে ভালই জখম হলো। ঐ ছেলেটিকে শমী ঠাকুর কিছু না বলে বাঘুর জন্য হাপুস নয়নে কেঁদে ছিলেন।
বিখ্যাত শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শমীর বন্ধু বৎসল মনোভাবের অপূর্ব পরিচয় দিয়েছেন। বন্ধুরা ছিলেন পুণ্যবজ্র,অরুণপ্রকাশ, সরোজ কুমার মজুমদার প্রমুখ। বন্ধু বাৎসল্য এমনই বন্ধুদের সুখ-দুঃখের সাথী হতে নিজের মধ্যে বড়লোক ও নামজাদা বাবার ছেলে ভেবে কোনোদিন অহংকারকে নিজের মধ্যে প্রশ্রয় দেননি। কারণ তাহলে বাপ ও মায়ে খেদানো বন্ধুদের ভেতরের কত দুঃখের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন না বলে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে বোর্ডিংয়ের দম বন্ধ করা পরিবেশে মিলেমিশে থাকতেন। তার কষ্টের চেয়েও বড় ছিল বন্ধুদের সঙ্গ। তাই তো অকপটে বলেছিলেন -
"বাবামশায় সব ছাত্রদের সঙ্গে আমাকে থাকতে বলেছেন। আমার সবার সাথে থাকতে খুব ভালো লাগে।"
বন্ধুদের সঙ্গে থাকার একটা আলাদা আনন্দ তাঁকে পেয়ে বসত। বন্ধুদের উপাসনার প্রতি আকৃষ্ট করাই ছিল একটি অন্যতম সখ। শমী উপাসনার সময় লাল চেলি পরে আর সব বন্ধুদের একই পোশাক পরিয়ে উপাসনালয়ে নিয়ে যেতেন। নিজে যান আগে আগ,আর সকলে তাকে অনুসরণ করে চলতেন।
বিকেল হলেই ছেলের দল ছুটে যেতেন মাঠে। আর সেই সময় শমী ঠাকুর নরম তুলতুলে দু'হাতে তুলে নিতেন একটি শক্ত কাঠের বাক্স। তাই নিয়ে চলতেন গ্রামের মেঠো পথ ধরে। ঐ বাক্সটি ছিল কবির হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বাক্স। কবি সেটি তাঁর হাতে তুলে দিতেন। তাই নিয়ে চলতেন সেখানে, যেখানে অগণিত রোগী - পেটের অসুখ,সর্দি-কাশি,কেউবা চর্ম রোগ নিয়ে তাঁদের অপেক্ষায়, তাঁরা কখন আসবেন! বাবা ম'শায়ের নির্দেশমত দশ বছরের বালক বাক্স খুলে মিলিয়ে মিলিয়ে ওষুধ দিতেন। এ ছিল তার অনাবিল আনন্দের জগৎ,খেলার মাঠের চেয়েও।
কতকটা কবির 'ডাকঘর' নাটকের অমলই যেন শমী ঠাকুর। ছেলেরা আশ্রমে সব্জির বাগান করতেন। শমী তাতে মনের আনন্দে যোগ দিতেন। কিন্তু একটু শারীরিক দুর্বল প্রকৃতির জন্য ছেলেরা তাঁকে বেশি ভারী বোঝা দিতে চাইতেন না। তাতেই শমীর খুব গোঁসা হতো,কষ্ট পেতেন। একসময় মৈত্রেয়ী দেবীর কাছে শমীর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কবি বলেছিলেন -
"আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনত। আমার ছেলেরা কখনো মনে করার সুযোগ পায়নি যে, তারা বড় মানুষ,সত্যি সত্যি তারা বড় মানুষ ছিল না, - আমি তো নিঃসম্বলই হয়েছিলুম। সকলের সঙ্গে মিলনের পথ তখন সহজ ছিল।"
মা মারা যাওয়ার পর শমী বাবার একেবারে ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়েছিলেন। জোড়াসাঁকো,শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন - সর্বত্রে কবি ছেলেকে একেবারে বুকে আগলে রাখতেন।
একদিন শমী তাঁর বন্ধু সরোজ মজুমদারের মামার বাড়ি মুঙ্গেরে বেড়াতে গেলেন। সেখানেই কলেরা রোগে ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বরে মাত্র এগারো বছর বয়সে শমী ঠাকুর ইহজগত থেকে চিরতরে চলে গেলেন। ১৯০২ এর এই ২৩ নভেম্বর দিনটিও ছিল মায়ের মৃত্যু দিন।
এই প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের মৃত্যুতে কবি মানসিকভাবে এমনই ভেঙে পড়েছিলেন যে বেশ কিছুদিন কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শোকে নীলবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন।
(ক্রমশ)
***************
#বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য
( ৭ ম পর্ব )
✍মৃদুল কুমার দাস।
বিশ্বকবির ছোট মেয়ে অতসীলতা, ডাকনাম মীরা। বাড়িতে ই়ংরেজি পড়তেন লরেন্স সাহেবের কাছে। ছবি আঁকা শেখাতেন কার্তিকচন্দ্র নান, আর বিদেশী মেমের কাছে শেলাই। ভগিনী নিবেদিতাকে মীরার ই়ংরেজি শেখানোর গৃহ শিক্ষিকা হিসেবে পেতে চেয়ে কবির প্রস্তাব নিবেদিতা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কবি মীরার ইংরেজী শিক্ষার ব্যাপারে ভালই তৎপরতা দেখাতেন। ইংরাজিতে চিঠি লেখার ব্যাপারে কবি মীরাকে খুব উৎসাহ দিতেন।
জগদীশ চন্দ্র বসুরও খুব আদরের ছিলেন মীরা। বসু মহাশয়ের এমনও ইচ্ছে ছিল পুত্রসম ভাগ্নে অরবিন্দমোহনের সঙ্গে মীরার বিয়ে দেওয়ার। কবি-পত্নীর অকাল মৃত্যুতে বসু মশায়ের আর সে ইচ্ছে পূরণ হয়নি। কেননা কবি মনস্থ করে ছিলেন মীরার বিয়ে ব্রাহ্মণ বংশে দেবেন।
বাহ্মণ পাত্র পেয়েও গেলেন। প্রথম যোগাযোগ অসমের তরুণরাম ফুকনের সঙ্গে। নাকচ করে দেন সম্পর্কের প্রস্তাব। দ্বিতীয় যোগাযোগ নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মীরার পাত্র হিসেবে তাঁকেই ঠিক করলেন।
বেশ সুদর্শন ও তেজস্বী যুবক। বয়স সতের বছর সাত মাস। মীরা সাড়ে তের বছর। পাত্রের বাড়ি বরিশাল। পিতা বামনদাস গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁরা সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্ভুক্ত। বিলেতে পড়তে যাওয়ার অভিষ্ট লক্ষ সিদ্ধির সুযোগ পেয়ে নগেন্দ্রনাথ বিয়েতে রাজী হলেন। বিয়ে হবে আদি ব্রাহ্মসমাজের নিয়ম অনুযায়ী। বিয়ের দিন ধার্য হল ১৯০৭ এর ৬ জুন। বিবাহস্থল শান্তিনিকেতন।
বিয়ের এলাহি আয়োজন হয়। বরিশাল থেকে দু'দিন আগেই বরযাত্রীদের কবি শান্তিনিকেতনে আনেন। আর বিবাহের দানসামগ্রী ও অন্যান্য জিনিসপত্র সবই আসে রেলযোগে কলকাতা থেকে।
মীরার বিয়ের বছর খানেক পূর্বে পণপ্রথা নিয়ে কবি নিজেই সোচ্চার হয়েছিলেন। পণপ্রথার প্রতিবাদে লিখেছিলেন 'বিলাসের ফাঁস' নামক একটি প্রবন্ধ।
আর নিজেই হচ্ছেন পণপ্রথার শিকার! তাজ্জব! কবি নিজের নিরুপায় অবস্থার কথা বলতেও দ্বিধা করেননি - কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা বলে নিজেই হীনমন্যতায় ভুগতেন। তা থেকেই যখন যে পাত্রের সঙ্গে বিয়ের ঠিক হয়েছে হবু জামাইদের বিলেত যাত্রা সহ দানসামগ্রী উদার হস্তে বিলিয়েছেন। বিনিময়ে মেয়েদের সুখের অভাব যেন না হয়। আর কবির নাম ডাক তো যে সে নয়, বিয়েতে পণের ব্যাপারে কঞ্জুসি করা মানে কবিকে নেহাত খেলো হতে হয়। তাই মাধুরী,রেণুকার বরপণের চেয়েও মীরার বিয়ের বরপণ হিসেবে কবি কয়েক গুণ বেশি চুকিয়ে ছিলেন। একাধারে বরপণ নিয়ে রীতিমত প্রতিবাদ করছেন,অন্য দিকে নিজেই বরপণের শিকার হচ্ছেন - কবির এই দ্বিচারিতা নিয়ে কবিকে সমালোচকগণের সমালোচনার কম তাপ পোয়াতে হয়নি।
কিন্তু বিয়ের সময় বাঁধল মহা গোল। নগেন্দ্রনাথ কিছুতেই আদি ব্রাহ্মসমাজের মতে বিয়ে করবেন না। পৈতে ধারন করতে হয় আদি ব্রাহ্মসমাজের বিয়েতে। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের পৈতা ধারণের নিয়ম নেই। আদি ব্রাহ্মসমাজের নিয়মানুযায়ী কবি নগেন্দ্রনাথকে পৈতা দিলেন স্বহস্তে। কিন্তু সেই পৈতা বিবাহ সভায় ছুঁড়ে ফেলে দেন নগেন্দ্রনাথ। এর পরে বিবাহ বাসরে আরো যে একে একে লোকিক অনুষ্ঠান হয়েছিল, সবেতেই বাগড়া দিতে কোনো কসুর করেননি নগেন্দ্রনাথ। যেমন - গায়ে হলুদ,টোপর পরা, মালাবদল, এমনকি মাধুরীলতা ও বড় বৌঠানকে প্রণামের সময় এমন পা কামড়ে দেন যে যার জ্বলুনি দু'দিন ধরে যায়নি। লোকাচারের সবেতেই নগেন্দ্রনাথ খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। বিয়ের সব বর্ণনা প্রবাসী ভাই রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে মাধুরীলতা এই সব জানিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন -
"বরের অসভ্যতায় আমাদের পর্যন্ত লজ্জাবোধ হয়েছিল। সব কাজেরই সীমা আছে কিন্তু নগেন্দ্রের বেহায়াপনার সীমা নেই।"
কবি অচিরেই বুঝতে পারলেন পাত্র নির্বাচনে মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। নগেন্দ্রনাথ আসলে প্রবল অহংকারী। অবিমৃষ্যকারী। লোভী। আচরণে সীমাহীন ঔদ্ধত্য! সে আর বলার নয়। তথাপি পতিব্রতা স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে কোনো রকম ঘাটতি রাখেননি মীরা। স্বামীকে মীরা নির্দ্বিধায় বলেছিলেন -
"আমি কোনোও কাজ করার পক্ষে অযোগ্য অক্ষম সে জন্যে আমাকে নিয়ে তোমাকে অনেক ভুগতে হবে। তবে আমার এই একমাত্র আশা আছে যে আমি যতই অযোগ্য হই,অপটু হই তুমি আমাকে শিখিয়ে নেবে।"
নগেন্দ্রের মতো অহংকারী মানুষের কাছে মীরার এমন স্বীকারোক্তির কোনো মূল্য ছিল না। বরং মীরার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আপন পৌরুষত্বের বড়াই ফলিয়েছে।
বিয়ের শর্তানুযায়ী নগেন্দ্রনাথ গেলেন আমেরিকায় পড়তে। ১৯০৭ সালের ২৮ জুন। কি নিয়ে নগেন্দ্রনাথ পড়বেন তার সুনির্দিষ্ট চিন্তা নগেন্দ্রনাথের ছিল না। শুধু আমেরিকা যাবেন এটা ঠিক। অবশেষে কবিকেই ভাবতে হয়। নগেন্দ্রনাথের যাওয়ার দু'দিন আগে প্রবাসে অবস্থিত পুত্র রথীন্দ্রনাথকে ২৬ জুন এক গোপন পত্রে কবি লিখেছিলেন -
" নগেন্দ্রকে কৃষি শিক্ষাতেই প্রবৃত্ত করিয়ে দেওয়া ভাল। Ceramics শিখে এদেশে সুবিধা হবে না। .... অতএব ওকে এমন একটা কিছু শিখিয়ে নিস যাতে ও তোদের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে পারে। তাছাড়া নগেন্দ্র যাতে বেশ পুরুষ মানুষের মত শক্তসমর্থ হয়ে ওঠে তার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিস।... আসল কথা ওর বয়সের উপযুক্ত পড়াশোনা যথেষ্ট হয়নি - ওর বুদ্ধির এবং প্রকৃতির অগভীরতার দোষ আছে - ওকে বেশ ভালো করে পড়তে শুনতে সকল বিষয় আলোচনা করতে চিন্তা করতে হবে।" নগেন্দ্রনাথ রথীন্দ্রনাথের মতো কৃষিবিদ হলে শান্তিনিকেতনের কাজে আসবে,এমন আশায় কবি বুক বেঁধে ছিলেন।
ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রথীন্দ্রনাথ তিন বছরের কৃষি বিদ্যা B.S. (B.Sc.) ডিগ্রি করে দেশে ফিরে আসেন ১৯০৯ এর সেপ্টেম্বরে। তার দেড় বছর পরে দেশে ফিরে আসেন নগেন্দ্রনাথ। কবি নগেন্দ্রনাথকে শিলাইদহে রথীন্দ্রনাথের কৃষি সহায়তার জন্য পাঠান। এছাড়াও জমিদারী ও পাতিসর ব্যাংকের কিছু দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁকে। এজন্য মাসিক দেড়শ' টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। এত সুযোগ সত্ত্বেও কবির আস্থা অর্জন করতে নগেন্দ্রনাথ আদৌ পারেননি। বেপরোয়া বেহিসেবি ব্যায়ের কারণে ক্রমাগত ঋণ করতে থাকেন। সেই সঙ্গে ঋণ করে বরিশালে বাড়ি তৈরি করেছিলেন তিনি।
এছাড়া ঠাকুর বাড়ির জমিদারি দেখাশোনা সহ অন্যান্য কিছু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর্থিক অনিয়মের দোষে পড়েন। অনেকের সাথে দুর্বিনীত আচরণের( যার মধ্যে অন্যতম মাধুরী ও শরৎকুমারের সঙ্গে) জন্য তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
এতে মেয়ের সঙ্গে জামাইয়ের সম্পর্কের অবনতি যাতে না হয়, মেয়ের সুখের কথা ভেবে কবি মেয়ে ও জামাইকে সঙ্গে করে নিয়ে নানা স্থানে ( রামগড়,বুদ্ধগয়া,বেনারস, এলাহাবাদ...) বেড়াতে যেতেন। মেয়ের সুখের জন্য কবি আরো কত কিছু করবেন!
(ক্রমশ)
****************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ৮ম পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
ইত্যবসরে মীরা দেবী সন্তানসম্ভবা হলেন। রবীন্দ্রনাথ মেয়ের দেখভাল তথা সেবা-যত্নের জন্য রেখে এলেন বালিগঞ্জে মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনীদেবীর কাছে। জ্ঞানদানন্দিনীদেবী দেখভালের কোনো ত্রুটি রাখেননি। কবি তাহতে বড়ই নিশ্চিন্ত ছিলেন। সন্তান হওয়ার সময় মীরার জীবন সংশয়ও দেখা দিয়েছিল। অবশ্য জ্ঞানদানন্দিনীর তৎপরতায় সে যাত্রায় মীরার সন্তান প্রসবে ততটা আর সমস্যা হয়নি। নির্বিঘ্নে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন মীরা দেবী। নাম নীতিন্দ্রনাথ। জন্ম ১৯১১এর ৫ ডিসেম্বর। কবি শমীকে হারিয়ে নীতিন্দ্রনাথে মধ্যে যেন শমীকে খুঁজে পাওয়ার পরম আনন্দ পেলেন। সেই আনন্দে নীতিন্দ্রনাথের জন্মের ঠিক তের দিন পরে নিজের হাতে একটি বাংলা 'ইচ্ছাপত্র' রচনা করলেন। সেই 'ইচ্ছাপত্র'-এ লেখেন -
"যেহেতু আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী মাধুরীলতা দেবীর অভাব অল্প ও তাহার সঙ্গতি যথেষ্ট এই কারণে কেবলমাত্র আমার স্নেহের নিদর্শন স্বরূপে তাঁহার জন্য মাসিক পঞ্চাশ এবং আমার কনিষ্ঠা কন্যা অতসীলতা দেবীর( মীরা) জন্য মাসিক একশত টাকা মাসহারা বরাদ্দ করিলাম।"
এতেও মীরার সম্পর্কে কবির দুর্ভাবনা কাটেনা। মীরা ও নগেন্দ্রনাথের সুখের জন্য নিজেকে এক দায়িত্বশীল পিতা হিসেবে নানা কর্তব্য পালনে ব্রতী হলেন।
যত মীরার জন্য ভাবছেন তত দুর্ভাবনা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। দিনে দিনে মীরা ও নগেন্দ্রের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা থেকেই আসছে যত দুর্ভাবনা! সেই সঙ্গে মাধুরীলতাদেবী নিজেকে মনে করেন কবিব স্নেহ থেকে যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। তারই অভিমান যেন ধিকি ধিকি জ্বলছে। অন্যতম কারণ মাসোহারা নিয়ে। এই মাসোহারা নিয়ে এমন বৈষম্য দুই বোনের মধ্যে একটা দুরত্ব যেন আপনা হতে তৈরি হল।
দিনে দিনে মীরার প্রতি নগেন্দ্রের অবজ্ঞা, ঔদাসীন্য ও বিরূপতা আরো বাড়তে লাগল। তাই নিয়ে যত কবির দুর্ভাবনা।
কবি তাই ভাবলেন যদি নগেন্দ্রের একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় তবে এই দাম্পত্য সঙ্কট মিটলেও মিটতে পারে। চাকরির তখন চলছে বড়ই আকাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজার চলছে। চাকরি বললেই কি আর কি চাকরি জোটে! না ধরা দেয়!তার উপর আবার নতুন বিপদ - বরিশালে অশ্বিনী দত্তের সাথে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন বলে নগেন্দ্রনাথে মার্কা মারা বিপ্লবীর তকমা সেঁটে আছে। তাই চাকরি আর কেউ দিতে চাননা নগেন্দ্রনাথকে।
কোথাও চাকরির ব্যবস্থা না হওয়ায় ১৯১৮ এর মাঝামাঝি নগেন্দ্রনাথ সপরিবারে গেলেন নিজাম রাজ্যের হায়দ্রাবাদে।
বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী 'যুদ্ধজ্বর' নামক একপ্রকার মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী আকার নেয়। এই রোগে মারা যান কবির ঘণিষ্ঠ অনুরাগী ও পরিকর অজিত কুমার চক্রবর্তী,কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কৃতীন্দ্রনাথের পত্নী সুকেশী দেবী ও আরো অনেকে। হায়দ্রাবাদেও ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হন মীরা দেবী,নীতিন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথের ছোট ভাই শান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তি গঙ্গোপাধ্যায় মারা যান। কবির কাছে টেলিগ্রামে খবর এলো। কবি খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন টেলিগ্রামের মাধ্যমে কবি ডাঃ ল্যাঞ্চেষ্টার ও ডাঃ মোতিয়ালা গোবিন্দ রাজুলু নাইডুকে(সরোজিনী নাইডুর স্বামী) মীরাদের চিকিৎসার দায়িত্ব দিলেন। রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে তাঁরা শান্তিনিকেতনে ফিরলেন। এই অসুস্থতার সময় নগেন্দ্রনাথ মীরাদেবীর প্রতি এমনই অশালীন ব্যবহার করেছিলেন, তাতে তিনি অত্যন্ত মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন এতটাই যে তা থেকে দাম্পত্য বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব অপ্রিয় ও দুঃখজনক ঘটনায় কবিও স্বস্তিতে ছিলেন না।
এর কিছুদিন পরে বেকার নগেন্দ্রনাথের চাকরির জন্য কবি পরামর্শ দেন -
"কলকাতায় Grace Brothers বলে খুব বড় American company আছে। ব্রহ্মনাথ এদের কাছে কাজ চেয়েছিল তারা তখনই তাকে বেশ একটা কাজ দিয়েছিল - কিন্তু সে কাজের ক্ষেত্রে java-তে ব্রহ্মনাথ যায়নি। তুমি তাদের ওখানে চেষ্টা করলে বেশ ভালো কাজ পেতে পার - তোমার American Degree তাদের কাছে আদর পাবে।"
কবি নগেন্দ্রনাথের চাকরির জন্য যেখানে দিন রাত্রি ভেবে অস্থির সেই নগেন্দ্রনাথ তখন তলে তলে বিখ্যাত শ্বশুরের কাছ থেকে টাকা কামানোর উপায় হিসেবে স্ত্রী পুত্রকে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় আনার জন্য কবিকে প্রবল চাপ দিতে থাকেন। কারণ মীরা, ছেলে নীতু ও মেয়ে নন্দনী ওরফে বুড়ি কাছে এলে তাদের খরচ বাবদ কবির কাছ থেকে একটা মোটা অঙ্কের টাকা মাসোহারা হিসেবে মিলবে। নগেন্দ্রের এই কৌশলের পেছনে অসৎ উপায় অবলম্বনে কবি ব্যথিত হয়েছিলেন।
জামাতাকে চিঠি দিয়ে জানান কলকাতায় থাকার খরচ অনেক। তাছাড়া মীরার ও নীতুর শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে শান্তিনিকেতনে। এই সময় পাঠানো সমীচীন হবে না। উল্টে তাদের ক্ষতি যে হবে তা বোঝার চেষ্টা করতে বললেন।
কিন্তু কে শোনে বা বোঝে কার কথা। স্ত্রী পুত্রকে শিখন্ডি করে টাকা ঝালানোর যে আরো অনেক বড় পাকা মাথা কাজ করছে। Grace Brothers সওদাগরি অফিসে চাকরি পেলেন কবির নাম ভাঙিয়ে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্ত্রী ও ছেলের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলকাতায় তাদের আসতে বাধ্য করেন নগেন্দ্রনাথ।
এদিকে আবার অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শ্রমিক দরদী হতে গিয়ে, আন্দোলনের স্বার্থে জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। তা সামাল দেওয়া দুরুহ হয়ে উঠছে। খরচ কমাতে বেহালার গ্রামাঞ্চলে সামান্য ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সেই বাড়িতে কবির আত্মজদের থাকা রীতিমত অসম্মানের, কোথায় জমিদারি প্রাসাদে থেকে মানুষ, তাঁরা কিনা থাকবেন ঐ সামান্য ভাড়া বাড়িতে! এর মূলে একটাই উদ্দেশ্য মীরাদেবীর উপর পীড়নের ইচ্ছা চরিতার্থ করা ও শ্বশুর ম'শায়ের কাছ থেকে সন্তানদের খরচ বাবদ অর্থের ব্যবস্থা করা। তাই তাদের পাঠানোর জন্য উপুর্যপরি চাপ ঐ সময় কবিকে নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ করছিল। মীরার মুখের দিকে তাকাতে কবির চোখে নিঃশব্দে জল আসে। মেয়ের উপর যে অধিকার ফলাবেন সে সামর্থটুকুও কবি হারিয়ে ফেলেছেন। রাজনৈতিক অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের জন্য চাকরি হারালেন নগেন্দ্রনাথ। নগেন্দ্রনাথকে নিয়ে সমস্যার পর সমস্যা।
নিরুপায় কবি এমনও ভাবছেন জামাতাকে শান্তিনিকেতনের কাজে লাগিয়ে যাতে সকলকে কাছে রাখতে পারেন। কিন্তু সে ব্যবস্থায় নগেন্দ্রনাথ রাজী নন। আবার চাকরির চেষ্টা কবির নাম ভাঙিয়ে। এক বিশ্ববন্দিত কবির জীবনে জামাতাই পর্বত প্রমাণ সমস্যা। সমস্যা এজন্য জামাতাটি বিশ্ববন্দিত শ্বশুরম'শাইকে শোষন করে জীবিকা নির্বাহ করা একপ্রকার অভ্যেসে পরিণত করে ফেলেছেন।
ইত্যবসরে কবি পঞ্চম বারের জন্য ১৯২০ সালের মে মাসে ইয়োরোপ ভ্রমণে বেরলেন। মীরা দেবীকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। আর নগেন্দ্রনাথ ও মীরাদেবীর দাম্পত্য কলহের মধ্যে ইংরেজ সাহেব এন্ড্রুজকে ( যিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষা দানে ঘণিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন) দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ইয়োরোপ ভ্রমণে যান। এন্ড্রুজকে নগেন্দ্রনাথ অনেকটাই সমীহ করতেন। কেননা সাহেব বলে। কবি ইয়োরোপ ভ্রমণ করে ফিরে এলেন ১৯২১- এর ২০ জুলাই। আবার নগেন্দ্রনাথের চাকরির তদারকি!
( ক্রমশ)
,****************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ৯ ম পর্ব )
✍মৃদুল কুমার দাস।
পাশ্চাত্য- সফর শেষ করে ফিরে আসার কয়েক মাস পরে কবি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে নগেন্দ্রনাথের চাকরির ব্যাপারে সোর্স করলেন। শ্রীমুখোপাধ্যায় কবিকে বিমুখ করেননি। তাঁর বদান্যতায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নগেন্দ্রনাথ পাঁচশ' টাকার চাকরি পান। বালিগঞ্জ বিজ্ঞান কলেজের কৃষিবিভাগে খয়রা অধ্যাপক হিসেবে। স্বয়ং কবি এই খয়রা ফান্ডের পরিচালক সমিতির অন্যতম সদস্য ছিলেন।
এজন্য রবীন্দ্রনাথকে কম বেগ পেতে হয়নি। সময়টা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। অসহযোগ আন্দোলনের ভরা জোয়ার চলছে তখন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্কটের মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথকে পাশে পেতে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নগেন্দ্রনাথের যোগ্যতা নিয়ে সকল সিনেট-সদস্যের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সে সব আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে নগেন্দ্রনাথকে ' গুরুপ্রসাদ সিং প্রফেসর অব্ এগ্রিকালচার' পদে নিয়োগ করেন।
চাকরির সুবাদে নগেন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন বালিগঞ্জ বিজ্ঞান কলেজ ভবনে একটি সুসজ্জিত কোয়ার্টার। কবির সৌজন্যে জীবিকার সুন্দর সুযোগ পেয়েও মীরার সঙ্গে সম্পর্কের কোনো উন্নতি ঘটেনি। সেই এক গোঁ ধরে পিতার অধিকারে সন্তানদের সহ মীরাকে থাকতে বাধ্য করেন কলেজ কোয়ার্টারে। মীরার স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করাই ছিল নগেন্দ্রনাথের মূল লক্ষ্য। সেখান থেকে ইচ্ছেমত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে আসার সুযোগটুকুও পেতেন না মীরাদেবী।
একবার হয়েছে কি ১৯২২ এর সেপ্টেম্বরে কবি শান্তিনিকেতনের দলবল নিয়ে হাজির কলকাতায় 'শারোদৎসব' নাটকটি অভিনয়ের জন্য। কবির একান্ত ইচ্ছা মীরাদেবীও জোড়াসাঁকোতে সামিল হন। কিন্তু বাধ সাধলেন নগেন্দ্রনাথ। নগেন্দ্রনাথ অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে মীরাদেবীকে যেতে দিতে চান না। সব শুনে মর্মাহত কবি দু' দু'বার গেলেন বালিগঞ্জের কোয়ার্টারে নগেন্দ্রকে বুঝিয়ে মেয়েকে আনবেন। কিন্তু দু'বারই নগেন্দ্রনাথ বিশেষ অজুহাতে কবির সঙ্গে দেখাই করলেন না। কবি বাইরে থেকে ফিরে এসেছিলেন। এই ঘটনার পর কবির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। নগেন্দ্রনাথ সম্পর্কে কবির মোহভঙ্গ হয়।
এর কিছুদিন পরেই মীরাদেবী নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে চিরতরে শান্তিনিকেতনে গড়ে তোলেন স্থায়ী আশ্রয়। নীতুর পড়াশোনা চলে শান্তিনিকেতনে। তাই নিয়ে আত্মীয় পরিজনের কৌতূহল, গুঞ্জনের সীমা পরিসীমা ছিল না। সেই দুর্বলতাকে নগেন্দ্রনাথ ফের কাজে লাগিয়ে পিতা ও স্বামীর অধিকারে ফের অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। এতে পুত্রের ভবিষ্যৎ চুলোয় যায় যাক, মানসিক অশান্তি যে অবশ্যম্ভাবী তার কোনো তোয়াক্কা করেন না। নগেন্দ্রনাথের শুভবোধ জাগ্রত করার জন্য এন্ড্রুজ,পিয়ার্সন, প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবিশ অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ ততটা হয়নি। উল্টে কবিকে লোকনিন্দার ভয় দেখিয়ে বিপর্যস্ত করার অনবরত চেষ্টা করে যান।
কবি তখন এক পত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন -
"...মীরা নিজের সম্বন্ধে লোকনিন্দা গ্রাহ্য করে না তোমাকে লিখেছে শুনে আমি খুসি হলুম।.... তা ছাড়া নিতুর আর বুড়ির এখানে শরীর মন সকল দিকেরই পক্ষে কল্যাণ। ওদের সমস্ত জীবনের কথা আমাকেই ভাবতে হবে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।... ওদের বিলেতে পাঠাতে অনেক খরচ হবে জানি কিন্তু সেও আমি আনন্দে স্বীকার করব।"
নগেন্দ্রনাথ এবার চাকরির সুবাদে দু'বছরের জন্য (সবেতন ছুটি ও পাথেয় হিসেবে আটশ' টাকা পান) বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌজন্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও গবেষণার কাজে ইংল্যান্ড যাওয়ার সুযোগ পেলেন।
এই ঘটনাকে সামনে রেখে আবার নতুন ছক কাটলেন নগেন্দ্রনাথ।
বিলেতে সঙ্গে নিয়ে যাবেন নীতুকে। বিলেতে নীতু কী পড়বে সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু নিয়ে যেতেই হবে, তাহলে মীরাকে তাঁর নয়নের মণি থেকে একা হয়ে পড়ার মানসিক কষ্ট দেওয়া যাবে, আর নীতুর জন্য বিলেতে খরচ দেখিয়ে কবির কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তিরও সুযোগ ঘটবে।
এমনতর ঘটনার জন্য ভেবে অবাক লাগে ১৯২৩ এর এপ্রিলে পিয়ার্সনের সঙ্গে বিলেত রওনা হওয়ার পূর্বেই নীতুর পাথেয় বাবদ কবির কাছে পাঁচশত টাকা সাহায্য চান, নগেন্দ্রনাথ এক সুউপায়ী জামাতা হওয়া সত্ত্বেও। কবির তখন দুঃসময় চলছে। তাসত্ত্বেও পিয়ার্সনের হাত দিয়ে পাঁচশ' টাকা কবি পাঠিয়েছিলেন। আর কবির পরমাত্মীয় বলে পাশ্চাত্যের যেখানেই গেছেন কবির নাম ভাঙিয়ে নগেন্দ্রনাথ সব সুযোগ সুবিধা লাভে নিজেকে কৌশলে প্রয়োগ করেছিলেন। অবশ্য কবির তাতে প্রশ্রয় ছিল। একটি চিঠিতে কবি লিখেছিলেন -
"...য়ুরোপের মহাদেশে তুমি যেখানেই যাও আমার সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ আছে একথা জানালে যথেষ্ট পরিমাণ আদর ও আনুকূল্য পেতে তোমার বিন্দুমাত্র বিলম্ব হবে না।"
সেই সঙ্গে নীতু পড়াশোনা কী করবে, কোথায় থাকবে, কোথায় পড়বে - সবটাই দাদাম'শাই কবি ভেবেছিলেন। আর এ ব্যাপারে পিয়ার্সনের পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। কিছু ভালো স্কুলের সন্ধান পিয়ার্সন দিয়েছিলেন যা ১৯২৩ এর ২ ফেব্রুয়ারির একটি নগেন্দ্রনাথকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়।
এর পরে ১৯২৪ এর ২৬ জানুয়ারী আর একটি চিঠিতে কবি নগেন্দ্রনাথকে জানিয়েছিলেন -
"আমাদের এখানে প্যারিসবাসিনী একজন ধনী ইংরেজ মহিলা এসেছিলেন। তিনি নীতুর কথা শুনে বলেছিলেন প্যারিসে তাঁর কাছে রেখে তিনি তাকে শিক্ষা দেবার ভার নিতে রাজি আছেন।... প্যারিসে আমাদের আরেক বন্ধু আছেন Rana ( ভারতীয়) তাঁর স্ত্রী জর্ম্মান,উভয়ে খুব ভদ্র। এঁরা মানুষ করবার জন্য আমার কাছে একটি ছোট বাঙালির মেয়ে চেয়েছিলেন। খুঁজে কাউকে পাইনি।"-
এদের কাছে নীতুকে রেখে বিনা খরচে উচ্চ শিক্ষা অনায়াসে দেওয়া যেতে পারত। কিন্তু তা নগেন্দ্রনাথ কোনোরূপ গ্রাহ্যের মধ্যে আনেননি। কারন ছিল সেই একই মতলব, নাহলে কবির কাছ থেকে টাকার যোগান বন্ধ হয়ে যাবে।
এইসময় অর্থের লোভে নগেন্দ্রনাথ আরো একটি জঘন্য কাজ করে বসেন। ঘটনাটি ঘটে ১৯২৪ এ। তিনি রোমে আন্তর্জাতিক মৃৎবিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে এক নিন্দনীয় কাজ করেছিলেন।
( ক্রমশ)
*****************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ১০ ম পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
রোমের আন্তর্জাতিক মৃৎবিজ্ঞান সম্মেলনে নগেন্দ্রনাথ যোগ দিতে গিয়ে কবির দুটি পান্ডুলিপি এক জনৈক আমেরিকানের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। বিনিময়ে অর্থ মিলবে।
অর্থলোভ আনে চারিত্রিক অধঃপতন,বিবেক মনুষ্যত্বহীন করে। পান্ডুলিপি বিক্রির অসদ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়নি। সে যাত্রায় রোদেনস্টাইনের হস্তক্ষেপে পান্ডুলিপি দুটি উদ্ধার হয়।
নীতিন্দ্রনাথকে কবি পিয়ার্সনের সহযোগিতায় ভর্তি করে দিলেন লেচওয়ার্থের সেন্ট ক্রিস্টোফার স্কুলে।আর নগেন্দ্রনাথ গবেষণা শুরু করেন বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী স্যার জন রাসেলের কাছে। পি এইচ ডি ডিগ্রি কম্প্লিট করে ফিরলেন কলকাতায় ১৯২৬ এর জানুয়ারীতে। নিতুর তখনো পড়া শেষ হয়নি। নিতুকে নিয়ে দেশে ফিরে এলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে যোগ দিয়ে নগেন্দ্রনাথ নতুন সমস্যার মুখোমুখি হলেন। সমস্যা কোয়ার্টার নিয়ে। বালিগঞ্জ কলেজ কোয়ার্টার 'রাণী বাগীশ্বরী' অধ্যাপক পদে বৃত স্টেলা ক্রামরিশের দখলে।
এই বাসস্থান নিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য নগেন্দ্রনাথ আবার কবির দ্বারস্থ হন। যদিও কবির জামাতাকে আনুকূল্য দেখানোয় পূর্বের মতো ততটা আর আন্তরিকতা বোধ করেন না। খুব বিরক্ত। নীতিন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা হিসেবে এতটাই দায়িত্ব জ্ঞানহীন হতে পারেন কবি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। তথাপি জামাতার আর্জি একেবারে উপেক্ষাও করলেন না।
এদিকে কবি-হিতৈষী আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন। তখন সিন্ডিকেটের প্রধান দায়িত্বে আশুতোষ-পু্ত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কবি তাঁকে চিঠি লিখলেন ১৯২৬-এর ১০জানুয়ারীতে। কোয়ার্টার সংক্রান্ত বিষয় জানিয়ে যাতে সমস্যা সুরাহা হয় পত্রে বিষদ জানালেন -
"....বিনা অপরাধে তাঁহাকে তাঁহার অধিকার চ্যূত করা কি উচিত হইয়াছে? তোমরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে তাঁহাকে বিদেশে পাঠাইয়াছিলে বলিয়াই তাঁহার অনুপস্থিতি ঘটিয়াছিল - সে কাজও তিনি প্রশংসার সহিত উদ্ধার করিয়াছেন। ইহাতে কি তিনি এমন দোষ করিয়াছেন যাহাতে শাস্তি বা অবমাননার যোগ্য বলিয়া গণ্য হইতে পারেন?"
কবির এই চিঠির প্ররিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগী হন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। স্টেলা ক্রামরিশকেও কোয়ার্টার ছাড়তে বলা ঠিক হবে না। তাই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নেয় নগেন্দ্রনাথকে বাড়ি ভাড়া বাবদ মাসিক একশ' টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
মোটামুটি সমস্যার সুরাহা হল। কবি এবার নীতুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। নীতুর ব্যাপারে নগেন্দ্রনাথের একেবারে ঔদাসীন্য ভাব কোনোমতেই কবির পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। নিতুকে বিলেত থেকে ফিরিয়ে এনে নগেন্দ্রনাথ তার ছোটো ভাই ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের ( যিনি ডি.জি. নামে খ্যাত - দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে পুরস্কৃত) কাছে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। এতে নীতুর ভবিষ্যতের কি উন্নতি হচ্ছে কবির মাথায় ঢুকছে না। বরং বেশি করে মনে হচ্ছে নীতুর প্রতি এই উপেক্ষা আসলে মীরাকে চরম আঘাত দেওয়াই উদ্দেশ্য। নীতুর ভবিষ্যৎ একেবারেই অন্ধকারে - মীরা ও নগেন্দ্রের টানাপোড়েনের মাঝখানে পড়ে। নীতুর মায়ের প্রতি সবচেয়ে টান দেখে নগেন্দ্রনাথও নীতুর ভবিষ্যতের প্রতি উপেক্ষার একটা আক্রোশ মনে মনে পোষণ করতেন। নীতু ধীরে ধীরে পিতার কাছ থেকে সরে এসে মা মীরা ও দাদামশাই কবির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রাজামশাই তাঁর শিক্ষা দীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মুখ্য ভূমিকায় এলেন। নীতিন্দ্রনাথের সম্পর্কে পরে সেই আলোচনায় আসব।
ইতিমধ্যে নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কের বিচ্ছেদ মীরাদেবীর একপ্রকার ঘটেই যায়। এমনকি বিচ্ছেদের মামলা আদালত পর্যন্তও গড়ায়। দাম্পত্য সম্পর্ক চুকিয়ে মীরা দেবীর স্থায়ী ঠিকানা হয় শান্তিনিকেতনের 'মালঞ্চ'-এ। মালঞ্চ বাড়িটি তৈরি করতে ছ'হাজার টাকা কবি খরচ করেন। সেইসঙ্গে কবি ১৯২৬ সালে একটি ট্রাস্ট ডিড করেন মাসিক চারশ' টাকা ভাতা হিসেবে মীরা দেবী সারাজীবন পাবেন।
ইত্যবসরে নগেন্দ্রনাথ বিলেত ফেরত বলে খুব নাম ডাক হল। নির্বাচিত হলেন কৃষি সংক্রান্ত রয়্যাল কমিশনের সদস্য। আবার কখনো বা নির্বাচিত হন ইম্পিরিয়াল কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চের সদস্যরূপে। ১৯৩১ এ অবসর গ্রহণ করলেন। আর ১৯৩২ এ পাকাপাকিভাবে ইংল্যান্ডের বাসিন্দা হয়ে যান। এত মীরা দেবীর কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। নগেন্দ্রনাথহীন জীবন যেন বড়ই শান্তির বোধ হয়। নগেন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের যেন এক বিভীষিকাময় ছিলেন। ছলনা ও মিথ্যাচারকে কোনো দিন মীরাদেবী প্রশ্রয় দিতেন না। সহ্যও করতে পারতেন না। তাই সত্য হলেও অপ্রিয় কথা বলতে কোনোদিন দ্বিধা করতেন না। আর নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল নগেন্দ্রনাথ ছিলেন বদরাগী ও উদ্ধত স্বভাবের। কবি আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারেননি উভয়কে সুখী করতে। কিন্তু এতে ব্যর্থ কবি খুব যন্ত্রনা নিয়ে ভাবতেন বিয়ের রাতে মীরা স্নান ঘরে ঢোকার মুহূর্তে একটা গোখরো সাপের দংশন থেকে কোনোওরকমে রক্ষা পেয়েছিলেন। সেই কথা স্মরণ করে কবি বলেছিলেন -
"সে সাপ যদি তখনি ওকে কাটত তাহলে ও পরিত্রাণ পেত।"
১৯৩৬ এ এপ্রিল মাসে কবি মীরা দেবীর মেয়ে,কবির নাতনি বুড়ি ওরফে নন্দিতার বিয়ে দেন কৃষ্ণ কৃপালিনীর সঙ্গে। পিতা নগেন্দ্রনাথের সে বিয়েতে কোনো যোগাযোগ ছিল না। অবশ্য নন্দিতা বিয়ের পর বিলেতে থাকাকালীন নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। এমনও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৩৬ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত ইয়োরোপের বিভিন্ন যায়গায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য চর্চা নিয়ে ইয়োরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যেতেন নগেন্দ্রনাথ। যেন নিজেকে উজাড় করে দিতে কি আন্তরিকতা দেখাতেন। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারীতে ওয়েস্ট লন্ডন হাসপাতালে শ্বাসনালীর ব্যাধিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নগেন্দ্রনাথ। এ নিয়ে মীরা দেবীর প্রতিক্রিয়ার কোনো প্রমাণ পাই না।
(ক্রমশ)
*************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( ১১ শ পর্ব )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
নীতিন্দ্রনাথ কবির আদরের নীতু। কবি নীতুর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পিতা নরেন্দ্রনাথ সন্তানের শিক্ষা দীক্ষায় এতো উন্নাসিক তথা অবহেলার চোখে দেখতে পারে তা কল্পনায়ও ভাবতে পারেননি কবি। অবশেষে কবিই নীতুর সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিলেন।
নীতুকে পাঠালেন দার্জিলিং-এর সেন্ট পলস স্কুলে। ততটা সুবিধের হলো না বলে সেখান থেকে আবার নিয়ে চলে এলেন এলাহাবাদে। ১৯২৮ সালে ইউ.পি. বোর্ডের পরিচালনায় ক্রেমব্রিজের সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেওয়ালেন।
এইভাবে ক্রমাগত টানাটানি, স্থান বদল, অশান্তি... নরম স্বভাব সম্পন্ন ,শান্ত,প্রিয়ভাষী নীতুর পড়াশোনায় মনঃসংযোগ যথার্থই বিঘ্নিত হয়। সাফল্য পেলেন না কেমব্রিজ সার্টিফিকেট পরীক্ষায়। নীতু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে দাদামশাইকে কী করণীয় জানতে চেয়ে চিঠি লেখেন। উত্তরে কবি চিঠিতে জানিয়েছিলেন -
"... প্রত্যেক মানুষের নিজের ভিতরে যে বিশেষ শক্তি আছে তাকেই যথাসম্ভব সম্পূর্ণতা দেওয়াই শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।... নন্দলালের কাছে শোনা গেছে,তোর ছবি আঁকবার সহজ ক্ষমতা আছে। তাছাড়া ভাষা শিখতেও তুই পটু। যদি তুই ছবি আঁকার কাজে নিবিষ্ট হয়ে লাগতে পারিস,আর তাছাড়া ফরাসী, জর্ম্মান, ইটালিয়ান, ভাষা শিখে ঐ সকল ভাষায় ও ইংরেজি ভাষা সাহিত্যে ভালোরকম অধিকার লাভ করতে পারিস তাহলে সে তোর চির জীবনের খোরাক হবে এবং তাতে তোর জীবিকার পক্ষেও যে বাধা হবে তা মনে করি নে।"
কবির হস্তক্ষেপে নীতু শিল্পী মনে অনুশীলনের জন্য ছবি আঁকায় নিজেকে পূর্ণ সদ্ব্যবহারে মনোযোগী হলেন, দাদা মশাইয়ের গুণ তার মধ্যেও ছিল - কবিতা লেখা,গানের চর্চায় ভালো লক্ষণ কবি দেখে তো খুব খুশি। কবি আদরের নাতিকে রসিকতা করে ১৯২৭এর ৪ জুন শিলং থেকে একটি চিঠিতে লিখছেন -
"... তুইও কবিতা লিখতে ধরেচিস? বিপদে পড়বি। দাদামশায়ের পথে নামলে আমারই মতো লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাবি। আচ্ছা,তোর লেখা পাঠিয়ে দিস..."
দাদামশায়ের পরামর্শে ইপ্সিত ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান ভাষা শিক্ষায়ও নিতুর আগ্রহকে সমূলে ধ্বংস করার মূলে পিতা নগেন্দ্রনাথের ভূমিকায় নীতু খুব মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলেন। এইসব ভাষা শিক্ষার পথ একপ্রকার রুদ্ধ করে নগেন্দ্রনাথ নীতুকে জোর করে মুম্বাইয়ের টাইমস অব ইন্ডিয়ার ছাপাখানার কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কবি তখন জেনেভায় সফর রত। নীতুর এই মুম্বাইয়ে ছাপাখানার কাজে ঢুকেছেন শুনে ১৯৩০ এর ২৫ আগষ্ট মেয়ে মীরাকে কবি জেনেভা থেকে একটি পত্রে জানান -
"রাণীর চিঠিতে খবর পেলুম নীতুকে বোম্বাই পাঠানো হয়েছে ছাপার কাজ শিখতে। ভালো লাগলো না,কারণ বোম্বাই অস্বাস্থ্যকর। ওখানে একজাতীয় ম্যালেরিয়া আছে সেটা খুব খারাপ। এখানে বিশেষ চেষ্টা করে ভালো ব্যবস্থা করেছি। এরকম সুবিধা ভারতবর্ষীয়ের ভাগ্যে সহজে জোটে না। সবচেয়ে ভালো শিক্ষা পাবে সবচেয়ে আদর যত্নে এবং সবচেয়ে কম খরচে। এতে আমি কাজে লাগিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হব। এই সুযোগটা ছাড়লে নীতুর প্রতি নিতান্ত অন্যায় করা হবে। এখানে ও মানুষ হয়ে উঠবে, কেবলমাত্র মজুর নয়।"
কবির উদ্যোগে জার্মানীতে নীতুর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়।
মুদ্রাযন্ত্র ও প্রকাশনা শিল্প বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে নীতিন্দ্রনাথ জার্মানীতে যান ১৯৩১ এর এপ্রিলে।
নীতিন্দ্রনাথের স্থায়ী ঠিকানা হলো জর্মানীর লাইপজিগ্। জায়গাটা কবির খুব পছন্দের। জায়গাটি জার্মানীর খুব বড় বিদ্যাকেন্দ্র। মুনিক আর্ট চর্চার জন্য বিখ্যাত, সেই সঙ্গে সঙ্গীত চর্চার জন্যও। কবি নীতুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হওয়ায় বেশ আশ্বস্ত। মেয়ে মীরার কাছে সেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন নীতু যেন 'খুব কষে' জার্মানটা অভ্যেস করে।
কবি ১৯৩২ এর ১১ এপ্রিল পারস্য রওনা দিলেন রেজা শাহ পল্লবীর আমন্ত্রণে। গেলেন দমদম এরোড্রাম থেকে K.L.M. প্লেনে করে। কলকাতায় ফিরলেন ৩ জুন প্লেনেই। ফিরেই লাইপজিগে নীতুর গুরুতর অসুস্থতার কথা শুনলেন। কাশি হয়েছে।
নীতুর এই কাশিই প্রাণঘাতী ব্যাধি যক্ষ্মার পূর্বলক্ষণ হয়ে দেখা দিল। লাইপজিগে প্রশিক্ষণ কালে এই অসুস্থতা। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানালেন রোগটি বেশ মারাত্মক যক্ষ্মা - গ্যালপিং টি.বি.। দুটো ফুসফুসই আক্রান্ত।
কবির প্রাণপ্রিয় আদরের নীতু একলা বিদেশ বিভূঁইয়ে মারণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। কবি খুব ভেঙে পড়লেন।কি করবেন ভেবে অস্থির।
তখন লন্ডনে চলছিল গোলটেবিল বৈঠক। গাঁধী বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। গাঁধীর সঙ্গী হয়ে গেছেন এন্ড্রূজ তথা কবির প্রিয় বন্ধু চার্লি। নীতুর কাছে চার্লি খুব প্রিয়জন ছিলেন। এন্ড্রুজকে নীতুর অসুস্থতার খবর দিলেন কবি। খবর পেয়ে চার্লি ছুটলেন জার্মানি। এন্ড্রুজকে পেয়ে নীতুও খুব খুশি। নীতুর প্রিয় চার্লি চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা করলেন। কবিকে আশ্বস্তও করেন চিন্তা করার কিছু নেই। কবিকে চিঠিতে চার্লি জানালেন -
" ... মীরাকে বলো নীতু আমায় পেয়ে খুব খুশি,আরও কিছুদিন তাঁর সঙ্গে থাকতে বলেছে - and I have promised to do so. "
কবি তাঁর প্রিয় প্রাণের ধন নীতুকে নিয়ে কতখানি দুঃশ্চিন্তায় ও উদ্বিগ্নতায় দিন কাটাচ্ছিলেন তা বোঝাতে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে ১৭ জুন একটি চিঠিতে লেখেন -
"যখন থেকে শুনেছি ওকে ক্ষয়রোগ ধরল তখন থেকেই বুঝেছি ওর নিষ্কৃতি নেই। বোম্বাইয়ের ছাপাখানার উপদ্রবে ওর শরীর ভেঙে গিয়েছিল - ভেবেছিলুম য়ুরোপে ওর স্বাস্থ্য ভালো হবে। Mainz - এ ভালোও হয়েছিল,লাইপজিকের শীত ও পরিশ্রম সইতে পারল না। আমার দুঃখ এই যে আমিই ওকে উৎসাহ দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েচি। আমার আপন লোকের সম্বন্ধে বারবার আমি ভুল করেছি, এবারেও তাই ঘটল। মনটা তাই পীড়িত হয়ে আছে। অথচ এরকম মানসিক দুর্বলতার জন্যে লজ্জা বোধ হয়।...."
নিজের জন্য শুধু নয় মীরার কথা ভেবে আরো কষ্ট হয় কবির।। মীরা সাংসারিক জীবনে এতো দুঃখের মধ্যেও নীতুকে নিয়েই ছিল তার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু। কিন্তু সে আশ্রয়টুকুও যদি চলে যায় তাহলে মীরা কি নিয়ে থাকবে... এই ভাবনায় কবি আরো বেশি সর্বহারা বোধ করেন।
নীতুকে এন্ড্রুজ স্থানান্তরিত করেন ব্ল্যাক ফরেস্ট স্কোমবার্গ পল্লিতে এক স্যানাটোরিয়ামে। তখন অবশ্য পিতা নগেন্দ্রনাথ পাকাপাকিভাবে ইওরোপের বাসিন্দা। এই সময় অসুস্থ পুত্রের শয্যার পাশে পিতা আবশ্য হাজির হয়েছিলেন। নীতুর পিতার প্রতি পঞ্জীভূত ক্ষোভ আর ততখানি নেই শেষ বিদায় বেলা যে তাঁর।
নীতুর শেষ শয্যায় মীরাদেবীও হাজির হন। এই গভীর দুঃখের দিনেও পিতা মাতা রইলেন একইভাবে দূরবর্তী হয়ে। তাঁরা কেউ নিকটবর্তী হতে চাননি বলেই কাছাকাছি এসেও রইলেন দূরত্ব বজায় রেখে।
স্কোমবার্গে মাতা-পুত্রের যুগল মিলন ও নীতুর আগের থেকে অনেকটাই ভালো আছে,এই খবর জানিয়ে কবিকে এন্ড্রুজ ২৯ জুলাই টেলিগ্রাম করেন। নীতুর চিকিৎসক ছিলেন স্কিনডার। তিনিই স্যানাটোরিয়ামের খোলা হাওয়ায় নীতুকে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন - স্যানাটোরিয়ামের খোলা হাওয়ায় নীতু সেরে উঠবেন,এই ছিল তাঁর মত। চার্লি সেই মতো ৩ আগষ্ট একটি চিঠিতে কবিকে আশ্বস্ত করে লিখলেন নীতু আগের থেকে অনেক ভালো।
কিন্তু সেই শেষ আশ্বাস। ৬ আগষ্ট নীতুর শারীরিক অবস্থা ভয়ঙ্কর খারাপের দিকে গড়াল। মাঝে মাঝে জ্ঞাণ হারিয়ে যাচ্ছে। একে একে সব আশা শেষ। সবসময় চলল অক্সিজেন। শেষ রাতের দিকে নীতু তার জীবন নিয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারল না। মীরা শেষ স্মৃতিটুকু সম্বল করে বাঁচবেন,মীরাদেবী শেষ রাতে সরম আদরের ধন নীতুকে চেয়েছিলেন একটু দুধ খাওয়াতে। নীতু বলেছিলেন -
"কাল সকালে খাবো।"
মায়ের সঙ্গে এই তার শেষ কথা। ২২ শ্রাবণ (৭ আগষ্ট) মায়ের হাতে আর দুধ খাওয়া হলো না নীতুর। ১৯৩২ এর ৭ আগষ্ট মাত্র কুড়ি বছর আট মাস বয়সে থেমে গেল কবির প্রাণপ্রিয় আদরের নীতুর তথা নীতিন্দ্রনাথের চলার পথ।
আশ্চর্যের বিষয় কবির কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন মায়ের মৃত্যুদিনে,আর এই ২২ শ্রাবণ নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনও হবে কবির মৃত্যুদিন।
শমীন্দ্রনাথের মতো কবিজীবন থেকে আরেক নক্ষত্র নীতিন্দ্রনাথ খসে পড়ল অকালে। কবি স্থিতধী চিত্তে শুধু মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে বলেন -
"আরো কিছু আছে নাকি
আছে বাকি
শেষ বজ্রপাতে।"
(ক্রমশ)
***************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১২ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
স্কোমবার্গে নীতুর মৃতদেহ দাহ করার ব্যবস্থা ছিল না। সেখান থেকে দূরবর্তী গ্রামের সমাধিক্ষেত্রে নীতুর মরদেহের শয্যা পাতা হয়। মীরাদেবী নিজের হাতে ছেলেকে সাজিয়ে শেষবারের মতো দেখলেন অপূর্ব এক মায়াদৃষ্টিতে। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। অন্তিম যাত্রায় গ্রামবাসীরা যোগ দিয়েছিল। প্রকৃতির কোথাও যেন বিষাদের সুর ছিল না। পাইনের সারি সারি গাছ। যেন বাতাস গান গেয়ে যাচ্ছে। তারই মাঝে নীতুর মরদেহ শায়িত হলো। ফুলেরা সমাধিক্ষেত্রে যেন ঝুঁকে পড়ছে নীতুর পায়ের কাছে। গরমের দিনে এত রাশি রাশি ফুলেরাই বা কোথায় ছিল। গাছে গাছে লাল লাল ফল পাখিদের সে কি মহাভোজ! - এই সব দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে এন্ড্রুজ কবিকে এক পত্র লিখেছিলেন। নীতুর মৃত্যুতে প্রকৃতির অংশগ্রহণ পত্রের প্রতি ছত্রে ছত্রে বর্ণনা দিয়েছিলেন এন্ড্রুজ। তাতেই কবির সান্ত্বনা পাওয়ার ছিল দুঃখকে জয়ের প্রেরণা।
নীতুর শোকে পুত্রহারা এক মাকে সান্ত্বনা দিতে ১৯৩২ এর ২৮ আগষ্টে এক পত্রে লিখেছিলেন -
"....যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে। তেমনি নীতুর চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলাম তখন অনেকদিন ধরে বারবার করে বলেচি,আর তো আমার কোনো কর্ত্তব্য নেই,কেবল কামনা করতে পারি এর পরে যে বিরাটের মধ্যে তার গতি সেখানে তার কল্যাণ হোক। যেখানে আমাদের সেবা পৌঁছয় না, কিন্তু ভালোবাসা হয়তো পৌঁছয় --- নইলে ভালবাসা এখনো টিকে থাকে কেন?..."
এইভাবে কবি মীরার দুঃখে যত বিচলিত হতেন তত পত্র লিখে লিখে তাঁর মনকে সকল দুঃখ সইবার সাহস যোগাতেন। কবি চাইতেন নিজের দুঃখের কষ্ট সহ্য করার মতো সন্তানদেরও সহ্য করার ক্ষমতা যেন হয়ে ওঠে। মীরার দীর্ঘায়ু বলে মীরার সঙ্গে কবির পত্রালাপ বেশি হয়েছিল। কবি মীরাকে তাঁর পুত্র হারানোর যন্ত্রণা লাঘব করতে দীনের পর দিন চিঠি লিখেই যেতেন। আর তা থেকে মীরাদেবী জীবন সম্পর্কে এখন নির্মোহ মানসিকতা লাভ করেছিলেন। জীবন থেকে স্বামী চলে যাওয়া, প্রাণপ্রিয় পুত্র নীতু অকালে চিরতরে বিদায় নেওয়ার মধ্যে কি অসাধারণ নির্লিপ্ততা দেখে যে কেউ আবাক হতেন। এ নির্লিপ্ততা ভাবের মূলে সত্যবাদিতা,স্পষ্টবাক্য, মিথ্যাচারিতা তার ধাতে প্রধান ছিল বলে, হয়তো সকল বিষয়ের মধ্যে সত্যের অনুসন্ধিৎসু মন সব বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকতে সাহায্য করত। তার উপর কবিও অনেকটাই পত্র লিখে সব সইতে সাহায্য করতেন। নীতুর সকল দুঃখের জন্য তাঁরাই দায়ী এ সত্য এতো বেশি ছিল, তাই হয়তো নীতুর মৃত্যুর মধ্যে সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়াতো। ঐ যে কবির কথায় প্রভাবিত হয়ে ভাবতেন-- নিজের অশ্রু দিয়ে নীতুর মহৎ সিদ্ধির পথে বাধা হতে চান না। তাই তো সহজ সত্য মেনে নিয়ে বড়ই নির্লিপ্ত থাকতেন মীরাদেবী।
তাছাড়া পিতার থেকে মীরাদেবী একটা ব্যাপারে খুব আলাদা ছিলেন। কবিও মিথ্যা বলা পছন্দ করতেন না। সদাই সত্য বলার পক্ষপাতী ছিলেন। তবে অপ্রিয় কথা বলতেন না। কদাচিৎ অসহ্য হলে, কাউকে রূঢ় কথা বললে তৎক্ষণাৎ তা পরিহাসের রসে সিক্ত করে তার ধার কমিয়ে দিতেন। অবিলম্বে ক্ষমা চাওয়ার দরকার হলে তাই করতেন।
কিন্তু মীরাদেবীর মধ্যে এসবের বালাই ছিল না। অপ্রিয় হলেও বা সত্য হলেও অপ্রিয় বলতে দ্বিধা করতেন না। আর তার জন্য লঘু পরিহাস করার কোনো বালাই ছিল না। মীরা দেবীর এই গুণটি ছিল একান্তই নিজস্ব। তাই নীতুর বিয়োগ ব্যথায় তাঁকে ততখানি কাতর করে তোলেনি। সত্যকে সহজ মনে নেওয়ার অসাধারণ সহিষ্ণুতা দেখিয়েছিলেন।
নীতুর মৃত্যুর মধ্যে কবি নিজের ও মেয়ে মীরার সান্ত্বনা খুঁজলেন - সে নেই, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার মধ্যে সে আছে। আর সেই ভালবাসার পরিণতি হিসেবে কবির কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল 'পুনশ্চ'-এর একের পর এক কবিতা। কাব্যের উৎসর্গ পত্রে কবি লিখেছিলেন দুটি মাত্র শব্দ - 'উৎসর্গ নীতু'। আরো একের পর এক সৃষ্টির উল্লাস বর্ষাধারার মতো নেমে এসেছিল - পত্রধারা,ভাষণ,গল্পোপন্যাস 'দুই বোন'-এর খসড়া,সে তো দুঃখের অমলিন শিখা।
মীরার ফিরে আসার দিন আসন্ন। কবি পুত্রহারা জননীর মুখ দেখে নিজেকে কীভাবে সামলাবেন তাই নিয়ে ভেবে অস্থির।
প্রায় বছরখানেক পরে জার্মানি থেকে নীতুর কিছু জিনিসপত্র, রচনা, ডায়রি,দিনপঞ্জী প্রভৃতি শান্তিনিকেতনের ঠিকানায় এসে পৌঁছায়। সেই দিনপঞ্জী পড়ে কবির মনন অধ্যাত্ম অণ্বেষণের এক নতুন দিশা পায়। আর সেই উপলব্ধি কবি প্রিয় নাতনি, নীতুর বোন ও মীরার মেয়ে নন্দিতাকে এক পত্রে জানিয়েছিলেন।
নন্দিতা ছিলেন কবির দিদিমণি, বুড়ি,বৃদ্ধা,মেমসাহেব,বেঁটে ছাতাউলি, চড়ুই পাখি। এইভাবে কত কত নামে ডেকে ডেকে - ডাকের মধ্য দাদামশাইয়ের আদর ঝরে ঝরে পড়ত।
যেমন দাদামশাই তেমনি নাতনি। ঠিক যেন হাঁড়ির মুখে প্রমাণ মাপের ঢাকনা! এক একদিন কথায় কথায় এমন হয় যে বুড়ির কাছে বুড়ো ছেলে খাবো না বলে মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন বুড়িও গটগট করে চলে যান - না খেয়েছে তো বয়েই গেছে। খিদে পেলে ও এমনি খাবে। খাওয়ায় উপর রাগ ওটি চলবে না। খিদেই রাগের সব দেমাক ঘুঁচিয়ে দেবে। বুড়ির এই জেদের কাছে নিরুপায় দাদামশাইয়ের চোখে জল -- বেঁটে ছাতাওয়ালীর ডাক পড়ে। বুড়ির সেই রাগের সময় কবির পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীও ডাকতে ভয় পেতেন। শেষে অনেক নমঃতুষ্টি,মানভঞ্জন .. কবিকে মানতে হয় বুড়ির জিত। তখন বুড়ির সেকি আনন্দ! সেই সাথে দাদামশাইয়ের আনন্দ হতো হারের জন্য।
আসল কথা নাতনীর কাছে তো কবি কোনো বিরাট মানুষ নন। একান্তই দাদামশাই। তার মতো করে দাদামশাইকে সে পেতে চান। কবিও সেইভাবে ধরা দেন। তাই যখন দাদামশাইয়ের খুব নকল রাগের ভান জাগে তখন তিনি দিব্যি বলেন -
"আমার রক্ত তোমার শরীরে আছে,নৈলে তুমি এতো নিষ্ঠুর হবে কেন।"
কবি নন্দিতা নিয়ে যে শব্দবন্ধ ব্যবহার করতেন -
"অতিপরিচয়ের অস্পষ্টতা"-
অর্থাৎ স্নেহ এমন বিষয়বস্তু স্নেহের কাছে সব অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। সবার কাছে কবি মহামানব, কিন্তু নন্দিতার কাছে অতি সাধারণ হয়ে ধরা দিতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান। নন্দিতাও তার দাদামশাইকে সেভাবে পেয়ে এসেছেন। তাতে একটু এধার ওধার হলেই রাগ-অভিমান ... সব এসে চেপে বসে।
যেমন একবার কোনো কারণে নন্দিতাকে ভর্ৎসনা করে ফেলেছিলেন কবি। তারপরে কবির নিজেরই মন খারাপ হয়। তা থেকে একটি তারিখহীন চিঠি নন্দিতাকে লিখেছিলেন, তাতে নীতুর কথাও উল্লেখ ছিল। প্রবল দুঃখে নন্দিতার মধ্যে থেকে কবি নীতুকেও পাওয়ার চেষ্টা করতেন। নন্দিতার মধ্যে নীতু ও নন্দিতা দু'টি যেন একাকার। সেই কথা বুঝিয়ে পত্রে লেখেন -
"বুড়ি/ কাল উত্তেজিত হয়ে হঠাৎ তোকে বকেছি --- তাতে আমার মনটা খারাপ হয়ে আছে। সন্ধি করবার জন্য দু' শিশি সুগন্ধ পাঠাই। এ বিষয়ে তোর সঙ্গে ঝগড়া করব না। মানুষের মনকে উঁচু সুরে যদি না বাঁধা যায়, যদি Intellectual বিষয়ে তার অনুরাগ না জন্মায় তাহলে স্থূলের দিকে সে নেমে যায়। নীতুর মন স্বভাবতই intellect-এর দিকে আধ্যাত্মিকতার দিকে বিকশিত ছিল -- সেই জন্য তার আকাঙ্খা ছিল উপরের দিকে --- তার মধ্যে আশ্চর্য একটি ভদ্রতা ও self discipline ছিল --- তার dairy-তে তারই পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। সেটা পড়ে খুব গৌরব প্রকাশ বোধ করেছি।.... নীচে স্থূলতার মধ্যে নেমে যাওয়া খুব সহজ, ভদ্রতার সাধনায় অনেক discipline এবং চেষ্টা ও শিক্ষার দরকার করে।
যাই হোক তোর সঙ্গে বকাবকি করব না। যা তোর স্বভাবের বিরুদ্ধ তা নিয়ে তর্ক করে ফল কী হবে!...."
এইভাবে নন্দিতার মধ্যে কবি নীতুর বিয়োগ ব্যথা থেকে সান্ত্বনা খুঁজতেন আর পাঁচজন সাধারণ দাদামশাইয়ের মতো হয়ে।
( ক্রমশ)
**************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য '
( পর্ব - ১৩ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
কবির পালিতা কন্যা ও পুত্র বধূ প্রতিমা দেবীই কবির জীবদ্দশায় সবচেয়ে বেশি নীর্ভরতার আশ্রয় ও আপন সন্তানদের চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন। কবির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত প্রধান ছায়াসঙ্গিনী হয়ে থাকতে দেখি। কবির সকল সৃষ্টির রসধারায় প্রতিমাদেবীর সঙ্গতে রবীন্দ্রনাথ বেশি আনন্দ পেতেন। কবির ছোটো আমি( দৈনন্দিনতায়)ও বড় আমির ( সৃষ্টির আনন্দ) প্রকৃত অংশীদার কবি প্রতিমাদেবীকেই বেশি ঘনিষ্ঠ মনে করতেন। তাই কবির জীবনাবসান পর্যন্ত সেবাযত্ন থেকে দেখভালের দায়িত্ব প্রতিমাদেবী নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিলেন। কবির নিজের সন্তানেরা কবির কাছে যতটাই প্রিয় ছিলেন প্রতিমাদেবী যেন মনে হয় তার চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন।
শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ হতে পারেন বটে, প্রতিমাদেবী তাকে গতিশীলতায় বিচিত্রমুখী করে তোলার অনন্য ভূমিকায় ছিলেন। তাই কবিজীবনের এক বিরাট অংশ জুড়ে প্রতিমা দেবীকে পাই। প্রতিমাদেবীকে নিয়ে আলোচনা না হলে কবির সন্তান বাৎসল্যের স্বরূপের এক গুরূত্বপূর্ণ অধ্যায় অজানা থেকে যাবে। কে এই প্রতিমাদেবী।
কবিরা পিরালি ও তার উপর ব্রাহ্ম ছিলেন বলে পরিবারের কাছকাছি সম্পর্ক,অথচ রক্তের সম্পর্কহীন স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ে হতো। বিশেষ করে আভিজাত্যের নীলরক্ত ততটা বাইরে ছড়িয়ে পড়ুক ঠাকুর পরিবার চাইত না। তাই পুত্র, কন্যা জামাই,নাতি, নাতনি সবাইকে ঠাকুর পরিবারের ছাতার তলায় থাকতে হতো। কি জোড়াসাঁকো,পাথুরিয়াঘাটা ... এই নিয়মটা সব জায়গায় এক ছিল। আর বৈবাহিক সম্পর্কের বৃত্ত গড়ে উঠত পাথুরিয়াঘাটা-চোরাবাগান-কয়লাহাটা-জোড়াসাঁকোর মধ্যে। প্রতিমাদেবী জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ীর অবন ঠাকুর,গগনঠাকুরের বোন সৌদামিনীর সন্তান বিনয়িনীর মেয়ে। সম্পর্কে পাঁচনম্বর বাড়ির দৌহিত্রী।
সৌদামিনী ও মৃণালিনী- উভয়ের বাপের বাড়ি যশোর। তাই পরস্পরের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। মৃণালিনী দেবী সৌদামিনীর ফুটফুটে অপূর্ব সুন্দরী নাতনীকে দেখে ছেলে রথীন্দ্রনাথের বউ করার ইচ্ছে পোষন করেন। সে খবর সবার জানা ছিল। সবাই জানত মৃণালিনীদেবীর কাছে প্রতিমাদেবী হলেন পালিতা কন্যা,আবার হবু বৌমাও বটে। জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর ও ছ'নম্বরে যোগসূত্র প্রতিমাদেবী।
কিন্তু মৃণালিনী দেবীর আকস্মিক মৃত্যুতে কবি মানসিকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এদিকে প্রতিমা এগারোয় পা দিয়েছেন। এগারোই ছিল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স। তাই কবির কাছে প্রস্তাব এলো, রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রতিমার বিয়ের ব্যাপারে। কবি তখন রথীর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ব্যস্ত। রথীকে বিলেত পাঠাবেন কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার জন্য। তাই বিয়েতে কবি গা করলেন না। পাত্রী পক্ষ ভেবেই নিলেন কবির অমত বিয়েতে।
শেষে প্রতিমাদেবীর বিয়ে হলো গুনেন্দ্রনাথের ছোটো বোন ও কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সঙ্গে। কিন্তু সে বিয়ে দিন কয়েকের বেশি টিকল না। নীলানাথ গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিলেন। ফলে প্রতিমাদেবীর অকাল বৈধব্য দশা দেখা দিল। অপয়ার অপবাদ নিয়ে মা-বাপের কাছে চলে আসতে হল প্রতিমাদেবীকে। ইত্যবসরে রথীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন। তখন রবীন্দ্রনাথ স্থির করলেন রথীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যেতেই পারে।
ঠাকুর বাড়ি থেকে বিধবা বিবাহ! এতো এক দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত হবে সমাজের চোখে। কবির বিধবা বিবাহে সমর্থন ও নিজে অংশগ্রহণ করেছেন জানলে সমাজে আরো অনেকে বিধবা বিবাহে এগিয়ে আসবেন। তখন বিদ্যাসাগর বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন।
কবি প্রতীমাদেবীর মামা গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কথা বললেন। গগনেন্দ্ররা ছিলেন হিন্দু,কবিরা ব্রাহ্ম, কেননা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের পরিবারকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা দিয়ে ছিলেন। ফলে হিন্দুধর্ম মতে বাধা আসার ভয়ে বিনয়িনী সমাজে একঘরে হওয়ার ভয় পেলেন -
"আমাকে যে সমাজ এক ঘরে ঠেলবে। আমার আরো ছেলেমেয়ে আছে তাদের বিয়ে দিতে হবে।"
আস্বস্ত করলেন গগন ঠাকুর -
"তোমাদের ভয় নেই। তোমাদের পেছনে আমি আছি। তোমায় সমাজ ত্যাগ করতে বললে আমিও সমাজ ত্যাগ করব। তাই বলে একটা বাচ্চা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। আর বাইরের ছেলে নয়। রবিকাকা রথীর সাথে বিয়ে দিতে চান। ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকবে। তুমি অমত করো না। এখন প্রতিমার মত নেওয়া দরকার। তাকে বোঝাতে হবে।"
প্রতীমা দেবী প্রথমে বিয়ে করতে রাজি নন। সংস্কারের বশবর্তী হয়ে। তাই নিয়ে খুব জলঘোলা হতে লাগল। ছেড়ে আসা শ্বশুরবাড়ির লোকজন তথা কুমুদিনীর পরিবারও খুব আপত্তি তুলল। প্রতিমার প্রতি ঘৃণা পোষন করতে লাগলো। তখন গগণ ঠাকুর সমাজকে অগ্রাহ্য করে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। যেমনভাবে কবি পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়ে রেনুকার মৃত্যুর পর জামাতা সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিধবা সতীন্দ্রমোহনের মেয়ে ছায়ার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন,এও তেমনি। প্রতিমার বিয়ে দ্বিতীয় বিধবা বিবাহ, তবে জোড়াসাঁকোয় এই প্রথম। ছায়ার বিয়ে ১৯০৮-এ। প্রতিমা ১৯০৯-এর কোনো এক সময়ে।
প্রতিমাদেবী ছিলেন অপূর্ব দেখতে। কবির বড় মেয়ে মাধুরীলতার চেয়েও - মূর্তিমতী লক্ষ্মীশ্রী। আর রথীন্দ্রনাথ প্রতিভাকে পেয়ে কবির জামাতা নগেন্দ্রনাথাকে বলেছিলেন -
"...সে কি চমৎকার মেয়ে তোমাকে কী করে লিখি। আমি যদি তার গুণের বর্ণণা করতে যাই তো সব কথা বিশ্বাস করবে না বা আমাকে Lunatic ভাববে।"
এগারো বছরে বিয়ের বয়স যখন চূড়ান্ত বলে বিবেচ্য হয়,ফলে মেয়েরা ঠাকুর বাড়িতে যখন বৌ হিসেবে ঢোকে তখন শিক্ষা দীক্ষাই বা কতটুকু নিয়ে আসে! যখন মৃণালিনী দেবী ঠাকুর বাড়িতে এলেন তখন মৃণালিনী দেবীর ঠাকুর বাড়ির ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা দীক্ষা নতুন করে শুরু হয়। এ হল ঠাকুর বাড়ির প্রথাগত রীতিনীতি।
প্রতিমা দেবীর বিয়ে হলো যখন তখন রথীন্দ্রনাথ একুশ, প্রতিমাদেবী ষোলো। প্রতিমাদেবীর শিক্ষা শুরু হলো মিস বুর্টেড এর কাছে। কবিও নজরে রাখতেন। বয়সটা বেশ পরিণত বলেই সবকিছু প্রতিমাদেবী দ্রুত শিখতে লাগলেন। অসাধারণ ধীশক্তি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সবকিছু অনায়াসে আয়ত্ব করে ফেললেন। এমনকি লেখা জোখাও শুরু হয়ে গেল।
'স্মৃতিচিত্র' গ্রন্থে লিখলেন -
".... মামার বাড়ি ও বাপের বাড়ি তখনও হিন্দুসমাজভুক্ত, তাঁদের আদব কায়দা দস্তুর, জীবনযাত্রার প্রণালী সবই সনাতনপন্থীদের মতো,শুরবাড়ির আবহাওয়ায় পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ও নবযুগের আভাস পাওয়া যায়।"
অর্থাৎ প্রতিমাদেবী স্মৃতি কথা থেকেই জানা যাচ্ছে দুই বাড়ির যোগসূত্রে দু'রকম জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ছুঁয়ে ছিলেন। শ্বশুর বাড়ির প্রগতিশীল চিন্তা ও চেতনায় তিনি তাঁর প্রতিভার যথার্থ স্ফূরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। তা থেকেই কিভাবে সাহিত্য,শিল্প ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান ছিল তাই নিয়ে পরের আলোচনা।
( ক্রমশ)
**************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১৪ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
প্রতিমাদেবী ছিলেন অনবদ্য চিত্রকর। মামা অবনীন্দ্রনাথের কাছে হাতে খড়ি। বংশগত সূত্রে অর্জিত এই প্রতিভা। মা,মাসি সুনয়নী দেবী,মামারা( অবন ঠাকুর,গগন ঠাকুর) ছিলেন সব অনবদ্য চিত্রকর। বিয়ের পরও প্রতিমাদেবীর ছবি আঁকার অনুশীলন সমানে চলে। কবির সৌজন্যে। ইতালিয়ান শিক্ষক গিলহার্ডি ছিলেন তাঁর শিক্ষা গুরু। আর কবি তো অনুপ্রেরণা দাতা। সঙ্গে আছেনই।
পরে নন্দলাল বসুর সঙ্গে থেকে কাজে আরো পরিপক্বতা আসে। আর সেই থেকে কবিও চিত্র রচনায় আগ্রহী হন। প্রতিমাদেবী ছিলেন কবির অনবদ্য পৃষ্ঠপোষক।
যখন রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে সকলে একটা দুর্বোধ্যতার জিগির তুলছিলেন তখন প্রতিমাদেবী কবির ছবির অসাধারণ বিশ্লেষক ও রসবেত্তা হয়ে ওঠেন। কবির ছবির রসোপলব্ধির তিনিই পথ তৈরি করেছিলেন। তিনিই বিদগ্ধ রসবেত্তার মতই বলেছিলেন -
".... আর্টিস্টরা যে কল্পনা দিয়ে ছবি শেষ করেন, তাঁদের সেই শেষের কথা দিয়েই গুরুদেবের ছবি আরম্ভ হয়েছে। সাধারণত আর্টিস্টরা ছবির ভূমিকা ভেবে ছবি আঁকেন। চিত্রের চরিত্র-সংঘাত,পটভূমি এবং রং-এর তালিকা প্রথম থেকেই মনের মধ্যে চিন্তা করে নেন। তারপর চিত্র যখন জমে ওঠে,তখনি আসে তাঁদের ধ্যানের স্তর। কিন্তু কবির ছবি তাঁর ধ্যানের মধ্যেই শুরু হয়ে যেত। ছবির লাইন রং কম্পোজিশন তাঁর আঙুলের ডগা থেকেই যেন স্বতোঃউচ্ছ্বসিত হয়ে নিঃসৃত হত। তাঁর মধ্যে সচেতন মনের প্ল্যান করা কোনোও মোটিভ থাকতো না। .... বস্তুত ভাষাতে তিনি যেমন কালিদাস বা বৈষ্ণব পদাবলীর অনুসরণ করেননি,তুলিতেও তিনি কাংড়া-মোগল-অজন্তার ধার ধারেননি।..."
স্বয়ং কবির কথায়ও পাই -
"যখন আমি আঁকি, তখন ছবির প্রকৃতি সম্বন্ধে কোনো চিন্তাই আমার থাকে না কেবল লাইনের সঙ্গে লাইনের সংযোগের খেলার আনন্দ আমায় চিত্রকর করে তুলেছে।"
'পূরবী'(১৯২৫) কাব্য গ্রন্থের পান্ডুলিপিতে একপ্রকার কাটাকুটি থেকেই কবির এই চিত্রচর্চার শুরু। শেষ বয়সে এসে এই নব প্রেম কবিকে নেশাগ্রস্থের মতো আবিষ্ট করেছিল। তাঁর চিত্ররীতির মোট পাঁচটি পর্যায় পাই -
'পূরবী'র পান্ডুলিপিতে কাটাকুটি হল প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় - এই কাটাকুটিতে এল জন্তু, লতাপাতার আভাস। তৃতীয় - এইসব অবয়ব আরো স্পষ্টরূপ পেল। চতুর্থ - সরাসরি ছবি শরু হলো। বস্তু-বিচ্ছিন্ন অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি। পঞ্চম পর্যায়ে এলো প্রাকৃতিক বিষয়,জন্তু-মানুষের শরীর ও বিশ্বপ্রকৃতি। বাড়তে লাগল রেখা,আলো,ঘণত্ব,গভীরত্ব, রঙের দ্যুতি। শুধু ছবিতে নয়,নির্মিতিতে এল একপ্রকার নিজস্বতা। কবির ছবি সম্পর্কে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন -
"এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে চিত্র রচনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা এক নতুন আয়তন ( dimention) পেয়েছে। একমাত্র কবি উইলিয়াম ব্লেক ছাড়া অন্য কোনো পাশ্চাত্য সাহিত্যিক নিজের সাহিত্য প্রতিভাকে চিত্রশিল্পের মধ্য দিয়ে এমন সার্থকভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হননি।"
প্রতিমাদেবীর বিশ্লেষনে বোঝা যায় গুরুদেবের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও জীবজন্তুর চিত্র ফরাসীদের খুব আকৃষ্ট করেছিল। মানুষের মুখের প্রতিকৃতির জার্মানরা খুব ভক্ত ছিলেন। কবির ছবির স্বাদ পেতে হলে চাই দিব্য দৃষ্টি - "দিব্যদৃষ্টি দিয়ে কেউ যদি সে জিনিস ধরতে পারল তো বুঝল। নইলে খনির ভিতর মণির মতো তার দীপ্তি রইল ঢাকা।" কবির ছবির সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে প্রতিমাদেবী বলেছিলেন-
"...শেষ বয়সের প্রিয়া।"
দু'হাজারেরও বেশি কবি ছবি এঁকেছিলেন। রঙে রেখায় ছবি এসেছিল সে অগ্ন্যুৎপাতের মতো, যাকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন 'ভলক্যানিক ইরাপশন।' এই গতির অনুপ্রেরণায় ছিলেন ভিকতোরিয়া ওকাম্পো। প্রতিমাদেবীর মতো কবির চিত্ররীতি নিয়ে এমন রসজ্ঞ বিশ্লেষকের মতো অত গভীরে কেউ প্রবেশ করতে পারেননি। কেননা প্রতিমাদেবীও যে ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ চিত্রশিল্পী।
প্রতিমাদেবীর কারুশিল্পেও গভীর টানের পরিচয় পাই। কবির সঙ্গে বিশ্বভ্রমণের সযয় যখন যে দেশে গেছেন সেই দেশের হস্ত শিল্পের সঙ্গে ঘণিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছেন। এবং সেই ভাবধারা শান্তিনিকেতনে নিয়ে এসেছেন। যেমন ইন্দোনেশিয়া থেকে কাপড়ের উপর বাটিকের কাজ দেখে এমন মুগ্ধ হয়েছিলেন,এই বাটিক শিল্পকে তিনি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে আনেন শিক্ষক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।
আবার ফ্রান্স থেকে সেরামিকের কাজ শিখে এসে শ্রীনিকেতনে শেখাবার ব্যবস্থা করেন। রথীন্দ্রনাথের কাঠ ও চামড়ার কাজের উপর প্রতিমাদেবীর নিজের দেখা বিদেশি নক্সা মিশিয়ে দিয়ে গড়ে তুললেন নতূন ধরনের ট্রে, ফুলদানি,ল্যাম্পশেড ও নানাধরনের পাত্র। বর্তমানে কাপড়ে বা চামড়ার ব্যাগে,মোড়ায় বা ঘর সাজানোর শান্তিনিকেতনী ঘরানা বলে আমরা যাকে বুঝি তা আসলে প্রতীমাদেবীরই অবদানের ফল।
এতো গেল ছবিতে প্রতিমাদেবীর অবদানের কথা। ছবির সাথে সাথে কথায় তথা লেখাজোখায় ছবি আঁকবেন কীভাবে কবির 'কল্পিতাদেবী'- তাই নিয়ে পরের আলোচনা।
(ক্রমশ)
***********
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১৫ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
কবির দেওয়া কল্পিতাদেবী নাম নিয়ে প্রতিমাদেবী অনেক কবিতা লিখেছিলেন। কবিতা লিখেই কবির কাছে দেখাতে যেতেন, কোথাও কোনো সংযোজন-বিয়োজন,কেমন হয়েছে জানতে। কবির কাছে যেতে বুক ঢিপঢিপ করত,কি জানি কেমন হয়েছে,কি বলবেন, বকুনি অপেক্ষা করছে কিনা ... এজন্য আরকি! আবার না দেখালেও স্বস্তি ও তৃপ্তির কোনোটাই নাই।
কবি সব মন দিয়ে দেখতেন। মাঝে মাঝে কোনো কোনো কবিতায় কলম চালিয়ে কবিতার জৌলুসটাই বদলে দিতেন। কবির হাতের ছোঁয়ায় তখন কবিতাটিই ধন্য হয়ে উঠত। আবার কখনো কখনো কোনো কোনো কবিতাকে ভেঙে চুরে একেবারে নতুন রূপ দিয়ে দিতেন। যেমন -
'স্মৃতি' কবিতায় প্রতিমাদেবী লিখলেন -
'এই গৃহ এই পুষ্পবীথি
যারে ঘেরি একদিন তোমার কল্পনা
গড়েছিল ইমারত দীপ্তি গরিমার,
উত্তপ্ত কামনা তব যার
প্রতি ধূলির কণায়
জীবন্ত করিয়াছিল তব মুহূর্তেরে।
যে বাসনা মনে ছিল পুরিল না
অবসন্ন প্রাণ
গেল চলে ছায়া ফেলে
অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।'
রবীন্দ্রনাথ ভাষা বদলে লিখলেন -
'এই ঘর এই ফুলের কেয়ারি
একে ঘের দিয়ে তোমার খেয়াল
বানিয়েছিল পরীস্থানের ইমারৎ।
তোমার তপ্ত কামনা
রাঙিয়েছিল তার প্রত্যেক
ধূলিকণাকে
তার প্রত্যেক মুহূর্তকে করেছিল
তোমার আবেগ দিয়ে অস্থির।
তুমি চলে গেলে,
অকৃতার্থ আকাঙ্ক্ষার ছায়া ভেসে
বেড়াচ্ছে
অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।'
কবির সঙ্গে কবির কল্পিতার এভাবে প্রায়ই লড়াই হতো। তা থেকেই কবির 'লিপিকা'-র বিশিষ্ট গদ্যভঙ্গিটি বিশেষভাবে এসেছিল। যেন গদ্যে রচিত কবিতা - গদ্য কবিতা। যেমন - 'নটী',' মেজবৌ', 'সীনতলা দুর্গ'...।
প্রতিমাদেবী কবির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখলেন 'স্বপ্নবিলাসী'। কবি পড়ে এতো মুগ্ধ হলেন, কবি তারই অনুরূপ লিখে ফেললেন 'মন্দিরার উক্তি'। কবি তাঁর কল্পিতাদেবীকে বললেন পরের অধ্যায় 'নরেশের উক্তি' লিখে ফেলতে। অর্থাৎ কবি লিখবেন 'নারীর উক্তি',আর কল্পিতাদেবী লিখবেন 'পুরুষের উক্তি'। এভাবেই একটা আস্ত উপন্যাস রচিত হয়ে গেল। কিন্তু কবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছোটগল্প লিখতে গিয়ে কল্পিতাদেবী রণে ভঙ্গ দিলেন।
এছাড়া প্রতিমাদেবী লিখলেন কিছু স্মৃতিকথা। মায়ের ডায়েরি অবলম্বনে 'কাহিনী' অবলম্বনে লেখা 'স্মৃতিচিত্র'। এতে জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির মেয়েদের কথা আছে। মেয়েরা উৎসবের সময় কীভাবে সাজে, ঠাকুরবাড়িতে মূর্তিপূজো বন্ধ হওয়ার কথা, মূর্তি পূজা বন্ধ হয়ে গেলেও কলকাতা থেকে তো আর দোল- দুর্গোৎসব উঠে যায়নি। তাই নিয়ে প্রতিমাদেবী লিখছেন -
"প্রতি উৎসবেই মেয়েদের তখন বিশেষ সাজ ছিল। বাসন্তী রঙে ছোপানো কালো পেড়ে শাড়ি, মাথায় ফুলের মালা, কপালে খয়েরের টিপ -- এই ছিল বসন্ত পঞ্চমীর সাজ। দুর্গোৎসবে ছিল রঙবেরঙের উজ্জ্বল শাড়ি, ফুলের গয়না,চন্দন ও ফুলের প্রসাধন।....
দোল পূর্ণিমারও একটি বিশেষ সাজ ছিল,সে হল হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না,আর আতর গোলাপের গন্ধমাখা মালা। দোলের দিন সাদা মসলিন পরার উদ্দেশ্য ছিল যে আবিরের লাল রং সাদা ফুরফুরে শাড়িতে রঙিন বুটি ছড়িয়ে দেবে।...
সে সময় দিনে সোনার গয়না বিকেলে মুক্তোর গয়না এবং রাতে হিরে জহরতের জড়োয়া পরার রেওয়াজ ছিল। বিয়েবাড়িতে বা উৎসবের দিনে তাঁরা এভাবেই সাজতেন।"
কবি অনেককেই গল্পের বীজ জোগাতেন। যেমন - চারুচন্দ্র,শরৎকুমারী,মাধুরীলতা, তবে পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীর জন্য যেন অন্যমাত্রায় কবির ভেতরে আন্তরিকতা কাজ করতো। তাঁদের মধ্যে চলত গল্প লেখার খেলা, কবিতা বদলের কারিগরি।
একেবারে শেষ বয়সে লেখা কবির 'বদনাম' গল্পটির সঙ্গে প্রতিমাদেবীর 'গল্প-এক'-এর মিল দেখে চমকে উঠতে হয়। শুধু পার্থক্য কবির গল্পে রচনার সাল আষাঢ়-১৩৪৮, কিন্তু প্রতিমাদেবীর গল্পে কোনো সাল তারিখের উল্লেখ নেই। আর কবির রচিত কাহিনীর সঙ্গে প্রতিমাদেবীর রচিত কাহিনীর কিঞ্চিত পার্থক্যও লক্ষ্য পড়ে। যেমন প্রতিমাদেবীর গল্পে সদু তার স্বামীকে বলছে -
"আমি পিছিয়ে থাকব না। আমিও সঙ্গে সঙ্গে যাব। তবে এত সাহস কি তোমার হবে যে, তুমি কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে,এই লোক তোমার স্ত্রীর প্রণয়ী -- কাগজে বেরোবে তোমার গৃহিণী সৌদামিনী দেবীর অপূর্ব কীর্তির কথা। পারবে সে সব সইতে?"
আর কবির সদু স্বামীকে ভয় দেখায়নি,বলেছে -
"দু'দিন পরেই সমাজের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কিরকম নিন্দায় ভরে উঠবে আমি তা জানি।... আমি চিরদিন তাঁর পিছন পিছন থেকে শাস্তির শেষ পালা পর্যন্ত যাব। তুমি সুখে থেকো। তোমার ভয় নেই। ইচ্ছা করলেই তুমি নতুন সঙ্গিনী পাবে।...প্রাণপনে তোমার সেবা করেছি ভালোবেসে,প্রাণপনে তোমাকে বঞ্চনা করেছি কর্তব্যবোধে,এই তোমায় জানিয়ে গেলুম।"
প্রতিমাদেবীর সদু রক্তমাংসে গড়া নারী,মাটির কাছাকাছি। আর কবির সদু আদর্শের আদলে গড়া।
প্রতিমাদেবীর এই যে ছবি বা গল্প লেখা আসল অবদান নয়, শান্তিনিকেতনে নারীশিক্ষা, মেয়েদের নৃত্য শিক্ষায় অবদান দিয়ে প্রতিমাদেবীকে প্রকৃত চেনা যায় বা চিনতে হয়। ওই জগতে প্রতিমাদেবী ছিলেন সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। তাই নিয়ে পরের আলোচনা।
(ক্রমশ)
***************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১৬ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
প্রতিমা দেবী যে সময় নৃত্য শিক্ষা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন, শান্তিনিকেতনকে নৃত্যের প্রাণকেন্দ্র করে তুলতে চাইলেন, কাজটা কিন্তু অত সহজ ছিল না। মেয়েদের পড়াশোনায় এগিয়ে আনা যাচ্ছে না,নৃত্য তো কোন ছার। কারণ লজ্জার জড়তা। তার উপর প্রকাশ্যে স্টেজের উপর দাঁড়িয়ে তাল মিলিয়ে পা চালানো সে তো রীতিমত লজ্জাজনক। মেয়েদের অত স্বাধীনতা সংসারের পক্ষে মঙ্গল নয়। চারদিকে ছিঃ! ছিঃ! পড়ে যাবে। এই যখন সমাজে মেয়েদের পায়ে বেড়ি লাগানো অবস্থা, সেখানে নৃত্যশিক্ষার কথা এ তো দুঃসাহসিকতার নামান্তর। হ্যাঁ! গোড়া থেকে প্রতিমা দেবীর তাই প্রধান বাধা ছিল। কিন্তু থেমে থাকলে চলবে কেন! শান্তিনিকেতনকে নৃত্য চর্চার প্রাণকেন্দ্র করে গড়ে তোলার একটা ভেতর থেকে জোর তাগিদ বোধ করতেন। এর মূলে একটা ঘটনা ছিল।
তখন সবে নুতন বিয়ে হয়েছে প্রতীমা দেবীর। শান্তিনিকেতনে নতুন এসেছেন। মনের মধ্যে খেলে গেল মেয়েদের নিয়ে একটা নাটক অভিনয় করা যাক। যেই ভাবা অমনি কাজ। নাটকের নাম - 'লক্ষ্মীর পরীক্ষা'। তিনি ক্ষীরির অভিনয় করেছিলেন। সেই প্রথম ও সেই শেষ। হলেন প্রশিক্ষিকা।
নৃত্য শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুললেন। সেই যে শুরু, প্রথম প্রথম বেশ হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পেছনে কবির আশীর্বাদ ও অনুপ্রেরণা শক্তি যাঁর আছে তাঁর আবার ভয় কি! তিনি হয়ে উঠলেন রবীন্দ্র নাট্যের প্রাণ।
কবির 'বাল্মীকিপ্রতিভা' বা 'মায়ার খেলা' দিয়ে শুরু করলেন। সামান্য হাত ও পা নেড়ে,একটু আধটু নাচের ভাব আনার মাধ্যমে সবটাই ছিল অভিনয়। এতে ভালই সাফল্য এলো। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক পরিচালনা করে গেলেন 'চিত্রাঙ্গদা', 'পরিশোধ'...। কবিরও এ নিয়ে বৃহত্তর লক্ষও ছিল, প্রতিমাদেবী সেই লক্ষভেদের সহায় হলেন। প্রতিমাদেবী নাটকের খসড়া প্রস্তুত করে নিয়ে যাচ্ছেন কবি তাকে রূপায়ণে এগিয়ে দিচ্ছেন। আর তার থেকে কবিও নতুন নতুন নাট্যকাব্য,নৃত্যনাট্য,নাটক লিখে যাচ্ছেন। আর নৃত্য শিক্ষার দায়িত্ব সে তো প্রতিমাদেবীর। কোনো দিন নাচ শেখেননি, নৃত্যশিল্পী নন, তাহলে নৃত্য শেখালেন কি করে! ওখানেই বিস্ময়ের শেষ নেই। অসাধারণ শিল্পবোধ ছিল। তাই সম্বল করে কবিকে মজিয়ে দিলেন।
অবশ্য প্রতিমাদেবী যা শেখাচ্ছিলেন তা ভাবনৃত্য। 'বর্ষামঙ্গল'-এ দু'একটা দৃশ্যে নৃত্য দিয়ে বেশ ভালই সাড়া পেলেন। এর পর প্রতিমাদেবি কবিকে অনুরোধ করলেন 'পূজারিনী'কবিতার নৃত্যনাট্যরূপ লিখে দিতে। শুধু মেয়েদের দিয়ে সেটি অভিনয় করাবেন কবির জন্মদিনে। লেখা হল 'নটীর পূজা'। দিনরাত খেটে মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করালেন। শ্রীমতীর ভূমিকায় অভিনয় করে চিরস্মরণীয় হয়ে গেলেন নন্দলাল বসুর মেয়ে গৌরী দেবী।
দীর্ঘ চোদ্দ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের পরিশীলিত ও নিটোল রূপ দিলেন, 'চিত্রাঙ্গদা'য়। এই 'চিত্রাঙ্গদা' কবির নাতনি নন্দিতা অর্জুনের অভিনয় অসাধারণ করতেন। অবশ্য 'শাপমোচন' ছিল 'চিত্রাঙ্গদা'র সাফল্যের ভিত্তি - 'শাপমোচন'- এর পরীক্ষা নীরিক্ষা,আর 'চিত্রাঙ্গদা'য় ফুল মার্কস নিয়ে সাফল্য পেলেন। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত নাহলেও চল্লিশ বার চিত্রাঙ্গদা অভিনীত হয়েছে। 'চিত্রাঙ্গদা'র পর 'চন্ডালিকা'য় আরো পরিণত বোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাটক ও নৃত্যনাট্যে যে দৃশ্যসজ্জা ও রূপসজ্জার একটা শালীন সৌন্দর্য আছে,তা প্রতিমাদেবী কঠোরভাবে মেনে চলতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটকের মঞ্চসজ্জা কেমন হবে তাও তিনি নিজ দায়িত্বে রাখতেন।
এছাড়া 'কথা ও কাহিনী', 'সামান্য ক্ষতি', গল্পগুচ্ছ থেকে 'ক্ষুধিত পাষাণ', 'দালিয়া' প্রভৃতিকে ট্যাবলো ধরনের মূকাভিনয় আকারে রূপায়িত করে কবিকে দেখাতেন। এগুলোতে ভাবনৃত্যের প্রাধান্য ছিল। রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্য নিয়ে প্রতিমা দেবীর নিজস্ব মত ছিল -
"রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য সংমিশ্রণ।"
শান্তিনিকেতনী নৃত্য কোনো নির্দিষ্ট নৃত্যকলার আঙ্গিককে গ্রহণ করেনি। মিশ্র তাল ও ভঙ্গীর সহযোগে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। এই মিশ্রণের আঙ্গিকের জন্য 'চিত্রাঙ্গদা'র মণিপুরী ঢং শুধু মণিপুরি নৃত্যের বৈশিষ্ট্যে আটকে থাকেনি। বা দক্ষিণী আঙ্গিকে 'চন্ডালিকা'কে শুধু দক্ষিণী ঢঙে খোঁজা বৃথা। মিশ্রণের এমনি গুণ। মিশ্রণরীতির সুবিধা হল সঙ্গীতের ভিত্তির উপর নৃত্যকলাকে দাঁড় করানো হয়। এখানেই শান্তিনিকেতনী নৃত্যের নিজস্বতা। সংগীতযোগে নৃত্যই এই প্রথম শান্তিনিকেতন নিয়ে এল,যা প্রাচীন নৃত্যে দেখা যায় না।
এই অভিনব নৃত্যকলার আমদানি প্রতিমা দেবীর। গানের স্বরলিপির মতো নৃত্যলিপির কথা তিনি এনেছিলেন। শিল্পী হারিয়ে যাবে, কিন্তু নৃত্যলিপি থাকলে নৃত্যশিল্প থাকবে। স্বরলিপি যেমন সুর বজায় রাখবে, তেমনি নৃত্যলিপিও নৃত্য বজায় রাখবে।
রবীন্দ্রনাথের সামনে যে নৃত্য ফুটিয়ে তোলা হল, তাকে স্থায়িত্ব না দিয়ে রাখতে পারলে তা সময়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য। তা যাতে না হয় নৃত্যলিপি দিয়ে তাই ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা বোধ করলেন।
প্রতিমা দেবী মেয়েদের দিয়ে নাচ তৈরি করে কবিকে দেখাতেন। কবির অনুমোদন পেলেই তবে তা চিরস্থায়ীত্ব যাতে পায় তারই ব্যবস্থা করতেন।
এই স্থায়িত্বদানের জন্য প্রতিমা দেবী প্রথমে অনুশীলনের উপর জোর দিতেন। সব নৃত্যই ছিল ভাবনৃত্য। গানের ভাবেই প্রকাশ পেত নৃত্যভঙ্গিমা। প্রতিমাদেবী নিজেই নাচের মূদ্রা দেখিয়ে দিতেন। পুরোপুরি নাচ তৈরি করিয়ে দিতেন গানের সঙ্গে তালের মিল দিয়ে,গলার সঙ্গে তালের একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে দিয়ে নাচটা তুলিয়ে নিতেন। নাচের বোল ছাত্রীদের লিখে রাখতে বলতেন এবং কলাভবনের শিল্পীদের দিয়ে নাচের ভঙ্গী আঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।
শান্তিনিকেতনে প্রতিমাদেবী নারীশিক্ষা ও নারীকল্যানের পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। মেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন 'আলাপনী সমিতি'। সহযোগী ছিলেন ইন্দিরা,হেমলতা, সুকেশী, কমলা, মীরা ছাড়াও আরো অনেকে। এই সমিতি মাঝে মাঝে ঘরোয়া ও পুরোপুরি মেয়েলি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করত। গান গাইত। বোলপুরের মেয়েরা এসে জুটত গান শিখতে। গল্প করতে। মাঝে মাঝে প্রতিমা দেবীর ব্যবস্থাপনায় তাঁরা পালা করে পায়ে হেঁটে,কখনো বা গরুর গাড়ি করে গ্রামে গ্রামে যেতেন মেয়েদের কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করতে তাই শেখাতে, টুকিটাকি হাতের কাজ শিখে দু'পয়সা অর্জন করতে ও সঞ্চয় করতে হয় কীভাবে তা শেখাতে। সেইসঙ্গে শরীর ও স্বাস্থের দিকে কীভাবে নজর দিতে হয় তাও শেখাতেন তাঁরা।
গ্রামের মেয়েদের মধ্যে শিল্পশিক্ষায় আগ্রহ তৈরি করতে গৌরী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেখতেন মেয়েরা সূঁচ কিভাবে ধরতে হয় তাই জানেনা। তার উপর গোঁড়ামি তো আছেই। আছে জাতপাত। ঐসব ব্যাপারে প্রতিমাদেবীকে গৌরীদেবী,বাসন্তীদেবী প্রাণপনে সাহায্য করতেন। এতো মেহনত দেখে সুকুমারী দেবী তো একদিন বলেই বসলেন -
"বউমার কি ঝোঁক বাপু,যারা শিখতে চায় না, তাদের জন্য এত কষ্ট করা কেন?"
প্রতিমাদেবীর অভিযান তবু থেমে থাকেনি। ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের ডেকে এনে ক্লাসে বসাতেন। ক্রমে তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে করে সঙ্কোচ কাটাতেন। শেলাই ফোঁড়াই শিখতে এসে যে স্বভাববশত ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে চলত মেয়েরা, এখন তা আর করে না তারা।
এক বালবিধবা শুভা হাতের কাজে এতো দক্ষ হয়ে উঠল, কিছুদিনের চেষ্টায় একটা সুন্দর শাল বানিয়ে ফেললেন যা কিনা কাশ্মীরি শালের থেকে কোনো অংশে কম নয়।
রবীন্দ্রনাথকে প্রতিমা দেবী যত গভীরভাবে বুঝতেন ততখানি বোধহয় অন্য কেউ বুঝতেন না। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবির আদর্শের অনেক সময় সংঘাত হতে দেখা গেছে, কিন্তু সে জাতীয় সংঘাত পুত্রবধূর সাথে কোনোদিন হতে শোনা যায়নি। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যধারার সঙ্গে মতের অমিল হওয়ার জন্য রথীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু প্রতিমাদেবী ছেড়ে যেতে চাননি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শান্তিনিকেতন অন্ত প্রাণ হয়ে থেকেছেন। ১৮৬৯ সালের ৯ জানুয়ারী কবির 'কল্পিতাদেবী'কে শান্তিনিকেতন চির বিদায় জানাল আত্মার চিরশান্তিলোকে পাড়ি দেওয়ার জন্য।
রথীন্দ্রনাথের যখন তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন,অভিমানের নিরুত্তাপ ভঙ্গীটির জন্য তিনি চির রহস্যময়ীর মোড়কে আজও অম্লান। শান্তিনিকেতনের দেওয়াল পর্যন্ত তাই বলে।
( ক্রমশ)
****************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১৭ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
কবির জীবনে একমাত্র রথীন্দ্রনাথ দীর্ঘায়ু ছিলেন। রথীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮৮-র ২৭ নভেম্বর। জন্ম নিয়ে এক মজার ঘটনা ঘটেছিল।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে একটা খাতা ছিল। নাম- 'পারিবারিক খাতা'। তাতে পরিবারের সকলে যা ইচ্ছে হতো তাই লিখতে পারতেন। সবাইকে কোনো না কিছু লিখতে হতো। এতে সকলে মজার মজার ঘটনাও লিখতেন। সাহিত্য চর্চারও ভিত্তি ছিল। একদিন নভেম্বরের গোড়ায় হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐ খাতায় লিখলেন -
"রবিকাকার মেয়ে হবে না। হবে মান্যবান, সৌভাগ্যবান, রবীন্দ্রনাথের চেয়েও গম্ভীর একটি ছেলে।" সেই মাসের শেষের দিকে হিতেন্দ্রনাথের কথা মতোই এলেন কবির দ্বিতীয় সন্তান রথীন্দ্রনাথ।
ছেলে বলে কথা। ছেলেকে নিয়ে কবির আহ্লাদের সীমা নেই। খুব খুশির সঙ্গী করে নিতেন ছেলেকে। ছেলেকে নিয়ে খুব খুশির ছিল পদ্মার বোট-জীবন। সেই সঙ্গে কবির ছেলেকে নিয়ে পদ্মায় ভ্রমণবিলাস খুব প্রিয় সখ ছিল। পদ্মা এতো উন্মাদিনী ছিল যেকোনো মানুষের কাছে খুব ভয়ঙ্কর ছিল। কিন্তু কবির কাছে খুব প্রিয় ছিল পদ্মা। কারণ কবি খুব ভালো সাঁতার জানতেন। সাঁতরে পদ্মা পার হওয়ারও দম ছিল। তিনি ভালো সাঁতার জানতেন বলে ঝড়ের সময়ও বোটে থাকতে ভয় পেতেন না। ছোট্ট থেকে, বলতে গেলে দুধের শিশু রথীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবি যখন তখন পদ্মায় ভ্রমণে বেরোতেন। তাই নিয়ে মৃণালিনী দেবী খুব আপত্তি করতেন। কবি সেসব গ্রাহ্যই করতেন না। কারণ নদীর সঙ্গে কবির যতটাই সখ্য পুত্রেরও তাই হোক। বাবার মতই বোট-জীবনে রথীন্দ্রনাথ অভ্যস্থ হয়ে উঠুক এই ছিল কবির ছেলেকে নিয়ে খুব সখ। আর তা থেকে পিতা-পুত্রকে নিয়ে কত মজাদার ঘটনার কথাই না আছে। যেমন একদিনের ঘটনা -
একদিন এক সন্ধ্যার কিছু পূর্বে কবি ও রথীন্দ্রনাথ বোটের ডেকে মুখোমুখি আরাম চেয়ারে বসে। কবির চেয়ারটা ডেকের ধার ঘেঁষে জলের খুব কাছাকাছি পাতা ছিল। কবির একটা অভ্যাস ছিল,যখন কোনো গুরুতর চিন্তা করতেন তখন পা দুটো বেশ দুলাতে থাকেন। কবি দেখছেন প্রকৃতির অপূর্ব শোভা। সূর্য অস্ত গেছে। পদ্মার জলে যেন সোনাগলা রঙ লেগেছে। চারদিক নিঃস্তব্ধ। সেই সৌন্দর্যে কবি বিভোর। এমন সময় রথীন্দ্রনাথ দেখলেন জলে একটা কিছু ফেলে দিলে যেমন ছোট্ট একটা শব্দ হয়, ঠিক তেমনি শব্দ হল। রথীন্দ্রনাথ ঝুঁকে দেখলেন বাবার পা থেকে বহু পুরণো অতিপ্রিয় কটকি চটির একটা পাটি জলে পড়ে গেছে। ঠিক সেই সময় ঝপাং করে আরেকটা শব্দ হলো। সেই শব্দের মূলে রথীন্দ্রনাথ দেখলেন কবি জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন চটিটাকে তুলে আনতে। স্রোতের টানে চটি তখন অনেকটাই ভেসে গেছে। কবি যত এগোচ্ছেন চটিও তত এগিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা একেই সর্বনাশা,তার উপর এই সামান্য চটি নিয়ে জীবন বাজি রাখা সে সত্যিই বিস্ময়কর ঘটনা। রথীন্দ্রনাথ স্মৃতি কথায় লিখেছিলেন -
"অনেকক্ষণ বাদে জল থেকে উঠে এলেন- মুখে তৃপ্তির হাসি, হাতে চটির সেই পাটিটি। ডেকের ওপর চটিটা রেখে বোটের ভিতরে কাপড় ছাড়তে চলে গেলেন।"
কবি রথীন্দ্রনাথকে নিয়ে পদ্মায় ভ্রমণবিলাস করতেন যখন তখন রথীর মনে প্রকৃতি পাঠ নিয়ে অগাধ আগ্রহ প্রকাশিত হতো। ঐ টুকু ছেলেও বাবার মতো পদ্মাপ্রেমী হয়ে উঠতে থাকেন। কবিও তাই প্রথম থেকে চাইতেন। কৃষি, জমিদারি সব তো রথীকেই সামলাতে হবে। আর এও মনে মনে পোষন করতেন, একপ্রকার উচ্চাশাই পোষন করতেন,ছেলে যেন কবি না হয়ে কৃষিবিজ্ঞানী হয়। তাই শৈশব থেকেই মাটি,নদী,জল, হাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার জন্য কবি সবসময় রথীকে বগলদাবা করে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।
রথীরও মন্দ লাগতো না। ছোটোবেলা তাই বেশিরভাগ সময় শিলাইদহ,পদ্মা তীরবর্তী জমিদারি এলাকা তার খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। নকল জমিদারি জমিদারি খেলতে খুব ভালো লাগত।
সাত আট বছর যখন বয়স, একবার শিলাইদহ থেকে রথীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসেছেন। একেই শ্যামবর্ণ ছিলেন,তার উপর রোদে পুড়ে,জলে ভিজে গায়ের রং আরো একটু কালো লাগে। জোড়াসাঁকোয় অনেক দিন পর হল রথী এসেছেন। তাই পাশের গগনেন্দ্রনাথের বাড়ির জ্যাঠাইমাকে প্রণাম করতে গেছেন। জ্যাঠাইমা রথীন্দ্রনাথকে দেখে বললেন -
"ছিঃ! রবি তার ছেলেকে একেবারে চাষা বানিয়ে নিয়ে এল।"
তাই না শুনে রথীর খুব একটা ভালো লাগল না। এতটাই মনে মনে রাগ হলো যে তারপর থেকে ঐ বাড়িতে যাওয়াই ছেড়ে দিলেন তিনি।
আর ততদিনে রথীন্দ্রনাথ বাংলার পল্লীমঙ্গলের স্বপ্ন দেখে সেই চাষা হতেই চললেন বিলেতে ডিগ্রি লাভে। গেলেন আমেরিকায় ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের জন্য কৃষি বিষয়ক পড়াশোনা করতে। কৃষিবিদ্যায় বি.এস.সি. ডিগ্রি লাভ করে ১৯০৯ এর সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরলেন।
ফিরেই ১৯০৯তেই শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে কাজে যোগ দিলেন। রথীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন -
"এসে দেখি শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আমার জন্য প্রস্তুত- জমিদারির কাজকর্ম তদারক করার ফাঁকে ফাঁকে আমি আমার ক্ষেত খামার গড়ে তুলব,কৃষি নিয়ে পরীক্ষা গবেষণা করব - এই ছিল আমার অভিপ্রায়। যুবা বয়স, কাজ করার জন্য হাত মন নিসপিস করছে - সুতরাং এর চেয়ে বেশি আর কী চাই।...সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। হাউসবোটে কেবল বাবা আর আমি। বারবার মৃত্যশোকের আঘাতে, বিশেষ করে অকালে শমী চলে যাওয়ায়,তাঁর মনে তখন গভীর বেদনা, তিনি নিতান্তই একাকী। দীর্ঘকাল প্রবাসের পর আমি ফিরে এসেছি,সুতরাং তাঁর হৃদয়ের সমস্ত স্নেহ ভালোবাসা তিনি যেন উজাড় করে ঢেলে দিলেন। অনেক দিনের চেনাজানা নদীর বুকে আমরা দু'জনে ভেসে চলেছি।...."
রবীন্দ্রনাথ রথীন্দ্রনাথকে চেনালেন বাংলার পল্লীসমাজ। ছেলের মুখে কৃষিবিদ্যা,প্রজনন শাস্ত্র, অভিব্যক্তিবাদের কথা মন দিয়ে শুনতেন। পিতা ও পুত্রের এমন সম্পর্ক নিয়ে রথীন্দ্রনাথ বলছেন -
"১৯১০ সালের সময়টাতে আমরা পিতা-পুত্র পরস্পরের যত কাছাকাছি এসেছিলাম তেমন আর কোনদিন ঘটেনি।"
শিলাইদহ হয়ে উঠল রথীন্দ্রনাথের যেন ধ্যান-গুহা। গড়ে তুলনেন নিজের মতো করে সাধের প্রশস্ত ক্ষেত। মাটি পরীক্ষার গবেষণাগার। বিদেশ থেকে আমদানি করলেন ভূট্টার বীজ। পশুর খাওয়ারের উন্নতজাতের ঘাসবীজ। তৈরি করলেন চাষের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি। আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কাছ থেকে চেয়ে আনলেন একটা ট্রাকটর। নিজেই চালাতেন। বাংলার কৃষি ও কৃষকের হাল ফেরাতে সে উদ্যোগে রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।
কবির হঠাৎ ডাক পড়ল জোড়াসাঁকোয় আসতে। রথীন্দ্রনাথ এসেই পেলেন প্রতিমা দেবীর মতো অসামান্যা সুন্দরীকে বউ হিসেবে। বিয়ে হলো ১৯১০এর ২৭ জানুয়ারী। বিয়ের পর প্রতিমা দেবীকে নিয়ে শিলাইদহে বেশ কাজের জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন।
হঠাৎ আবার কবির প্রিয় রথিকে দ্বিতীয়বারের জন্য ডাক দিলেন শান্তিনিকেতনের জন্য।
শান্তিনিকেতনের জন্য যে তাঁকে খুব দরকার। কবি যে শান্তিনিকেতনের জন্যই তাঁর রথিকে গড়েছিলেন। শিলাইদহে রথির ভালই কাটছিল - সেই কুঠিবাড়ি, চারদিকে গোলাপ বাগিচা, সুদূরপ্রসারী ক্ষেত,রহস্যময়ী পদ্মা, সেই সঙ্গে কত সুখ দুঃখের কাহিনী মোড়া বজরা... বাবার ডাক ফেলতেও পারছেন না। আবার শিলাইদহের উন্মুক্ত জীবনের উল্লাস ভুলতেও পারছেন না। কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে বীরভূমের রুখাসুখা মাটিতে রথীন্দ্রনাথের কেমন কেটেছিল তাই নিয়ে পরের আলোচনা।
(ক্রমশ)
*******
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব - ১৮ )
✍ মৃদুল কুমার দাস।
পিতা বিশ্বকবির আহ্বানে রথীন্দ্রনাথ শিলাইদহ,পাতিশর থেকে চলে এলেন শান্তিনিকেতনে। রথীন্দ্রনাথের প্রথম প্রথম মনে হতো কোথায় শিলাইদহ,আর কোথায় বীরভূমের রুখাসুখা পরিবেশে শান্তিনিকেতন! প্রথম প্রথম মনের সায় না থাকলেও কিছুই করার নেই। কবির যে বড়ই আত্মনির্ভরতার স্থল শান্তিনিকেতন। ছেলে হিসেবে শান্তিনিকেতন গড়ার দায়িত্বও যে তাঁর আছে। একথা অনেক আগে, যখন ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন সেই ছাত্রাবস্থায় ভাষাবীদ অধ্যাপক আর্থার সেমুর-এর স্ত্রী মেস সেমুরকে রথীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে লিখেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর মূল কাজ হবে বিশ্বভারতীর ভাঙন ঠেকানো। সেই কথার ভিত্তিতে সত্যিকারের যখন চ্যালেঞ্জ এল, বিশ্বভারতী রক্ষার দায়িত্ব এলো, তখনই নিজের সঙ্গে লড়াইয়ে নিজেই হেরে বসে থাকলেন। বিশ্বভারতী থেকে নিজেকেই তিনি সরিয়ে নিলেন। কি সে রহস্য।
শত ব্যস্ততার মাঝেও যেন কোথাও একটা অভাব বোধ তাড়িয়ে বেড়াত। কবির সঙ্গে মতের অমিল যে হতো না তা নয়। কিন্তু কবির গঠনমূলক কাজে শান্তিনিকেতনে তিনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। কবিকে ঘিরে প্রতিমা দেবী একদিকে একটি স্তম্ভ, যে কবির শান্তিনিকেতন ও কবির সকল সৃষ্টির এক কো অর্ডিনেটর। আর রথীন্দ্রনাথ কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানে আরেক স্তম্ভ।
কি তাঁর সেই অবদান!
এঁকেছিলেন মিশ্রমাধ্যমে বহু উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডস্কেপের উপর ফুলের ছবি। চামড়ার উপর কারুকাজ। দারুশিল্পেও ছিল অনায়াস দক্ষতা। আসবাবপত্র, স্থাপত্য উদ্যান নির্মানে ছিলেন অনন্য। তৈরি করতেন গোলাপ,জুঁই,মগরা সহ রকমারি ফুলের আঁতর,আর সুগন্ধি পাউডার। তাঁর আঁতরের বাজারি নাম ছিল - 'Arty Perfume'। জ্যাম,জেলি, আঁচার,দই পাতার হাত ছিল চমৎকার। মৌমাছি চাষে তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। শিকার ছিল তাঁর নেশা। গান গাইতেন। এস্রাজ বাজাতেন। চিঠি, দিনলিপি ছাড়াও লিখেছেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ইংরেজিতে প্রকাশিত বই - 'On the Edgea of Time',বাবার নির্দেশে অনুবাদ করেছেন অশ্বঘোষের 'বুদ্ধচরিত'। তাঁর লেখা দু'টি বই হলো - 'প্রাণতত্ত্ব' ও 'অভিব্যক্তি'।
এমন প্রতিভাবানদের ঘিরে লোকসমাজের সবসময় একটা কৌতুহল সদা পিছু পিছু চলে।
প্রতিমা দেবী কবির সঙ্গে সদাই ব্যস্ত কবির সদা সঙ্গী হয়ে। রথীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার কোথাও যেন একটা চিড় ধরেছে। কোণার্ক ভবনে নিভৃতে বাস করেন। উত্তরায়ণের যে পম্পা সরোবরের ধারে রথীন্দ্রনাথের দারু কর্মের স্টুডিও গুহাঘর ,তারই উপরে প্রতিমা দেবীর স্টুডিও 'চিত্রভানু'-তে থাকেন প্রতিমা দেবী। আর গুহাঘরে রথীন্দ্রনাথ। থাকেন উপর নীচে দু'জনে। কিন্তু মাঝখানে মেঝে যেন বিচ্ছেদের দুস্তর ব্যবধান।দু'জনের কোনো সাক্ষাৎ নেই। তাই নিয়ে নিয়ে কবি তো খুব চিন্তিত। অনেক আগে ১৯১০ এর এক চিঠিতে কবি তার সদ্য বিবাহিত ছেলেকে উপদেশ দিয়ে লিখেছিলেন -
"তার চিত্তকে জাগিয়ে তোলার ভার তোকেই নিতে হবে -তার বিচিত্র জীবনের বিচিত্র খাদ্য তোকে জোগাতে হবে,তার মধ্যে যে শক্তি আছে তার কোনোটা যাতে মুষড়ে না যায় সে দায়িত্ব তোর।" এ উপদেশ যেন তাসের ঘরের মতো ভাঙতে বসল। উপদেশ বৃথা,বাস্তবের টানাপোড়েনে। এমন সঙ্কটকালীন সময়ে কবি তাই একদিন আরেকটি লেখায় বললেন -
" আমার রাস্তা দিয়ে যে তোমাদের জীবনের পথে তোমরা চলবে এ কথা মনে করা অন্যায় এবং এ সম্বন্ধে জোর করা দৌরাত্ম্য" - একথা কিসের বার্তাবাহক!
ভেতরে ভেতরে রথীন্দ্রনাথ বড়ই মুষড়ে পড়েছিলেন। কবির তা ধরে ফেলতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তার প্রমাণ হিসেবে রথীন্দ্রনাথের প্রতিমা দেবীকে তারিখহীন বেশ কিছু চিঠিতে দেখতে পাই -
"কতদিন বোলপুরের মাঠে একলা পড়ে যে কেঁদেছি তা কেউ জানে না। তুমিও না।"
চাইলেও নিজেকে মেলে ধরতে না পারার অক্ষমতার কথা জানিয়ে প্রতিমা দেবীকে লিখেছেন -
"ভগবান আমাকে বোবা করে জন্ম দিয়েছেন।"
বিজ্ঞানী হলে নাকি শুষ্কতা গ্রাস করে। তাই নিয়ে একটা মনঃস্তাত্বিক পীড়ন থেকে রথীন্দ্রনাথ নিজের শুষ্ক সত্তার দুর্বলতা নিয়ে আরো লিখেছেন -
"....যে খুব ভালোবাসতে চায়,যে খুব সুন্দর হতে চায়... কিন্তু তার একটা দোষ আছে সে ভারী লাজুক।... এই লাজুক মানুষটাকে টেনে বের করার দায়িত্ব যে তোমার। আর তা যদি না পার চিরকাল তোমাকে কষ্ট পেতে হবে - তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো।"
রথীন্দ্রনাথ ও প্রতীমা দেবীর দাম্পত্য জীবনে একটা দূরত্ব কবিকে খুব চিন্তিত করত। নিঃসন্তান রথী ও প্রতিমা দেবী। এলো ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে পালিতা কন্যা নন্দিনী, ওরফে পুপে। পুপের আগমনও দুরত্বের ফাটলটি জোড়া দিতে পারল না। দু'জনে দু'ভাবে মুক্তির সন্ধান করতে লাগলেন। কবির তাতে কি আর সুখকর ছিল! মোটেই না। কবির চিরতরে চলে গেলেন। ১৯৪১ সাল। ঠিক দশ বছর পরে সরকার শান্তিনিকেতন অধিগ্রহণ করলেন। সাল- ১৯৫১। রথীন্দ্রনাথের মনে হল এ একটা বিপর্যয়। আশ্রম ছিল অনেক ভালো। আশ্রম আর সরকারি প্রতিষ্ঠান - পার্থক্য আকাশ পাতাল। সরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই রাজনীতির ঘোলা জল থাকবে, নিয়মের ঘেরাটোপ... এতোদিনের অভ্যস্ত আশ্রমিক পরিবেশের সঙ্গে বড়ই বেখাপ্পা লাগা স্বাভাবিক।
রথীন্দ্রনাথ হলেন প্রথম উপাচার্য। বিরাট দায়িত্ব। গৌরব ধরে রাখার। ইতিহাসের বিপুল চাপ। ভাবমূর্তির দায়।
অন্যদিকে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চারদিকে গুঞ্জন। সে সময় পাপারাৎজিদের আবির্ভাব ঘটেনি, কিন্তু চারপাশের প্রিয় পরিজন থেকে শান্তিনিকেতনে সকল সংশ্লিষ্ট জনের কাছে রথীন্দ্রনাথ চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন।
শান্তিনিকেতনের শুরু থেকেই, ১৯১৮ থেকেই আশ্রমিক ছিলেন নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯৩৮ কবি তাকে আশ্রমের ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে নেন। বিয়ে হল মীরা বিশির সঙ্গে। বিয়েতে নানা বাধা ও জল ঘোলা হয়েছিল। শেষে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যস্থতায় তাদের বিয়ে হয়।
সেই মীরা চট্টোপাধ্যায় ও রথীন্দ্রনাথকে ঘিরে কেচ্ছা হু হু ছড়াতে লাগলো। কী সেই কেচ্ছা?
রথীন্দ্রনাথের চেয়েও একত্রিশ বছরের ছোট মীরার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নিয়ে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে এই অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে বহু মুখরোচক কাহিনি ঘুরতে লাগল। সময়টাও রথীন্দ্রনাথের ভালো যাচ্ছিল না। আর্থিক তছরুপের দায়ে রথীন্দ্রনাথ অভিযুক্ত হলেন। কেস আদালত পর্যন্ত গড়াল। বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন। কিন্তু অবৈধ সম্পর্ক কাল হয়ে দাঁড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু শান্তিনিকেতন হতে নির্মলচন্দ্রকে সরিয়ে দিতে মৌখিক পরিমর্শ দিলেন। আর এতেই গেল ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে। চরম অপমানিত বোধ করলেন রথীন্দ্রনাথ। শেষে বিশ্বভারতীর উপাচার্য পদ থেকে শরীর খারাপের কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেন। আর নিজেকে স্বচ্ছায় নির্বাসনে নিয়ে গেলেন। আর ১৯৫৩ সালের ২২এর ফেব্রুয়ারীতে একটি পত্র দিয়ে সরাসরি নীর্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে মীরাকে সরাসরি চেয়ে বসলেন।
একটি কোলের ছেলে জয়ব্রতকে নিয়ে মীরা দেরাদুনে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিভৃতাবাসে চললেন। আর নির্মলচন্দ্র থাকলেন শান্তিনিকেতনে মেয়েকে নিয়ে। মাঝেমধ্যে মেয়েকে নিয়ে ছুটিতে দেরাদুনে নির্মলচন্দ্র কাটিয়ে আসেন।
শান্তিনিকেতন ছাড়ার সময় রথীন্দ্রনাথ প্রতিমা দেবীকে লিখছেন -
"আমি লুকিয়ে চুরিয়ে যাচ্ছি না, এখানে সবাইকে জানিয়ে যাচ্ছি। মীরা আমার সঙ্গে যাচ্ছে।"
রথীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের দমবন্ধ হওয়া পরিবেশ থেকে যেন মুক্ত জীবনের উল্লাস খুঁজে পেলেন। রথীন্দ্রনাথের এই দেরাদুন পর্ব ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ।
প্রথমে দেরাদুনে ভাড়াবাড়িতে থাকেন। তারপর ৮৯ তাজপুর রোড ঠিকানায় নিজের বাড়ি তৈরি করেছিলেন। বাড়ির নাম 'মিতালি'। ওখানেই মীরাকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিলেন।
১৯৬০ এর এক নববর্ষে একটি চিঠিতে প্রতিমা দেবীকে লিখেছিলেন -
" আমরা দু'জনেই এখন জীবনের সীমান্তে এসে পড়েছি। এখন আর কারো প্রতি রাগ বা অভিমান পুষে রাখা শোভনীয় নয়।... আমাদের মধ্যে প্রীতি সম্বন্ধ অক্ষুন্ন থাকে যাতে এই নতুন বছরে তাই কামনা করি।"
নববর্ষে ছুঁয়ে গেলেন শান্তিনিকেতন। মেয়ে নন্দিনীর নতুন বাড়ি রতনপল্লীতে 'ছায়ানীড়'। মেয়েকে বললেন নিজের বাড়ি না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের কাছে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু যেন জোটে। বললেন উত্তরায়ণ আর ভালো লাগে না।
এবার আসছে শান্তিনিকেতনে বাবার জন্ম শতবর্ষ পালনের সময়। তার প্রস্তুতি কেমন দেখতে ৪ ঠা মার্চ এলেন শান্তিনিকেতনে। ফিরে যাওয়ার সময় নন্দিনী ও তাঁর স্বামী গিরিধারীলালা দেখলেন বহু দুর্যোগে যার চোখে জল পড়ে না, সেই চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত।
১৯৬১র,৩-রা মে বাবার জন্মশতবর্ষ উৎসব পালনের দিন কয়েক আগে রথীন্দ্রনাথ ইহ জগতের মায়া ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন।
(ক্রমশ)
*************
# 'বিশ্বকবির সন্তান বাৎসল্য'
( পর্ব -১৯)
✍ মৃদুল কুমার দাস।
যে কবির নিজেরই হৃদয় ও মনে একান্তে প্রভাত রবির কর যেদিন প্রবেশ করেছিল, সেই থেকে চলা শুরু করে একদিন গোধূলি সূর্যের মতো হয়ে জগৎবাসীকে কাঁদিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন যখন, সেই যাত্রাই কবির সারা জীবনের সন্তান বাৎসল্যও চলল সাথে সাথে। সেদিন কে কাঁদতে বাকি ছিল? কেউ না। রক্তের সম্পর্কে তখনো বেঁচে কেবলমাত্র রথীন্দ্রনাথ, মীরা, প্রতিমা, মীরার মেয়ে নন্দিতা।
১৯৩৭খ্রিস্টাব্দ,১০ সেপ্টেম্বর ছিয়াত্তর বছর বয়স কবির। পড়লেন এক বিরাট অসুখে। এরিসিপেলেস তাঁকে পঞ্চাশ ঘন্টা অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে হলো। সকলে ভাবলেন কবি আর ফিরবেন না। কিন্তু যখন ফিরলেন সবাই দেখলেন এ কোন গুরুদেব! কবিও কিছুদিন পরে হেমন্তবালা দেবীকে লিখলেন -
"কিছুকালের জন্য মৃত্যুদণ্ড এসে আমার ছুটির পাওনা পাকা করে গিয়েছে।"
১৯৩৮ সাল থেকেই কবি শুনতে পাচ্ছেন বিদায়ের রিংটোন-
"এবার তবে ঘরের প্রদীপ/ বাইরে নিয়ে চলো।" এল এক বিষাদ পর্ব। কবি বলেছেন যত কষ্ট পাইনা কেন, জীবনের সমুজ্জ্বল গৌরব নিয়ে সুন্দরভাবে শেষ হবে।
বয়স যখন আশি,এলেন সত্যজিৎ রায় দেখা করতে। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কথা হতে হতে পাশের জন মনে করিয়ে দিচ্ছেন কবির সামনে আশি বছরের জন্মদিন আসছে। সঙ্গে সঙ্গে কবি বললেন -
"হ্যাঁ, এবার আশি,আর তার মানেই আসি।"
একদিন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কবির সঙ্গে উত্তরায়ণে দেখা করতে গেছেন। তিনি দেখলেন কবি এক প্রকান্ড টেবিলে বসে ঝুঁকে পড়ে কিছু লিখছেন।
তখন শ্রী মুখোপাধ্যায় জিজ্ঞেস করছেন "এত আসবাব থাকতে অত ঝুঁকে পড়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে না?" কবি তখন উত্তরে বললেন -
"সব রকম চেয়ারই আমার আছে, কিন্তু ঝুঁকে না লিখলে লেখা বেরয় না। কুঁজোর জল কমে গেছে তো, তাই উপুড় করতে হয়।"
২৫ জুলাই,১৯৪১। খুব ভোরে উঠেছেন। 'উদয়ন'-এর পুব দিকের জানালায় আশ্রমের দিকে মুখ করে চেয়ে বসে আছেন। বিষন্নতা গ্রাস করে আছে। চলে যেতে হবে তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত এই পুণ্য ভূমি থেকে। হঠাৎ শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী,কর্মী ও আশ্রমিকের দল সমবেত কণ্ঠে - " এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার..." গানটি গাইতে গাইতে উত্তরায়ণের বাড়ির ফটক পেরিয়ে,লাল মাটির কাঁকুরে পথ ধরে উদয়ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সেই গানের অর্ঘ্য গ্রহণ করলেন।
তারপর অসুস্থ কবিকে স্ট্রেচারে করে দোতলা থেকে নামানো হলো। কবিকে শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে নিয়ে যাওয়া হবে কলকাতায়। যাওয়ার সময় কবি সকল আশ্রমিকদের দেখতে চাইলেন। গাড়িতে শুইয়ে তাঁকে ঘোরানো হল আশ্রম। সেই গাড়ি বোলপুর স্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার সময় কোনোরূপ যাতে রাস্তা খারাপের জন্য কবিকে ধকল সইতে না হয় সে জন্য বীরভূমের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কর্তৃপক্ষ রাতারাতি রাস্তা সারাইয়ে নেমেছিলেন। সেই রাস্তা সারানোর সরঞ্জাম যত লোহালক্কড় রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে কবি জানতে চাইলেন -
"এখানে কী হচ্ছে?"
তাঁর নাতনি নন্দিতা কৃপালিনী বলেছিলেন -
"পুরণো সব ছোট ল্যাম্প পোস্ট বদল করে, নতুন বড় বড় পোস্ট বসানোর কাজ চলছে।"
তাই শুনে কবি বললেন -
"তোদের পুরণো লাইট-পোস্টও চলল, নতুন আলোর জায়গা করে দিতে!" আর কবির যাত্রা পথে তখন সমবেত কন্ঠে গেয়ে গেয়ে চলেছে - " আমাদের শান্তিনিকেতন..." আর আশ্রমের ডাক্তার শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে ইশারায় কাছে ডেকে নিলেন। তার দুটো হাত নিজের হাতের উপর রেখে বললেন -
"ডাক্তার, আমার আশ্রম রইল,আর আশ্রমবাসীরা রইলেন, তাদের তুমি দেখো।"
রবীন্দ্রনাথের চোখে তখন জল। শচীন্দ্রনাথও কাঁদছেন।
৩০ জুলাই কলকাতায় তাঁর অপারেশন। কবি ভয় পাচ্ছিলেন ব্যথার কথা ভেবে,যতই ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় আশ্বাস দিক,তাঁর মত ধন্বন্তরী অপারেশন করুক না কেন তিনি আগাম ইঙ্গিত পেয়েই গিয়েছিলেন এই যাত্রা তাঁর শেষ যাত্রা। তার মধ্যেই মুখে মুখে বললেন নতুন দুটি কবিতা। টুকে রাখলেন যাঁরা পাশে ছিলেন। আর আদরের প্রিয় বৌমা প্রতিমা দেবীকে দিয়ে মুখে মুখে বলে লেখালেন একটি চিঠি। কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় শুধু নিজের হাতে সই করলেন 'বাবামশায়'। সেই তাঁর শেষ লেখা।
কবিকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য রেলের একটি বিশেষ কোচ এনেছিলেন তদানীন্তন পূর্ব ভারতীয় রেলের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিবারণ চন্দ্র ঘোষ। ট্রেনের নাম ছিল পাকুড় প্যাসেঞ্জার ট্রেন। খুব ধীর গতির ট্রেন।
৬ আগষ্ট সন্ধ্যা ৬টায় খেলেন দেড় আউন্স আখের রস। রাত সাড় ন'টায় আধ আউন্স বার্লি।
৭-আগষ্ট ১৯৪১ সালে আলোর ভুবনে ভেসে গেলেন মরণ বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
**** শেষ ****
@ ঋণস্বীকার:-
১. 'ঠাকুর বাড়ির অন্দর মহল' -
চিত্রা দেব
২. 'কবির সংসার' -
পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়।
(প্রথম খন্ড)
৩. আনন্দবাজার পত্রিকা - 'কবিপুত্র
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর' -
নীলাঞ্জন বন্দোপাধ্যায়
৪. আনন্দবাজার রবিবাসরীয় -
'আছে মৃত্যু' - নীলাঞ্জন
বন্দোপাধ্যায়(৬ আগষ্ট, ২০১৬)
৫. আনন্দবাজার রবিবাসরীয়- '... সেই ট্রেনযাত্রা'- স্বপনকুমার ঘোষ(২২
জুলাই,২০১৮)
৬. উইকিপিডিয়া।
Copyright reserved for Mridul Kumar Das
**************************
খুব ভালো লাগলো । অনেক শুভেচ্ছা ।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো । অনেক শুভেচ্ছা ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।🤎💫💫💥💥
উত্তরমুছুনকবিগুরুকে নিয়ে লেখা, অসাধারন।
উত্তরমুছুনবারবার পড়তে হবে আমায়।
খুব ভালো লাগলোঙঞঘ
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।👌👌💫💫💥💥
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💫💫💥🤎
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।👌👌💫💫💥💥
উত্তরমুছুন