বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০

#বিষয় - 'ছোট গল্প'

 # বিষয় - ছোট গল্প

#নাম - 'বিশ্বাস'

খিড়কি লাগোয়া জায়গাটা যা ছায়া ঘণ হয়ে আছে। থাকবেই তো। ওখানে যে ছাতিম,বেল,নিম তিনটি যেন তিন সখী হয়ে দাঁড়িয়ে। একে ওপরের ছায়া ভাগ করে চলে সকাল থেকে সেই গোধূলি পর্যন্ত। এরা কয়েক পুরষের সাক্ষী। সূর্যশেখরের প্রপিতামহর বাবা শিবেন্দু শেখর এই তিনটি গাছ লাগিয়েছিলেন। চার মেয়ের পর এক ছেলে ঐ প্রপিতামহ শশাঙ্কশেখর সিকদার হওয়ার আনন্দে।


  নাম দেওয়া হয়েছে বেনিছা তলা। বেলের - বে,নিমের - নি,আর ছাতিমের - ছা,এই নিয়ে বেনিছা। সংসারে বিশ্বাসের সংস্কারও যেন ছায়াবৃত করে রেখেছে ওরা। বাস্তুর এরা যেন অমঙ্গল রোধ করে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েক পুরুষ ধরে।


এই কাঠফাটা দুপুরে তাদের ছায়াটুকু বড়ই যেন মামাবাড়ির আদরের মতো। সদরপানে তখন মুখ করা! বাব্বা! যেন মাথা ঠিকরে যাবে!


   অন্নপূর্ণা দেবী , অন্নপূর্ণা সিকদার। বয়স বিয়াল্লিশ। স্বামী সূর্যশেখর শিকদার। পঞ্চাশ। অন্নপূর্ণাকে আদর করে সূর্যশেখর ডাকে অনু বলে।


   খড়ের কিস্তি নৌকা নিয়ে তার খড়ের ব্যবসা। দু'টো নৌকো। একটা ভর্তি হয় যখন, আরেকটা তখন কলকাতায়। কর্মচারী বলতে চারজন। কলকাতায় থাকে দু'জন। তারা বিক্রেতা। তাদের বাড়ি কলকাতাতেই। বংশ পরম্পরায় তাদের এ চাকরি পাকা।


   সূর্যশেখর খড় বোঝাই করে কলকাতার বাগবাজারের ঘাটে কিস্তি নৌকা ভিড়ায়। কয়েকপুরুষের ব্যবসা। ভাবছে এখন এই ব্যবসা আর পোষাচ্ছে না। লোহার ব্যবসা করবে। চলছে কথাবার্তা। কলকাতার ঘণশ্যাম ঘোষ ও শঙকর বিশ্বাস দু'জনে এর প্রস্তাবক। এই কাজে পরিশ্রম বেশি। বরং ওতে রোজগারপাতি একটু বেশি আছে। দালালির সুযোগ আছে। উপরি রোজগারও আছে। আর সূর্যশেখরকে বুঝিয়েছেও গদিতে বসে বসে ব্যবসা। একটা সুলুক সন্ধান দিতে সূর্যশেখর বলে -


"সে এখন ভাবা যাবে।" একটু ধমকের সুরে বলে।


সত্যিই আর ভালো লাগে না এভাবে নদী পথে ব্যবসার ঝুঁকি নিতে। কোন দিন না কোন দিন বিপদ ঘটে। এর আগে অল্পস্বল্প বিপদের মুখে পড়তেও হয়েছে। অবশ্য অভয় মন্ডল বেশ পাকা মাঝি। বিপদে পড়ার ভয় নেই। অভয় বলে-  "অভয় থাকতে বিপদ!" তাবলে একদিন যে বিপদে পড়বে না তার কি গ্যারান্টি আছে!      সপরিবারে কলকাতায় উঠে আসতে খুব মন টানে। অনুকে বলেছেও। অনু তো তিড়িং করে লাফিয়ে বলে ওঠে - "পূর্ব পুরুষের ভিটে ছেড়ে ...! সে তোমার যাওয়ার সখ হয়েছে যাও। এখানেই আমি মরব। আমি কোথাও যাচ্ছি নে...!"


    আবার এও বিশ্বাস পারিবারিক ব্যবসা থেকে সরে এলে পূর্বপুরুষ ক্ষমা করবে না। নতুন ব্যবসার বাগ না জানলে লালবাতি জ্বলতে বেশি সময়ও লাগে না। তাই নিয়ে বড্ড দ্বিধায় পড়ে,যদি ব্যবসার বাগ না বুঝতে পারে। এই ভেবেই চাপা পড়ে যায়। এগোবার সাহস পায় না। ওদিকে কর্মচারী দু'টোও তাগাদা প্রথম প্রথম দিত বেশ, এখন আর তাগাদা দেয় না,সে কারণ অনেক...


   সূর্য শেখরের এক ছেলে বরুণ। সবে বয়স বারো। দু'টি মেয়ে সোনাই ও টুপাই - চোদ্দ ও ষোলো। মা-ই ছেলে মেয়েদের মানুষ করেছে সবসময় কোল আগলে। সংসারের সব দায়িত্ব অন্নপূর্ণার। সূর্যশেখরের বেশিরভাগ দিনতো বাইরে বাইরেই কাটে। পুরুষ মানুষ বাইরে কাটায়। কখন কি বিপদ আসে...।


  তাই সংসারের মঙ্গলের জন্য নিষ্ঠা সহকারে ভক্তি আচ্চা,বার-ব্রত পালন করে সংসারকে মন দিয়ে কষে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে অন্নপূর্ণা। তবু যেন মন ঠিক স্বস্তি পায়না। যদি বিপদ আসে...!


   তাই নিয়ে সূর্যশেখরকে শোনাতে কম করে না। না শোনালে এই সব পূজা আচ্চা, অনুষ্ঠানের যে খরচ হয়, তা সূর্যশেখরের কাছ থেকে আদায় করা কি চাট্টিখানি কথা! হাত উপুড় করানো অতো সহজে নাকি। হাড় কিপটে।  রীতিমত ফদ্দ মিলিয়ে আদায় করতে হয়।


   সূর্যশেখর রাজধানী কলকাত্তায় ব্যবসা করতে যায়। সে কত্ত দূর! অন্নপূর্ণার কলকাত্তা নিয়ে কোনো ধারনাই করতে পারে না। এটুকু শুধু জানে প্রচুর লোকজন, গাড়িঘোড়া আর বলরাম বসু স্ট্রিটে মা শ্রীশ্রীসারদার বাড়ি আছে। সূর্যশেখরই বলেছিল। আর টিভিতে সিরিয়াল দেখে মোটামুটি একটা ধারনা তার হয়েছে। সূর্যের কাছ থেকে আরো শোনা বাগবাজার থেকে উত্তরে নদী বেয়ে গেলে দক্ষিনেশ্বর পূব পাড়ে। আর বাগবাজারের ঘাট থেকে দেখা যায় পশ্চিম পাড়ে বেলুড় মঠ। যখনই মনে হয় দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে গড় করে নেয়। মনে মনে ভেবে রাখে যদি সূর্যশেখর কলকাতা নিয়ে যায় তাহলে দক্ষিণেশ্বর,বেলুড় মঠ ও বাগবাজারে মায়ের বাড়ি দেখে আসবে।


সূর্যশেখর কতদিন বলেছে - "গিন্নি যাবে কলকাতা? বিয়ের পর থেকে কতবার বলেছ তো যাবে। এই যাবে,তো ঐ যাবে। কই কোনোদিন যাওয়ার নামটি পর্যন্ত ধরলে না।"


অন্নপূর্ণা অমনি বলে - "দেখে নিও আমি ঠিক যাবো।" অন্নপূর্ণা রাতে আলো নিভিয়ে পাশে খুব সোহাগ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলেছিল কথাগুলো।


"এই যে বললে যাবে,তা কবে? তাহলে এই ভাদ্রে যাবে? এবারে গিরিশ মঞ্চে দশদিন ধরে চিৎপুর যাত্রাদলগুলোর দশখানা দশদিন ধরে পালাগান হবে। চলো না তোমাকে পাশে নিয়ে পাঁচখানা যাত্রা পালা দেখি।" পরক্ষণে মনে মনে ভাবে মহাজনের সুদ ব্যবসায় সুদ কষাকে বিশ্বাস করা যায়,একে বিশ্বাস... ।


অন্নপূর্ণা খুব সোহাগ ভরে বলে - "তুমিতো থাকো না। এই ঘর দোর,গরু বাছুর, গাছপালা,বাগান সবের গতি কি হবে। তুমি তো বলে দিয়েই খালাস। সব শুকিয়ে মরে যাবে। হরি মন্দিরে প্রতিদিন জল,পূজা আচ্চা তার কি হবে। বামুন ঠাকুর এলে তার হাতে পূজোর সরঞ্জাম অত পরিপাটি করে কে সাজিয়ে দেবে? হ্যাঁ গো এবারে তুমি একটা বড় দেখে ঝাঁঝ এনে দিও তো। ঠাকুর মশাই বলছিলেন বড় বাজারে পাওয়া যায়। ঐ বাগবাজার থেকে একটুকুন। নদী পাড় ধরে হাঁটা দিলেই নাকি বড়বাজার পেয়ে যাবে। এনে দেবে? জানো তো এই ঝাঁঝটা মধ্যিখানে একটা চুড়কি ফাট নিয়েছে। ক্যামন একটা ঘ্যানর ঘ্যানর আওয়াজ...


সূর্যশেখর অমনি বলে - "হবে না। যত গায়ের জোর আছে ঐ ঝাঁঝের উপর বাড়ি মারতে থাকলে,সে বেচারার আর দোষ কি! ও তো চিড় খাবেই।"


"তুমি যে কি বলো না! ঝাঁঝ একটু জোরে না বাজালে শিকদার বাড়িতে পূজো হচ্ছে বলে লোকে জানবে কি করে? আর জানো এই ঝাঁঝ,শাঁখ,ঘন্টার শব্দ, ঠাকুর মশাইয়ের মন্ত্র যতদূর পৌঁছবে সব ভূত-পেত- অমঙ্গল পালিয়ে যায়... তুমি খোঁটা দিচ্ছ!"


সূর্যশেখর দেখল আর এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, অন্নপূর্ণার বিশ্বাস ভাঙা,আর রামের হরধনু ভাঙ্গা একই দুঃসাধ্য কর্ম।


আগের প্রসঙ্গে ফিরে এসে সূর্যশেখর বলে -"তাহলে ভাগ্নে প্রতাপ ও তার বউ শিউলিকে ক'টা দিন রেখে যাওয়া যেতেই তো পারে। ডাকব?"


  অন্নপূর্ণা বলে - "আঃ! দাঁড়াও না। সে এখন পরের মাস। অনেক দিন। আমার ঝাঁঝটা এনে দেবে তো? কি গো চুপ করে গেলে যে? ঘুমিয়ে গেলে নাকি?" গায়ে ঠ্যালা দেয় অন্নপূর্ণা। " সত্যিই ঘুমিয়ে পড়লে।"


সূর্যশেখর ঘোর ঘুমের ভাব করে পাশ ফিরে শোয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘোর ঘুমেও পড়ে।


অন্নপূর্ণার চোখে ঘুম আর আসে না। রাজ্যের চিন্তা জড় হয়ে আসে। পরের মাসে গুনিন তিনকড়ি সামই আসার কথা। কিছু তাগা তাবিজের অর্ডার আছে। সে ফিরে গেলে মুসকিল আছে। ছেলেটার জন্য মাদুলি, মেয়ে দু'টোর ভালো পাত্র যাতে জোটে সেজন্যও,  সূর্যশেখর বলছিল ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে, তার জন্য একটা বন্দোবস্ত করে দেবে বলেছে। সর্বোপরি সূর্যশেখর নাকি কোন মেয়ে মানুষের পাল্লায় পড়তে যাওয়ার সম্ভাবনা হচ্ছে, সেজন্য একটা বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ দেওয়ার কথা আছে। এজন্য তার ক'দিন নিয়ম পালনের ব্যাপার আছে। গাইটা পোয়াতি তিন মাসের। তার যত্ন আত্তি..., শুধু যাওয়া বললেই হল, যাওয়ার একটা সুযোগ সুবিধা করতে সময় লাগবে না কি!


সূর্যতো দিব্যি ঘুমাচ্ছে। ও তো বাইরে বাইরে কাটিয়েই খালাস! সংসারের ভালো মন্দ নিয়ে কতটুকু ভাবে! এই সাত পাঁচ ভাবনা এমন চেপে বসে, চোখে ঘুম আর আসে না।


 সংসারের চারদিকে অমঙ্গল কিলবিল করে ধেয়ে আসে। কি জানি আজকাল চোখ বোজার আগেই ভাবনাগুলো কেমন অলক্ষুণের মতো হয়ে ঘিরে ধরে।      বামুন ঠাকুরের পূজোর ঢং দেখলে মন বড্ড খুঁতখুঁত করে। পূজোর দোষ আছে বলে কেন কি জানি বেশ মনে হয়। ঠাকুরম'শাই শুধু সিধার দিকে চেয়ে চেয়ে মন্ত্র পড়ে। সিধা যাই হোক একটু ভালো করে মন্ত্র পড়বি তো বাবা! আর মন্ত্র পড়াটাতেও যেন গা নেই। ক্যামন নমো নমো করে সেরে দেয়। হাতের ঘন্টাটাও যেন নড়তেই চায়না। ইদানিং খুব ফাঁকিবাজ হয়েছে। আর বলে শুধু মাসোহারা বাড়াও। সূর্যকে বলেছেও দু'একবার। সূর্য কানেই নেয় না। বলে -


" ও তোমার বয়সের দোষ। বয়স যত বাড়ছে বিশ্বাস ঘোরতর হয়ে চেপে বসছে। এই যত বিশ্বাস তত সংস্কার চেপে বসবে। ওটা হয়। একটু উদার হও। নাহলে কষ্ট পাবে।" সূর্য এই বলে গালভরা হাসি ছাড়ে। তাই দেখে অন্নপূর্ণার খুব অভিমান জাগে,রাগ হয়। তবে মনে মনে।


আর সোনাই আর টুপাইটাও হয়েছে সেইরকম! শুধু আমের আচার জারাবে। বয়ামে কুল থেকে,আনারস,আমলকি, গোটা লেবুর আচারের শ্রাদ্ধ সেরেও আশ মেটে না, তবু কুশি আমের রেহাই নেই! পেড়ে জারাবে। তবে বেশ জারায় বটে! খেতে দারুণ! নাছোড়বান্দা আমাকে খেতে হবে। সবসময় না। যে দু'একবার চেখেছি বেশ লেগেছে। ওদের যা ভালো লাগে করে করুক। ক'দিন আর এসবের সুযোগ পাবে। শ্বশুর বাড়িতে এ সব কি আর করতে পারবে! আবার একটু শাসন না করলেও দু'টোতে বড্ড যা বেয়াড়া হচ্ছে। মেয়েদের এতো বেয়াড়া হওয়া ভালো নয়। কি নোলা হয়েছে রে বাবা!


  নাচন খেলা থেকে ...পাড়ার বেশ ক'টা ধিঙ্গিও জুটেছে বটে! সবসময় ধিঙ্গিপনা করে বেড়ায়। এদের মা বাপগুলোকেও বলিহারি বটে! কিছুই বলে না। বিয়ে থার সময় বুঝবে!


   আর বরুনটাও কোনো কথা শোনে না। বাপ না থাকলে তো সাপের পাঁচ পা দেখে। এই কাঠফাটা দুপুর রোদে দখিনা বাতাসে শুধু ল্যাজওয়ালা ঘুড়ি ওড়াবে। বাতিল কাপড়ের সব পাড় একটাও রাখেনা। কাঁথা সেলাইয়ের জন্য পাড়ের সুতো লাগবে। পাড়ার হাসির মাকে দিয়ে করাব, কাঁথা পিছু পনর টাকা! কখন কখন পাড় সব  ছিঁড়ে নিয়ে গিয়ে ঘুড়ির ল্যাজ বানাবে! আবার দুপুর রোদে মাকে ডাকবে- "চলো চলো ক্যামন ঘুড়ি উড়ছে দেখবে।"


   সংসার সামলাই না, এদের সামলাই আমার হয়েছে যত জ্বালা! বাপটা তো দিব্যি আছে। কোথাও দু'টা দিন যাবো, ওদিকে মায়ের শরীরটাও খারাপ, মায়ের বাতের কষ্টটা নাকি বেশ বেড়েছে,ভাই ডেকে পাঠাচ্ছে - দেখতে যাবো যাবো করেও হচ্ছে না। রাজ্যের ভাবনা ভাবতে ভাবতে ক্লান্তি আসে।তখন চোখে ঘুম ঢোকে।


  গুনিন তিনকড়ি পরের মাসে এল। গুনিন জলপড়া, মাদুলি, জড়িবুটি নিয়ে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করল। চোখ কপালে তুলে অন্নপূর্ণা বলল- "অত! কি গো তুমি!"


  তিনকড়ি চোখ মটকে,দম নিয়ে,নাকে নস্যি টেনে বলল- "মা, হবে না। এই বিপত্তারিণী মাদুলিটাই তো বারোশ' টাকা লাগল। আপনার ব্যবসার মন্দা কাটাতে ওকে মন্ত্রশুদ্ধি করে বানানো। অমাবস্যার রাতে উপোস করে বানিয়েছি। মাদুলীর শরীরটা তো রূপোর... আর এই নীলসরস্বতী মাদুলি যেটা আপনার ছেলের জন্য বানানো। ছেলের ভবিষ্যত সুন্দর হওয়ার জন্য। এবার ক্লাসে প্রথম হবে নিশ্চিত দেখো। দাম তো কমিয়ে ধরেছি। মাত্র পাঁশশ'। 


  "এই হরকতি বিঘ্ননাশক জড়ি। মা একটা নতুন ভাঁড় কিনে রাখতে যে বলেছিলাম,কই দ্যান দেখিনি। এটা ঐ ভাঁড়ের মধ্যে রেখে বাস্তুর ঈশান কোণে পুঁতে দিয়ে যাব। এটার দাম মাত্র পাঁশশ' ধরেছি। সীমানায় যে কোনোরকম অমঙ্গল ঘেঁষতে দেবেনি। এর বিশেষত্ব হল কেবল ভূতের নাকেই ঝাঁটার শুঁটকানি গন্ধ ছাড়বে। মনে হবে ঝাঁটা তাড়া করে যাচ্ছে। ঝাটা মেরে যেমন ভূত তাড়ানো হয় এ ঠিক তেমনি। তবে পুঁতে দেওয়ার পর আর কোনদিন খুলে দেখবেন না। দেখলেই এর শক্তি চলে যাবে। তখন প্রথম বিপদ সে মারাত্মক হবে। এতোদিন যে ভূত ঘেঁষতে না পারার সুদে আসলে অসুল করে নেবে - সংসারের কারো না কারোর শরীরের উপর ভয়ংকর আঘাত হানবে। মৃত্যুও হতে পারে। তিন বছর পর্যন্ত এর শক্তি কাজ করবে। তারপর আবার নতুন করে একই নিয়মে করতে হবে।


  আর মামনিদের জন্য এই দুটো তাবিজ পাঁশশ পাঁশশ হাজার। বাকি এই মহৌষধি তাবিজ আপনার স্বামী যে পরকীয়া সম্পর্কে জড়াতে যাচ্ছে তা রুখে দাঁড়াবে। দাম দেড় হাজার ধরেছি। মোট হল গিয়ে পাঁচ হাজার দু'শ। দু'শ ছাড় দিয়ে পুরো পাঁচ হাজার। আর আজকের এই মজুরিটাও ধরিনি। ঝাড়ফুঁক সেও তো ফ্রি!


 আপনার স্বামীর যাত্রা দেখার খুব সখ। তাই না?"


অন্নপূর্ণা ঘাড় নেড়ে বলল - "হ্যাঁ। আপনি কি করে জানলেন?"


"কেন এই তিনকড়ি গুনিন কি যে সে গুনিন নাকি। গনণা করতে জানে না?"


  যেই না শুনেছে এই কথা,অমনি অন্নপূর্ণার তিনকড়ির উপর বিশ্বাস চড়চড়িয়ে বেড়ে উঠল।


  "এই মাদুলিটা আপনার স্বামীর সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। যেহেতু আপনি অর্ধাঙ্গিনী তাই আপনার পরলেই হবে। সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য হবে। এখানেই মাদুলিটার বিশেষত্ব। জোর মন্ত্র দিয়ে ওকে পতির পুণ্য থেকে সতীর পুণ্যের দিকে ঘোরাতে হয়েছে। খুব কষ্ট গেছে।"


অন্নপূর্ণা খুব খুশি। সূর্যশেখরের কোনো কিছুই জানার উপায় থাকল না -


"ঠিক উপায় দিলেন। মাদুলি পরাতে গেলে হাজারটা প্রশ্ন করতো। কে? কেন? কী?... উত্তর দিতে দিতে আমার মুখে গ্যেজা উঠে যেত!" তিনকড়িকে খুব বিশ্বাস করে মন খুলে কথাগুলো অন্নপূর্ণা বলল।


 পাঁচ হাজার টাকাকে সাতশ' টাকা কম পড়ে গেল। লক্ষ্মীভাড় ভেঙে চারশ' বেরল। অত সাধ করে লক্ষ্মীভাঁড়ের জমানো টাকাও গেল। কিন্তু বাকি তিনশ'র কি হবে! শেষে সোনাই ও টুপাইয়ের কাছ থেকে ধার নিল অন্নপূর্ণা। বাবা এলে টাকা ক'টা দিয়ে দেবে পাক্কা কথা দিল।


টুপাই বলে -" দিয়ে দেবে কিন্তু। না দিলে বাবাকে বলে দেব সব কথা।"


সোনাই দেবে না বলে বেঁকে বসল। বলে- "তুমি সেই অ্যালুমিনিয়াম বাসন কেনার সময় একশ' টাকা আমার কাছে নিয়ে ছিলে বাসনওয়ালাকে দেবে বলে। তার এখনো পাঁচ টাকা দাওনি। আর আদায় করতে যা লড়কানি দিয়েছ, আমি দেবনা।"


অন্নপূর্ণা বলে - "না, না এবারে নিগ্ঘাৎ দিয়ে দেব দ্যাখ। দে মা দেড়শ'টা টাকা মাত্র। দু'জনে মিলে তিনশ'।"


দু'জনেই বলে ওঠে- "এই অসময়ে কে দেয় তোমাকে। সামনে রথের মেলা আছে। তাড়াতাড়ি দিয়ে দেবে কিন্তু।"



অন্নপূর্ণা খুব আশ্বাস দিয়ে বলে - " হ্যাঁ রে হ্যাঁ! দিয়ে দেব ঠিক। দেখে নিস!"


   ঘরের ভেতরে তিন মা মেয়ের এমন বাক বিনিময় কেবল বিধাতা অলক্ষে থেকে দেখলেন। বিধাতা হাসছেন এসব বিশ্বাসের খেলা না দিলে ঐ মা মেয়ের এমন ঘটনা কি দেখতে পেতাম। ঘরে ঘরে কত ঘটনাই না প্রতিদিন ঘটে চলে বিশ্বাসের এমন ছুঁচো বাজিটা ছেড়ে রেখেছি বলে।


  গুনিন তিনকড়ির যা যা কাজ ছিল করে দিয়ে, ট্যাঁকে টাকা গুঁজে,ঠায় রোদকে মাথায় তুলে নিয়ে তিনকড়ি বিদায় নিল।


এদিকে অন্নপূর্ণা একটু মন মরা। অতগুলো টাকা! সঙ্গে ভয়-দুঃশ্চিন্তা চেপে বস। সূর্য এলে এই কথা যদি কানে ওঠে! মেয়ে দু'টো যা বাপ-সোহাগী! 


  ওরা দু'টিতে যা। ওরা মেয়ে বলে, মাঝে মাঝে ভুলে যায়। এমন সব কান্ড করে বকা ঝকা করার দরুন ওরা বাপের দিকেই ঢলে গেছে। আমার চেয়ে বাপকে বেশি মানে।

     পরের ঘরের জিনিস সামলে রাখার দিন কবে যে শেষ হবে,কবে দু'টো পরের ঘরে যাবে? পেটের বাচ্চা অমন শত্তুর হয়! আমার যত জ্বালা! আমার দেওয়া টাকা,আজ দেওয়ার সময় কেমনটা করল! তোদের সংসারের জন্যই তো এতো সব করা!


  এরকম নানা ভাবনার মাকড়শার মতো জাল বুনতে বুনতে সন্ধ্যা নেমে আসে। সন্ধ্যারতির সময় হয়। আরতির শেষে তাদের সান্ধ্য টিফিন দিতে দিতে আবার মেয়ে দু'টোকে মনে করিয়ে দেয় - "এসব ঘুণাক্ষরেও যেন বাপকে না বলিস!" মেয়ে দু'টো মাথা নাড়ে।


   সূর্যশেখরের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। আগামীকাল ফিরবে। ফিরলে খুব তোয়াজ করতে হবে। জানলে জন্মের ভাত তুলে দেবে। ঠিক আছে বলুক না কিছু! আমিও ছাড়ব না। ও যে হাতে অতগুলো পাথর বসানো আংটি পরে আছে! তার বেলা!


   আমি তো সংসারের মঙ্গলের জন্য করেছি। নিজের জন্য বা বাপের বাড়িতে বেঁধে দিয়ে তো আসিনি। তবে জানতে পারলে ঝড় যে একটা উঠবে,সে ব্যাপারে নিশ্চিত। এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এও নিশ্চিত...!


মধ্য রাতে হঠাৎ ঝড় জল। সামনে ভরা কোটাল। ফিরছিল বানিজ্য সেরে সূর্যশেখর। এবারে খুব লাভের মুখ দেখেছে। আমদানির তুলনায় চাহিদা বেশি ছিল। সেই জো তে পড়ে গেছে। এ রকম মাঝে মাঝে হয়। তাই তো ব্যাবসার এত মজা!


    সেই আনন্দে রাতে বিলিতি মদ একটু বেশি পরিমাণে সেবন করে সূর্য শেখর। নেশার টানে মন বেশ রঙিন লাগে। মনে হচ্ছিল অন্নপূর্ণার কথা - অন্নপূর্ণার ঝাঁঝটা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বেশ বড় দেখে কিনেছে। দাম জিজ্ঞেস করলে বলা যাবে না... এবারে কলকাতা নিয়ে আসব অনুকে। কোনো অজুহাত শুনব না। যাত্রা দেখব এক সঙ্গে... নদীটাকেও তারই মতো মাতাল মনে হল। জলে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ, যেন পেশি বহূল মরদ লাগে।

   অভয় মাঝি বলে - "কত্তা ঠিক ঠেকছে না। সবধানে বসুন। দাঁড়িদের বলল জোরে দাঁড টান। তীরে ভিড়তে হবে। তারাও জোর তর্ক করে - "রাতটা তীরে নোঙর করে কাল ভোরে রওনা দেওয়া যেত। কতবার পইপই করে বলেছি। না ওনার নাতির অন্নপ্রাশন আছে বলে ফেরার জোর তাড়া..."


মাঝি বলে - "আর বলে কিছু হবে? জোরসে টান।"


হঠাৎ ইশান কোনে মেঘ। ভরা কোটাল।  বাইরে মাঝিরা মরণপন লড়ছে। সূর্যশেখর বসে বসে ভাবছে নৌকাটা এবারেই সারিয়ে নেব। একে নিয়ে বেরনো রিক্স হয়ে যাবে। তলায় একটা দুর্বল জায়গা হয়েছে অভয় বলছিল। সেই সুযোগে এবারে কিছুদিন ঘরে থাকাও যাবে।


মাঝিদেরও একটু বেশি ছুটি দেওয়া দরকার... এইভাবে সাতপাঁচ নিজের মনেই ভেবে যাচ্ছে সুর্যশেখর। 


   নৌকা মাঝ নদীতে। হঠাৎ প্রবল ঝড়। নৌকা টলমল। মাঝিরা অনেক চেষ্টা করল  তীরে ভিড়াবার। কিন্তু নৌকার তলায় যে দুর্বল জায়গাটা ছিল,সে আর জলের প্রবল ঢেউ সহ্য করতে পারল না। সব সমেত তলিয়ে গেল। সূর্য শেখর নেশার ঝোঁকে আর থই পেল না। ডুবুরি নামল। কেউ নাগাল পেল না। পরের দিন দেহ ভাসল।


বাড়িতে খবর গেল। অন্নপূর্ণার হাতের নোয়া গেল। স্বামী ও অনাথ সন্তানদের জন্য অনেক কাঁদল। নৌকার ইন্সোরেন্স ছিল বলে লাখ ত্রিশ ও নিজের নামে দশ লাখ টাকা ঘরে ঢুকল। মেয়ে দু'টো সৎপাত্রস্থ হলো। ভাই আত্মীয়স্বজন সবাই পাশে দাঁড়ালো।


কিন্তু সেই বিশ্বাসের জোর বড্ড কমজোরি লাগে এখন অন্নপূর্ণার। বরুণ আছে। আর বে-নি-ছা তলা। মেয়েরা বিস্তর কান্নাকাটি করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। মায়ের ভরা দুঃখও সাথে করে নিয়ে গেল। বাবার জন্য মন কাঁদবে,আর মায়ের সঙ্গে কত খুনসুটির স্মৃতি মাকে যে তাদের বড়ই দুখিনী ভাবার দিন শুরু হল। দূরে চলে গেলেই এমন হয়...! বিশ্বাসের পর বিশ্বাস নতুন নতুন করে জন্মাবে। তাই হল জীবন নদীর মত।

 # কলমে - মৃদুল কুমার দাস।

Copyright reserved for Mridul Kumar Das

১৬টি মন্তব্য:

  1. দূর্দান্ত ফুটিয়ে তুলেছেন মৃদুল দা । শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন অবিরত ।

    উত্তরমুছুন
  2. উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত হলাম। 💐💐🌻🌻

      মুছুন
  3. অনুপ্রাণিত হলাম। ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💐💐🌻🌻

    উত্তরমুছুন
  4. অনুপ্রাণিত হলাম। শুভেচ্ছা। 💐💐🌻🌻

    উত্তরমুছুন
  5. সত্যিই গুরুদেব, অসাধারণ 🙏

    খুব সুন্দর বর্ণনা, প্রতিটি মুহূর্ত যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

    উত্তরমুছুন
  6. এ এক অসাধারণ বিশ্বাসের ভরপুর..💐👌

    উত্তরমুছুন
  7. অপূর্ব👌👌👌 অনবদ্য👏👏👏👏
    মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন গল্পে খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। সত্যিই জীবন নদীর মতো বহতা মান 🙏🙏

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...