রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

ওরা কারা (পিয়ালী চক্রবর্তী)


Copyright©️All rights reserved 

Piyali Chakravorty
কলকাতার ভবানীপুরের বর্ধিষ্ণু ভট্টাচার্য্য বাড়ির বড়ছেলে বাণীব্রত | বুদ্ধি - বিদ্যা - মেধা কোনোদিক দিয়েই বাণীব্রতর জুড়ি মেলা ভার | সাথে ফার্স্ট ডিভিশনে ক্রিকেট খেলে ওর বেশ নামডাক আছে পাড়াতে | বন্ধুবান্ধবও প্রচুর | পাড়ার দুর্গাপুজোর চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে রক্তদান শিবির পর্যন্ত সবজায়গাতেই ওর ডাক পড়ে |

দুধর্ষ , নির্ভয় , ডাকাবুকো এই ছেলেটিও হটাৎ একদিন বদলে যেতে শুরু করলো | কলেজ যায়না , বাড়িতে একা একা নিজের ঘরে চুপ করে বসে থাকে | মাঝে মধ্যে কিসব যেন বিড়বিড় করে বলতে থাকে আপন মনে |

দু - তিন দিন দেখে ওর বাবা পরাশর বাবু ঠিক করলেন ওকে ভালো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবেন | ওরকম একজন প্রতিভাবান ছেলের হটাৎ কি হলো তা নিয়ে ওর মা অনিমা দেবীও খুব চিন্তিত |

যথারীতি ওনারা বাণীব্রতকে নামকরা মানসিক ডাক্তার , ডাক্তার অমিতাভ ঘোষের কাছে নিয়ে গেলেন | অনেক্ষন ধরে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পরও অতোবড়ো অভিজ্ঞ ডাক্তার ওর মানসিক বিকৃতির কোনো কারণই খুঁজে পেলেন না |

রিক্তহাতে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এলেন ওনারা | ছেলেকে নিয়ে সত্যিই মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন | এখন কি উপায় কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না |

প্রত্যেকদিনের মতো পরাশর বাবু সেদিনও সন্ধ্যায় পাড়ার দোকানে চা খেতে বেরিয়েছেন | চায়ের দোকানে ওই সময় ওনার আরো চার - পাঁচজন বন্ধুও এসে জড়ো হন |

পরাশর বাবুকে আজকে বিমর্ষ দেখে ওনার বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করলেন , ' হ্যাঁ রে ? তোকে আজকে কিরকম অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে | সব ঠিক আছে তো ? '

পরাশর বাবু ভেঙে পড়লেন বন্ধুদের কাছে | উনি বাণীব্রতর সব সমস্যার কথা ওনাদের কাছে ব্যক্ত করলেন |

ওনাদের আলোচনা শুনে চায়ের দোকানদার ছেলেটা বলে উঠল , ' ভটচাজ দা , আমি একটা কথা বলছি শুনুন | আপনার ছেলের কয়েকজন বন্ধু আছে | তারমধ্যে একজনের সাথে ওর খুব মেলামেশা | ছেলেটার নাম প্রিয়ঙ্কর | বড়রাস্তার মোড়ে ওদের বাড়ি | আপনার ছেলের ওদের বাড়িতে খুব যাতায়াত আছে | আমি যতদূর জানি ওই প্রিয়ঙ্করদের বাড়িটা ঠিক সুবিধার নয় | গোলমেলে ব্যাপার আছে ওই বাড়িতে |

পরাশর বাবু : গোলমেলে ব্যাপার ? কোন ধরণের গোলমেলে ব্যাপারের কথা বলছো পল্টু ?

পল্টুর চোখমুখ যেন কিরকম ফ্যাকাশে হয়ে গেলো | খুব আস্তে আস্তে ভয়ার্ত কণ্ঠে ও বললো , ' অপদেবতা ' |

পরাশর বাবু : কি ? কি সব আজেবাজে বকছো ? অপদেবতা ? মানে ভূত ? তাতে কি হলো ? তার সাথে আমার ছেলেরই বা সম্পর্ক কোথায় ?

পল্টু : আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার ছেলে নিশ্চই কিছু একটা দেখেছে ওই বাড়িতে | যার জন্য ভালো ছেলেটা হটাৎ মনোরোগী হয়ে উঠেছে |

পল্টুর কথাটা পরাশর বাবুকে নাড়া দিয়ে গেলো | সেই জন্যেই কি ডাক্তার ঘোষ কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না যে কেন এরকম হয়েছে ! তাহলে কি পল্টু যা বলছে সব ঠিক ! ওফফ ....কিছু ভাবতে পারছিনা | এর খোঁজ পেতে গেলে আমাকে যেতে হবে প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে | আজকেই , এখনই , আর দেরি করা যাবেনা |

পরাশর বাবু হাঁটা লাগালেন | ওনার বন্ধুরা ওনার সাথে যেতে চাইলেও , উনি সাথে আর কারোকে নিতে রাজি নন | ছেলের জন্য যা করার নিজেই করবেন , মনে মনে শপথ করে শুরু হলো তাঁর এক অতি ভয়াবহ অলৌকিক রহস্যময় পথে পাড়ি দেওয়া |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty
পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়ি পৌঁছে ডোরবেল বাজালেন | সন্ধ্যার অন্ধকারে বাড়ির ঠিক পাশের ছাতিম ফুলের গাছটা দেখে কেমন গা ছমছম করছে ওনার |

কিছুক্ষন পরে প্রিয়ঙ্কর এসে দরজা খুললো | পরাশর বাবুকে দেখে ও যেন কিরকম চমকে উঠলো | 

পরাশর বাবু : তুমি বাণীব্রতর বন্ধু প্রিয়ঙ্কর তো ?

প্রিয়ঙ্কর ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো , ' হ্যাঁ , বাণী ঠিক আছে তো ? '

পরাশর বাবু : হটাৎ এ প্রশ্ন করলে যে ? প্রিয়ঙ্কর : কাকু , আপনি ভেতরে আসুন , আপনার সাথে কথা আছে |

পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করের পেছনে পেছনে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলেন | কিরকম একটা অজানা ভয় এসে যেন গ্রাস করছে ওনার অন্তরাত্মাকে |

দোতলায় উঠে প্রথম ঘরটাই বৈঠকখানা | লম্বা টানা বারান্দায় পর পর সারিবদ্ধ ঘর | একদম শেষের দিকে একটা বড়ো ঘর , তাতে লোহার দরজা লাগানো | সেই দরজাটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া |

একটা বিশ্রী হিমশীতল বাতাস এসে পরাশর বাবুর মুখে ঝাপ্টা মারলো | আর তারসাথে একটা অদ্ভুত গন্ধ | পচা লাশের সাথে ইথার , আর ওষুধ মেশানো থাকলে যেমন গন্ধ বেরোয় ঠিক সেরকম গন্ধ |

উনি আর কালবিলম্ব না করে বৈঠকখানায় গিয়ে বসলেন | সারাশরীর ঝিমঝিম করছে ওনার |

সেটা লক্ষ্য করে প্রিয়ঙ্কর বললো , ' কাকু , আপনি ঠিক আছেন তো ? আপনাকে একটু জল এনে দিই ? '

পরাশর বাবু : হ্যাঁ , একটু জল দাও , গলাটা হটাৎ খুব শুকিয়ে গেছে |

প্রিয়ঙ্কর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো , রান্নাঘর থেকে জল আনার জন্য | পরাশর বাবুর চোখ দরজার দিকেই নিবদ্ধ |

হটাৎ উনি দেখলেন একজন নারী অবয়ব ঝট করে বারান্দার পেছনের দিকটায় চলে গেলো | ব্যাপার কি দেখার জন্য উনিও ওই নারী অবয়বের পিছু নিলেন |

টিমটিমে সিঁড়ির আলোয় উনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন , ওই নারীটি লোহার দরজাওয়ালা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন | তার পরেই পরাশর বাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো | কারণ লোহার দরজাটা তখোনো বাইরে থেকে তালাবন্ধ |

ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন উনি | প্রিয়ঙ্কর জল নিয়ে এসে ওনার এই অবস্থা দেখে ওনাকে সোফায় বসালো , চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে ওনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগলো |

খানিকটা ধাতস্থ হয়ে উনি জিজ্ঞাসা করলেন , ' কে ছিল ওটা ? বন্ধ দরজা দিয়েও ভেতরে চলে গেলো ? বলো প্রিয়ঙ্কর চুপ করে থেকোনা | '

প্রিয়ঙ্করের হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শেষ করেও যেন গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে ওনার |

প্রিয়ঙ্কর : কাকু , আগে বলুন বাণী কেমন আছে ? পরাশর বাবু বাণীব্রতর ব্যাপারে সব কথা প্রিয়ঙ্করকে বললেন |

সব শুনে প্রিয়ঙ্কর বললো , ' বাণী গত রবিবার ক্রিকেট খেলে সন্ধ্যের সময় আমাদের বাড়ি এসেছিলো | খুব ক্লান্ত ছিল ও |

আমি ওকে বললাম ' তুই কি একটু রেস্ট নিবি ? আমার এখন একটা টিউশন পড়ানোর আছে | আমি নিচের তলায় আছি | তুই একটু ঘুমিয়ে নে | আমি পড়িয়ে এসে একসাথে বসে চা খাবো |

বাণীও আমার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো | কিছুক্ষন পরে আমি একটা আর্তনাদ শুনতে পাই | তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে আমার ঘরে গিয়ে দেখি , বাণী উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে |

আমার বাবার তো এন্টিবায়োটিকের ফ্যাক্টরি আছে নিচের তলায় , আমি বাবাকে চিৎকার করে ডাকি | বাবা ছুটে আসে | তখন আমি আর বাবা মিলে ওকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিই | জলের ঝাপ্টা দিতে দিতে বেশ কিছুক্ষন পরে ওর জ্ঞান ফেরে |

বিস্ফারিত চোখে আমাদের দিকে চেয়ে ও বলে ওঠে , ' ওরা কারা ? ' তারপরেই আমাকে একধাক্কায় মাটিতে ফেলে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় |

আমি গত তিন দিন ধরে ওর কথাই চিন্তা করছিলাম | পরাশর বাবুর ভীষণ ভয় করতে লাগলো ছেলের জন্য |

উনি জিজ্ঞাসা করলেন , ' আমিও আজকে এক নারী অবয়ব দেখেছি , লোহার দরজার মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে গেলেন , তুমি কি বলতে পারো ? কে ছিলেন উনি ?

প্রিয়ঙ্কর : আমাকে মাফ করবেন কাকু , আমার বলা বারণ আছে | আপনি কালকে সকালে আসুন | যা প্রশ্ন আমার বাবাকেই করবেন |

পরাশরবাবু : আচ্ছা , নাহয় কাল সকালেই আসবো |

ধীরপায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ঘুরে একবার বারান্দার শেষ ঘরটার দিকে ফিরে দেখলেন উনি | যেন মনে হলো জ্বলজ্বলে চোখে কেউ ওনার দিকে তাকিয়ে আছে |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty
সেই রাত্রে বাড়ি ফিরে পরাশর বাবুর প্রচন্ড জ্বর এলো | জ্বরের ঘোরে উনি বলতে লাগলেন , ' ছেড়ে দে , আমার ছেলেকে ছেড়ে দে | ও তো কোনো দোষ করেনি | ওকে ছাড় তোরা | '

অনিমাদেবী একদিকে ছেলে আর অপরদিকে স্বামীকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন | বাণীব্রতরও অবস্থা খুব একটা ভালো নয় | সারাদিন ঘরে বসে বিড়বিড় করে কি বলতে থাকে আর মাঝে মাঝে দেওয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে কাঁদতে থাকে |

রাত তখন কাঁটায় কাঁটায় বারোটা বাজে | বাণীব্রতর ঘরে একটা টিমটিমে নাইট বাল্ব জ্বলছে | কিন্তু ওর চোখে ঘুম নেই |

ও খাটের ওপরে বসে বসে হটাৎ খুব জোরে জোরে হাসতে লাগলো আর বলতে লাগলো , ' কাউকে ছাড়বোনা , সবে তো শুরু , দেখ , কি অবস্থা করি তোদের | যত কষ্ট আমরা পেয়েছি , তার থেকে হাজার গুন কষ্ট দিয়ে মারবো এক একটা কে' 

- এই বলে ছুটে গিয়ে সামনের টেবিলে রাখা কাচের ফুলদানিটা আছাড় মেরে ভেঙে , একটা কাচের টুকরো হাতে তুলে নিলো | তারপর সেটা দিয়ে নিজের হাত কেটে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করতে লাগলো |

অনিমা দেবী ফুলদানি ভাঙার শব্দে ঘরে এসে এই কান্ড দেখে কান্না কাটি শুরু করে দিলেন |

বাণীব্রত একটা পৈশাচিক দৃষ্টিতে অনিমাদেবীর দিকে তাকালো | নিজের ছেলের চোখ দেখে তখন ওনার ওনার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে | বাণীব্রতর চোখটা টকটকে লাল , এক অদ্ভুত জিঘাংসা ফুটে উঠেছে ওর চোখে |

চিৎকার করে অনিমাদেবী বাড়ির পুরোনো কাজের লোক শক্তি কে ডাকলেন | শক্তির নামই শুধু শক্তি নয় , ওর শরীরেও অসুরের বল | ও তাড়াতাড়ি গিয়ে বাণীব্রতকে জাপ্টে ধরে ওর হাত থেকে কাচের টুকরোটা ফেলে দিলো |

এই রাত্রিবেলা তো ডাক্তারকে কল দিলেও আসবেননা | শক্তি বাণীব্রতর হাতদুটো নিজের গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলো | তারপর অনিমাদেবীর উদ্দেশ্যে বললো , ' বৌদিমনি , আপনি দাদাবাবুর দেখাশুনো করুন , আমি আছি এখানে , কোনো চিন্তা নেই | '

অনিমাদেবী পরাশর বাবুর কাছে গিয়ে বসলেন | উনি তখন গভীর ঘুমে অচেতন | সারারাত দুই ঘরে দুজন বিনিদ্র কাটালো , বাণীব্রতর ঘোরে শক্তি আর পরাশর বাবুর কাছে অনিমাদেবী |

ভোরের দিকে অনিমাদেবীর চোখটা লেগে গিয়েছিলো | ওনার ঘুম ভাঙলো তখন সকাল নয়টা বেজে গেছে | বিছানার দিকে চেয়ে দেখলেন পরাশর বাবু নেই | সারাবাড়ি খুঁজে কোত্থাও ওনাকে পাওয়া গেলোনা |

ওদিকে শক্তিও সারারাত জেগে , এখন বসে ঢুলছে | বনব্রতর চোখে কোনো ঘুমই নেই | স্থির দৃষ্টিতে ও চেয়ে আছে সিলিং ফ্যান এর দিকে |

অনিমাদেবী শক্তিকে ডাক দিলেন , ' ওরে শক্তি , তোর দাদাবাবুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা | অসুস্থ মানুষটা গেলো কোথায় রে | ' বলে চিৎকার ককরে কাঁদতে লাগলেন |

ওদিকে ধুম জ্বর আর উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে পরাশর বাবু গিয়ে হাজির হলেন প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে | দিনের বেলাতেও বাড়িটাতে কিরকম একটা অশুভ শক্তির ছাপ রয়েছে | প্রিয়ঙ্করের বাবা পরাশর বাবুকে নিয়ে গিয়ে ওনার ঘরে বসালেন |

চোখেমুখে উদ্বেগ , ক্লান্তি আর অসুস্থতা ফুটে উঠেছে পরাশর বাবুর | রীতিমতো হাঁপাচ্ছিলেন উনি | ওনাকে জল খেতে দিয়ে প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু ওনার সামনে বসলেন |

একটু ধাতস্হ হতে উনি পরাশর বাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন , ' বাণীব্রতর খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে | ঐদিন সন্ধ্যেবেলায় ঘটনা নিশ্চই প্রিয়ঙ্কর আপনাকে বলেছে | '

পরাশর বাবু : আচ্ছা , কালকে আমি একজন নারী অবয়বকে দোতলার ওই লোহার দরজাওয়ালা বন্ধ ঘরটার মধ্যে মিলিয়ে যেতে দেখেছি |

প্রীতমবাবু : আপনাকে আমি সব কথা বলতে পারবোনা | তবে এইটুকু জেনে রাখুন , বাণীকে ওদের মধ্যেই একজন ভর করেছে | এর আগেও আরেকজনকে ভর করেছিল | তাকে বাঁচানো যায়নি | এই বাড়িতে কিছু একটা এমন ঘটনা ঘটেছিলো , যার ফলে এই বাড়ির দুজন সদস্যের আত্মার এখোনো মুক্তি হয়নি | আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম | কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারিনি , ওদের দুজনকে বাঁচাতে পারিনি | ওরা আমাদের বাড়ির লোকের কোনো ক্ষতি করেনা , কিন্তু বাইরের কেউ এলে , ওদের হাত থেকে পরিত্রান পাওয়া খুবই মুশকিল |

পরাশর বাবু : এরকমই যখন ব্যাপার ! তখন আমার ছেলেকে একা ওপরের ঘরে ছেড়ে দিলো কেন প্রিয়ঙ্কর ?

প্রীতমবাবু : ও ঠিক বুঝতে পারেনি যে এরকমটা হতে পারে | ওকে ক্ষমা করে দিন |

পরাশর বাবু : আপনারা কোনো তান্ত্রিক এনে যজ্ঞ করাতে পারতেন , শুনেছি ওরা অতৃপ্ত আত্মাদেরকে বশ করতে পারে |

প্রীতমবাবু : আমি এর বেশি কিছু বলতে পারবোনা , আমাকে মাফ করুন |

পরাশর বাবু : আচ্ছা , ওই লোহার দরজাওয়ালা ঘরটা কি একবার খোলা যাবে ? আমি দেখতে চাই |

প্রীতমবাবু : দেখতে পারি ঘরটা , কিন্তু আগে থেকেই আপনাকে সাবধান করে রাখি , ওই ঘরে কোনো জিনিসে হাত দেবেন না | আর আমি ভেতরে যাবোনা , আপনাকে একই যেতে হবে ওই ঘরের মধ্যে |

একটা বড়ো চাবি হাতে নিয়ে প্রীতমবাবু পরাশর বাবুকে নিয়ে চললেন ওই ঘরের দিকে | ঘরটার সামনে পৌঁছে পরাশর বাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো | প্রীতমবাবু আগেই বলে দিলেন যে , ওই ঘরে আলো জ্বালানো নিষেধ আছে |

চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এসে লাগলো ওনার নাকে | ঘরের দরজাটা খুলে দিয়েই প্রীতমবাবু দ্রুতপদে নিচে নেমে গেলেন | ঘরের ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার |

ভেতরে চামচিকের বাসা , ইঁদুর আরশোলার বিশ্রী গন্ধের সাথে সেই গন্ধটাও ভেসে এলো , যেটা আগেরদিন সন্ধ্যেবেলা পরাশর বাবু পেয়েছিলেন | সেই পচা মৃতদেহের সাথে ইথার আর ওষুধ মেশানো গন্ধ | হটাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে চোখেমুখে ঝাপ্টা মেরে গেলো ওনার | একটা চাপা কান্নার আওয়াজ যেন ঘরের কোণ থেকে ভেসে আসছে |

আলোআঁধারীর মায়াজালে পরাশরবাবুর হটাৎ নজর পড়লো সিলিং ফ্যানটার দিকে | শরীরের সব রক্ত যেন একসাথে হৃদপিন্ডে ধাক্কা মারলো ওনার | সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে আধপোড়া একটা নারীদেহ |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ওদিকে পরাশর বাবুর বাড়িতে তখন তোলপাড় কান্ড চলেছে | একেই তো ওনাকে বাড়িতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা , তার ওপর বাণীব্রত নিজের হাত কামড়ে কামড়ে মাংস খুবলে তুলছে | প্রবল আক্রোশ তখন ওর চোখে মুখে |

ভয়ে ওর মা বা শক্তি কেউই ওর দিকে এগোনোর সাহস করছেনা | বাণীব্রতর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে ওরা ঠকঠক করে কাঁপছে |

বাণীব্রতর গলা দিয়ে তখন দুরকমের স্বর একসাথে বেরোচ্ছে , একটা ওর নিজের , যে কিনা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে , আর আরেকটা কোনো বাচ্চা মেয়ের , যার স্বর শুনলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় |

চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পৈশাচিক শব্দে সে বলছে , সবাইকে মারবো , সবাইকে মরতে হবে , আমিও মরেছি , কারুর পরিত্রান নেই আমার হাত থেকে |

বলতে বলতে , বাণীব্রত নিজের কত কামড়ে চিরে ফালাফালা করছে | অনিমাদেবী  একাধারে ছেলের করুন অবস্থা , আর অপরদিকে ওই পৈশাচিক উল্লাস  সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন |

ওদিকে পরাশর বাবুর সামনে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে রয়েছে আধপোড়া নারীদেহ | উনি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কখন প্রস্রাব করে ফেলেছেন নিজেই বুঝলেন না |

হটাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে উনি ভীষণ একটা চিৎকার করে পড়ি কি মরি ভাবে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলেন | আর একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে উনি দৌড়োলেন বাড়ির দিকে |

রাস্তায় পরিচিত ব্যক্তিরা ওনাকে দেখে ভাবলো , হয়তো ওনার মানসিক কোনো সমস্যা হয়েছে |

বাড়ি ঢুকে ওই পরিস্থিতি দেখে উনি একদম ভেঙে পড়লেন | হায় ভগবান , ছেলেটাকে কি শেষপর্যন্ত বাঁচাতে পারবোনা ? ওনার স্ত্রীর ততক্ষনে জ্ঞান ফিরে এসেছে | একে - অপরকে জড়িয়ে ধরে ওনারা কান্নায় ভেঙে পড়লেন |

অনিমাদেবী : কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি ? একেই অসুস্থ শরীর | আমাকে তো একবার ডাকতেও পারতে |

পরাশর বাবু : তুমি জানোনা , কি ভীষণ বিপদে পড়েছি আমরা | ছেলেকে এখন রক্ষা করা খুব মুশকিল | এর আগেও নাকি আরেকজনকে ভর করেছিলো , তাকে বাঁচানো যায়নি  |

অনিমাদেবী: কিসের ভর ? কে করেছে ভর ? কেনই  বা আমার ছেলেটাকে এরকম করলো ?

পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে যতটা জেনেছিলেন এবং দেখেছিলেন , বিস্তারিত স্ত্রীকে জানালেন | ওনার কথা শুনে অনিমাদেবী খানিক্ষন চুপ করে বসে রইলেন |

তারপর বললেন , ' এখন ভয় পেলে বা ভেঙে পড়লে চলবেনা | আমাদের শক্ত হতে হবে | আজকেই গিয়ে    স্বনামধন্য তন্ত্রসম্রাট ভোলানাথ ভট্টাচার্য্যের সাথে দেখা করো | ওনার নিশ্চই  কোনো উপায় জানা থাকবে | '

পরাশর বাবু : বাহ্ ! আমার তো মনেই ছিলোনা | আজ বিকেলেই কেওড়াতলা মহাশ্মশানে ওনার পায়ে গিয়ে পড়বো , নিশ্চিত উনি কোনো উপায় বলে দেবেন |

বাণীব্রত এখন অচৈতন্য হয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ে  আছে | দুটো হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে | পরাশর বাবু ওনার ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানকে কল করলেন | ডাক্তার সেন এসে বাণীব্রতকে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে চলে গেলেন | ও যতক্ষণ ঘুমোবে ততক্ষন ভালো থাকবে | উনি ক্লিনিক থেকে একজন নার্সকে পাঠিয়ে ওর স্যালাইনের ব্যবস্থা করে দেবেন |

ঘুমন্ত ছেলের মাথার সামনে বসে অনিমাদেবী আঁচলে বার বার চোখের জল মুছছেন | আর পরাশর বাবু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বিকেলের |

তান্ত্রিক ভোলানাথ ভট্টাচার্য পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে ধুনি জ্বালিয়ে আরাধনায় নিমগ্ন | শ্মশানের এক পরিত্যক্ত চামুন্ডা মাতার মন্দিরের সামনে ওনার বসবাস | উনি ছোটবেলা থেকেই শ্মশানবাসী | 

বিকেল পাঁচটা নাগাদ তান্ত্রিক ভোলানাথ ভট্টাচার্যের কাছে পরাশর বাবু সবে পা রেখেছন , তান্ত্রিক ওনাকে দেখে শিউরে উঠলেন | 'সর্বনাশ ! মহা বিপদ ! বাঁচানো খুব মুশকিল ' , বলে তান্ত্রিক যজ্ঞবেদীর ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে পরাশর বাবুর দিকে তাকিয়ে আছেন |

পরাশর বাবু কেঁদে ওনার পায়ে পড়লেন | আপনি বাঁচান | আপনিই পারবেন | দয়া করুন বাবা | আমার ছেলেটা নাহলে মারা পড়বে |

তান্ত্রিক : তোর ছেলেকে যে ধরেছে তাকে আমি আগে একবার বশ করেছিলাম | কিন্তু সে মুক্ত হলো কিভাবে ? এ অতি আশ্চর্যজনক |

পরাশর বাবু : আপনি তো সব জানেন বাবা , আমার ছেলেটাকে বাঁচান |

তান্ত্রিক : আগামী পরশু কৌশিকী অমাবস্যার রাত | ঐদিন আমি যাবো সেই বাড়িতে , যেখান থেকে আমি ওই আত্মাদেরকে আগেও বশ করে তিনহাত মাটির নিচে পুঁতে দেবার ব্যবস্থা করেছিলাম |

পরাশর বাবু : আপনার দয়া অপরিসীম | আমি ওই বাড়িতে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে রাখবো | আমাকে বলে দিন কি করতে হবে ?

তান্ত্রিক : তুই কি ব্যবস্থা করবি রে ? তোর ক্ষমতা কতটুকু ? যা , এখন আমাকে বিরক্ত করিসনা | যা করার আমিই করবো | পরশু অমাবস্যার রাত্রে ঠিক বারোটায় আমি গিয়ে হাজির হবো ওই বাড়িতে |

তান্ত্রিকের কথায় আশার আলো দেখতে পেয়ে পরাশর বাবু শ্মশান থেকে বেরিয়ে বাসে ওঠার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন |

অদূরেই কাঠের চিতায় একজন যুবতীকে দাহ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে | পরাশর বাবু হেঁটেই চলেছেন | বাসস্টপ আর আসেনা | এতদূরে তো হবার কথা নয় | আসার সময় খুব বেশি হলে তিন মিনিট হেঁটেছিলেন বাস থেকে নেমে |

উনি প্রায় পনেরো মিনিট ধরে হাঁটছেন | কিন্তু পথ শেষ হবার নাম নেই | সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নেমেছে শ্মশানের বুকে | কুকুরের কান্না আর 'বলো হরি , হরি বোলের' ধ্বনিতে মুখরিত চরাচর |

পরাশর বাবু প্রায় চল্লিশ মিনিট হেঁটেও বাস স্টপ খুঁজে পেলেন না | ঘুরে ফিরে সেই শ্মশানের সামনেই বার বার এসে পড়তে লাগলেন |

ওনার অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে উঠতে  লাগলো | প্রায় দু - ঘন্টা ধরে হেঁটেও উনি সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন | এ এক অজানা মৃত্যুকূপ | এর অন্ত নেই |

শরীরের শেষ শক্তিটাকে সঞ্চয় করে উনি আবার সেই তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন |

ওনাকে দেখে তান্ত্রিক বীভৎস ভাবে হেসে উঠলেন , ' কি রে ? বেরোতে দিচ্ছে না তোকে ? ঘুরপাক খাচ্ছিস এতক্ষন ধরে ? এই নে , বলে তান্ত্রিক একটা মৃত মানুষের হাড়ের টুকরো পরাশর বাবুর দিকে ছুঁড়ে দিলেন আর বললেন , যা , এবারে চলে যেতে পারবি , মন্ত্রপূত হাড়ের এই টুকরোটাই তোকে উদ্ধার করে পৌঁছে দেবে গন্ত্যব্যস্তলে |

সত্যিই আশ্চর্যজনকভাবে উনি তিন - চার মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন বাস স্টপে | তান্ত্রিকের ওপর বিশ্বাস ওনার আরো বেড়ে গেলো | নিশ্চই উনি আমার ছেলেকে ঠিক করে তুলবেন |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
বাড়ি ফিরে পরাশর বাবু অনিমাদেবীকে সব কথা আদ্যোপান্ত ব্যাখ্যা করলেন |

অনিমাদেবী : জয় মা চামুন্ডা , আমাদের পরিবারকে রক্ষা করো মা |

মাঝখানে মাত্র একটা দিন | ছেলেকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এই দিনটা কেটে গেলো |

কৌশিকী অমাবস্যার দিন সন্ধ্যেবেলা পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে গেলেন | প্রিয়ঙ্কর তখন বাড়িতে সম্পূর্ণ একা | পরাশর বাবুকে দেখে প্রিয়ঙ্কর ভেতরে গিয়ে বসার অনুরোধ করলো |

পরাশর বাবু বললেন , ' আমি এখন বসতে আসিনি | আজকে কৌশিকী অমাবস্যার রাত | আজকে রাত্রি ঠিক বারোটার সময় আমি আসবো , আর আসবেন তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্য | এই বাড়ির অশরীরীদেরকে বশ করতেই তিনি আসবেন এখানে |

প্রিয়ঙ্করের সাথে কথোপকথনের মাঝখানেই পরাশর বাবু কিরকম একটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন | প্রিয়ঙ্করকে দেখে কিরকম যেন অন্য রকম লাগছিলো , যেন কোনো একটা আক্রোশ ফুটে উঠছে প্রিয়ঙ্করের চোখে মুখে |

অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে ওর মুখমন্ডল | ধীরে ধীরে অতি ক্রুর আর শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো ওর চোখেমুখে | বদলে যেতে লাগলো ও | এসব দেখে পরাশরবাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো | উনি বুঝে গেলেন যে , এটা প্রিয়ঙ্কর নয় , কোনো এক অশরীরী আত্মা |

পরাশর বাবু ওখান থেকে পালাতে গিয়ে দেখলেন ওনার পা দুটো পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠেছে | উনি চেয়েও একচুলও নড়তে পারছেন না |

প্রিয়ঙ্করের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠলো এক দানবীয় রূপ | বিস্ফারিত মণিবিহীন চোখে ভয়ানক আক্রোশ | পরাশর বাবু ভয়ে কেঁদে ফেললেন ওই বীভৎস চেহারা দেখে |

জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিয়ে ওই পিশাচ এগিয়ে এলো পরাশর বাবুর দিকে | ধারালো নখ বসিয়ে দিলো ওনার বুকের ওপরে | তারপর আচমকা সেই বীভৎস অবয়ব মিলিয়ে গেলো হাওয়ায় |

পরাশর বাবুর বুক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে | প্রাণের ভয়ে পড়ি কি মরি করে উনি দৌড়ে পালালেন | বাড়ি যেতে অনিমাদেবী ওনার রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন | সাদা শার্টের একদিকটা রক্তে ভিজে সপসপ করছে | পরাশর বাবু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন |

ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিতে যাবার জন্য শার্ট খুলতে যেতেই বুকপকেটে শক্ত কিছু হাতে ঠেকলো | পরাশর বাবু দেখলেন সেটা তান্ত্রিকের দেওয়া সেই হাড়ের টুকরো | এখন উনি বুঝতে পারলেন সেই শক্তিশালী আত্মা কেন ওনাকে ছোঁয়ার পর হটাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো |

তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে উনি করজোড়ে প্রণাম জানালেন |

রাত ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বারোটা , প্রিয়ঙ্করদের বাড়ির ডোরবেলটা কয়েকবার বেজে উঠলো | প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু ঘুমজড়ানো চোখে উঠে এসে দরজাটা খুলে তন্ত্রসম্রাটকে দেখে চমকে উঠলেন , ' বাবা , আপনি ? আপনি কেন এখানে ? '

তান্ত্রিক : তুই জানিসনা আমি কেন এসেছি ? আগেরবার ওই মা আর মেয়ের আত্মাকে বন্দি করে তোদের গ্রামের বাড়ির বাগানে বুড়ো অশ্বত্থগাছের তলায় তিন হাত মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিলাম | ওরা মুক্ত হলো কিভাবে ? '

প্রীতমবাবু : আমি কিছু জানিনা | আমাকে ক্ষমা করুন | দয়া করুন বাবা | ওদেরকে এখানেই থাকতে দিন |

তান্ত্রিক : সব জানিস তুই , শয়তান ! তোর শয়তানি আমি বুঝিনা ভাবছিস ? নিজের ছোটভাইকে বাঁচাতে তুইও ওই নারকীয় হত্যাকান্ডকে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছিস | আর তারজন্য ফল ভোগ করছে একটা নিরীহ পরিবার ! তোকে এর উচিত শিক্ষা দেবো | আগে তো ওই দুই আত্মাকে বন্দি করি | আমি এবারে ওদেরকে আমার হেপাজতে রাখবো | এখন বল , কেন এরকম করেছিস ? কেন ওদেরকে বন্দিদশা থেকে আবার মুক্ত করেছিস তুই ? নাহলে তোর রেহাই নেই |

প্রীতমবাবু : আমার কোনো দোষ নেই বাবা | আপনি বিশ্বাস করুন | ওরা রোজ ঘুমের মধ্যে আমাকে দুঃস্বপ দেখাতো , ভয় দেখাতো | আমার বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা করতো |

তান্ত্রিক : এখন চল সেই দরজাটা খুলে দে আমাকে | ওদেরকে আমি চিরকালের জন্য বন্দি বানাতে এসেছি আজ |

প্রীতমবাবু তান্ত্রিকের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন , ' এরকম করবেন না , তাহলে আমার পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে | '

তান্ত্রিক : তোর একারই পরিবার আছে ? ওই নির্দোষ মানুষগুলো যে শাস্তি পাচ্ছে তারজন্য কোনো হেলদোল নেই তোর ! ভালোয় ভালোয় দরজাটা খুলে দে বলছি | নাহলে আজকেই তোর জীবনের শেষ রাত |

তান্ত্রিকের চোখের অগ্নিদৃষ্টিতে ভয় পেয়ে প্রীতমবাবু কাঁপা কাঁপা হাতে চাবি নিয়ে এসে ওই ঘরের দরজাটা খুলে দিলো |

তান্ত্রিক ভেতরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন | মন্ত্রপূত ঘটের মুখটা খুলে চারদিকে মন্ত্রপুর জল ছিটিয়ে দিতে লাগলেন | আর আহ্বান করলেন মা চামুন্ডাকে |

কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘরের ভেতরে অশরীরীর আর্তচিৎকার শোনা যেতে লাগলো | ঘরের ভেতর ঘূর্ণিঝড় বয়ে চলেছে , সমস্ত আসবাবপত্র এদিক ওদিক ছিটকে যাচ্ছে | করুন কান্নায় মুখরিত হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস | কালো রঙের কুন্ডলীপাকানো ধোঁয়ায় সারাঘর ছেয়ে গেছে |

ওদিকে পরাশর বাবুর বাড়িতে বাণীব্রত ঘুম থেকে জেগে উঠেছে | প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে শরীরে | ও মাটিতে পড়ে ছটফট করছে , আর ওর সারা শরীর থেকে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে বাইরে বেরোচ্ছে | সেই কালো ধোঁয়া ঘনীভূত হয়ে জানালার বাইরে বেরিয়ে গেলো | কিছুক্ষন পরে বাণীব্রত জ্ঞান হারালো |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী বুঝতে পারলেন যে তন্ত্রসম্রাটের তন্ত্রবিদ্যার জাদু শুরু হয়ে গেছে | হয়তো ওই অতৃপ্ত আত্মা বাণীব্রতর শরীর ছেড়ে বেরোতে বাধ্য হয়েছে |

বদ্ধ ঘরের মধ্যে তান্ত্রিকের জোরে জোরে মন্ত্রোচ্চারণ আর আহ্বানে মা এবং মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা কেন্দ্রীভূত হলো মন্ত্রপূত ঘটের ওপরে |

তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে এলো | ঝোড়ো হাওয়াও উধাও হয়ে গেলো | কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলিটা ঘটের ভেতরে হারিয়ে গেলো | তান্ত্রিক তৎক্ষণাৎ ঘটের মুখটা একটা লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলেন | তারপর বেরিয়ে এলেন ঘরের বাইরে |

প্রীতমবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন , ' তোদের যা যা পাপ সব ওই নির্দোষ পরিবারের কাছে স্বীকার করবি , নাহলে এরপর তোকে আমি নিজের হাতেই শাস্তি দেব | ' তন্ত্রসম্রাট ধীরে এবং দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন প্রীতমবাবুর বাড়ি থেকে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো বাণীব্রত | মাথার সামনে বাবা - মা কে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো | যেন বহুদিন পর ওর বাবা - মায়ের কাছে ফিরে এসেছে |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী যেন তাদের চেনা বাণীব্রতকে ফিরে পেলেন | তিনজনেই একে - অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে | এই অশ্রু শুধুমাত্র আনন্দের |

খানিকটা সুস্থ হবার পর পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী বাণীব্রতকে জিজ্ঞাসা করেন , ' কি হয়েছিল ওর , যার জন্য ও ওরকম ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল , কি ঘটেছিলো সেই সন্ধ্যাবেলায় প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে ! '

বাণীব্রতর চোখগুলোয় স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠলো | ও বলতে শুরু করলো , ' আমি সেদিন সন্ধ্যাবেলা ক্রিকেট খেলে প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে গেছিলাম | ভাবলাম একটু গল্প গুজব করে রবিবারের সন্ধ্যেবেলাটা কাটাবো | কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি তখন প্রিয়ঙ্করের এক ছাত্র পড়তে এসেছে |

প্রিয়ঙ্কর বললো ওর বেডরুমে আমাকে বিশ্রাম নিতে , ও পড়িয়ে একটু পরেই ওপরে চলে আসবে | জানো বাবা , আমি বিছানায় শুয়েছি , চোখটা লেগে আসছিলো | হটাৎ কেমন একটা পচা গন্ধ এসে লাগলো আমার নাকে | ঝট করে ঘুমটা ভেঙে গেলো |

বিছানার ঠিক পায়ের কাছে দুটো খোলা জানালা | আমি দেখি দুটো জানালায় দুজন দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে | কি জ্বলন্ত সেই দৃষ্টি | তাদের মধ্যে একজন বিবাহিতা নারী আর অপরজন একটা দশ - বারো বছরের বাচ্চা মেয়ে |

ওরা আমাকে হাতের ইশারায় ওদের কাছে ডাকছিলো | আমি ওঠার চেষ্টা করলাম , কিন্তু শরীরটা পাথরের চেয়েও বেশি ভারী লাগছিলো আমার | সারা শরীরে তীব্র ব্যাথা আর জ্বালা করছিল | আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে চারদরটা মাথা পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি |

খানিক্ষন পরে ভাবলাম এবারে উঠে একদৌড়ে ওদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবো | ধীরে ধীরে চাদরটা সরাতেই আমার হার্ট বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় | দেখি , ওরা ঘরের ভেতরে খাটের দুপাশে দুজন দাঁড়িয়ে আছে | চোখ মুখ গলে গলে পড়ছে , আর পচা মাংসের গন্ধে আমার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে |

আমি চেঁচাবার জন্য মুখ খুলেও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না | আমি আবার মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি , গলা শুকিয়ে কাঠ , নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে তখন আমার | চোখ বন্ধ করে কাঁদছি , আর তোমায় ডাকছি বাবা , এসো , আমাকে বাঁচাও |

হটাৎ মুখের ওপর হীমশীতল বাতাসের ঝাপ্টা এসে লাগলো | মাথাঢাকা চাদরের ভেতরেই কোনোমতে চোখ খুলে দেখি ওই বীভৎস দুটো মুখ আমার একদম মুখের ওপরে ঝুঁকে আছে | ক্রুর এবং পাশবিক হাসি ফুটে উঠেছে ওই দুই মুখাবয়বে | এরপর আর আমার কিচ্ছু মনে নেই |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন , ' কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তোকে বাবু , কত ব্যাথা পেয়েছিস | আর কোনো বিপদ হবেনা , আর কেউ কিচ্ছু করতে পারবেনা | তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্যকে ওনারা মনে মনে শ্রদ্ধা জানালেন | ছেলেকে ওনারা বললেন কিভাবে তান্ত্রিক ওর শরীর থেকে আত্মাকে মুক্ত করে বন্দি বানিয়েছেন | ওনার জন্যেই বাণীব্রত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে |

কিছু সময় পরে ওদের বাড়ির ডোরবেলটা বেজে উঠলো | পরাশর বাবু দরজা খুলে দেখলেন সামনে প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু দাঁড়িয়ে আছেন | ওনার চোখেমুখে অনুতাপ ও ভয়ের স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করলেন |

পরাশর বাবু : আসুন , ভেতরে আসুন | আমি জানতাম আপনি নিশ্চই আসবেন |

ড্রয়িং রুমে প্রীতমবাবুকে বসিয়ে শক্তিকে বলে দিলেন দু কাপ কফি দিয়ে যেতে |

প্রীতমবাবু : আমি আজকে আপনাদেরকে কিছু বলতে এসেছি | আপনাদের ছেলের এত কষ্টের জন্য আমিও কমবেশি দায়ী | এর পেছনে আছে এক অতি মর্মান্তিক ঘটনা | সব শুনে যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করতে পারেন তো ভালো , নাহলে আমি পুলিশের কাছে নিজের সব দোষ স্বীকার করে নেবো |

প্রীতমবাবু বলতে শুরু করলেন , ' আমাদের পরিবারটা খুব সুন্দর , সুখী পরিবারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল | জয়েন্ট ফ্যামিলিতে আমরা দুই ভাই , আমাদের দুজনের বৌ আর বাচ্চাদেরকে নিয়ে খুব সুখে ছিলাম |

ছোটভাইয়ের অর্ডার সাপ্লাই- এর ব্যবসা ছিল | ভাইয়ের বৌ খুব সুন্দরী ছিল | ওদের একটা ফুটফুটে মেয়ে , তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়ে |

আমার ভাইয়ের সেই সময় ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায় | লস এতটাই বেশি ছিল যে , ওর ব্যবসাটা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় | সারাদিন ও পাগলের মতো এদিক ওদিক ঘুরেও কিছুতেই কিছু উপায় বের করতে পারছিলোনা | দিন দিন ও মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে লাগলো |

একদিন ওর সাথে দেখা করার জন্য দুজন লোক বাড়িতে আসে | ওরা আমার ভাইয়ের ব্যবসার কাজে ওকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয় | তখন আমরা বুঝতে পারিনি কি ভয়ানক লালসা রয়েছে এর পেছনে | আমার ছোটভাই যে টাকার জন্য এত নিচে নামতে পারে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি |

ও ওই দুজন লোককে বাড়িতে ডেকেছিল ওর বৌ আর বাচ্চা মেয়েটাকে দেখানোর জন্য | পাঁচ লক্ষ টাকার পরিবর্তে ওই দুজন নারীমাংসলোভী নরখাদকের হাতে নিজের বৌ আর ফুটফুটে মেয়েটাকে তুলে দিতে ও দ্বিতীয় বার ভাবেনি |

নিরীহ অসহায় বউটাকে ভয় দেখিয়ে , হুমকি দিয়ে , প্রচন্ড মারধোর করে প্রতিদিন রাত্রে তুলে দিতো ওই পিশাচদের হাতে | বাচ্চা মেয়েটার কান্না ভেসে আসতো বন্ধ দরজার ওপার থেকে |

আমি আর আমার স্ত্রী অনেকভাবে বাধা দেবার চেষ্টা করি | কিন্তু ওই লোকগুলো ভীষণ নৃশংস ছিল | ওরা আমাকে বলে রেখেছিলো , যদি আমি নিজের মুখ না বন্ধ করে রাখি , তাহলে আমার ছেলে স্কুল থেকে আর বাড়ি ফিরবেনা | ভয়ে আমি নিজের মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিলাম | আর তাছাড়া ওরা আমার ভাইয়ের বৌ আর মেয়ের কিছু অশালীন ফটো আর ভিডিও তুলে রেখেছিলো , যাতে কোনোভাবেই ওদের কুকীর্তি ফাঁস করতে মানুষ ভয় পায় |

নিত্যদিন নতুন নতুন লোক এসে ওই দুজন নিরীহ মানুষের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালাতো | ছিঁড়েকুটে খেতো ওদেরকে | আমার ভাই তখন টাকার নেশায় পাগল | নিত্যদিনের অত্যাচার বেড়েই চলছিল | তারপর এলো সেই দিনটা |

ঐদিন সন্ধ্যেবেলা তিনজন লোক এসে ভাইয়ের ঘরে ঢুকলো | কিন্তু ওর বৌ আর মেয়ে এভাবে আর অত্যাচার সহ্য করতে রাজি নয় | মেয়েকে আড়াল করে রেখে মা ওই লোকগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো | আঁশবঁটি হাতে নিয়ে প্রতিরোধ করতে লাগলো ওদেরকে | কিন্তু ও বেচারি একা আর ওরা ছিল তিনজন | শক্তিতে পারবে কিভাবে !

একজন দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে আমার ভাইয়ের বৌকে জাপ্টে ধরলো , আর ওর হাতটা মচকে দিয়ে বঁটিটা হাত থেকে ফেলে দিলো | তারপর বাকি দুজন মিলে ওর চোখের সামনেই বাচ্চা মেয়েটাকে ধরে অকথ্য অত্যাচার চালালো |

সেই রাত্রেই ভাইয়ের বৌ সব যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মেয়ের গলা টিপে মেরে তারপর নিজেও গলায় দড়ি দেয় ওই ঘরের মধ্যেই |

পুলিশ কেসের ভয়ে আমার ভাই আমার কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করে | আর আমাকে শাসাতেও শুরু করে যে , ' তুই সব অন্যায় এতদিন দেখে সহ্য করেছিস , পুলিশ যদি সেই কথা জানতে পারে , তাহলে তোরও শাস্তি অনিবার্য | ' আমি ভয়ের চোটে ওর প্রস্তাবে সম্মত হই |

ওদের দুজনের শরীরগুলোকে কেরোসিন ঢেলে বেশ খানিকটা পুড়িয়ে দেওয়া হয় |  তারপর আমার ল্যাবরেটরি থেকে ইথার আর ফর্মালডিহাইড নিয়ে গিয়ে ও নিজের বৌ আর মেয়ের মৃত শরীরের ওপরে ভালো করে ঢেলে দেয় | ঐভাবেই বেশ কয়েকদিন ধরে ওষুধ আর সল্যুশন দিয়ে ওদের মৃতদেহ গুলোকে রেখে দেওয়া হয় |

তারপর একদিন সুযোগ বুঝে নিশুতি রাতে আমরা গাড়ি করে ওদের বডিগুলোকে নিয়ে গিয়ে জলা জমিতে পুঁতে রেখে আসি | তার দু - তিন দিনের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারি বাড়িতে কিছু একটা অশুভ ঘটতে চলেছে |

প্রতি রাত্রে কান্নার আওয়াজ আর পচা গন্ধে আমাদের তখন পাগল হবার জোগাড় | একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ভাইয়ের ঠান্ডা শরীরটা পড়ে আছে উঠোনের ঠিক মাঝখানে | চোখদুটো ভয়ে বিস্ফারিত , মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে |

ডাক্তারকে কল করতে বললো , ম্যাসিভ হার্ট এটাক হয়ে রাত দুটো নাগাদ মারা গিয়ে থাকবে | আমার বুঝতে বাকি রইলোনা যে কিজন্য ভয়ে ওর হার্ট এটাক করেছে |

আমি তখনি তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্যকে আমার বাড়িতে আহ্বান জানাই | সব কথা শুনে উনি আমার কাপুরুষতার জন্য প্রচন্ড রেগে ওঠেন | তবুও আমি ওনার হাতে পায়ে ধরে আমার পরিবারকে বাঁচাতে ওই দুজনের আত্মাকে বন্দি বানানোর অনুরোধ করলাম |

উনি দয়াপরবশতঃ আমার কথায় রাজি হলেন এবং মা ও মেয়ের আত্মাকে পিতলের ঘটে বন্দি করে আমাদের গ্রামের বাড়ির এক বিশাল অশ্বত্থ গাছের নিচে তিন হাত মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেবার ব্যবস্থা করেন |

কিন্তু তার পর থেকে রোজ রাত্রে আমি দুঃস্বপ্ন দেখতাম | রোজ আমাকে ওদের অতৃপ্ত আত্মা ভয় দেখাতো , যদি ওদেরকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত না করি তাহলে আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দেবে ওরা |

আমি বাধ্য হই ওদেরকে তান্ত্রিকের দেওয়া বন্দিদশার হাত থেকে মুক্ত করতে | ওরা কোনোদিন আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করেনি |

কিন্তু বহিরাগত কোনো পুরুষমানুষ দেখলে ওদের ভেতরের জিঘাংসা ফুটে ওঠে | আর তার ফলেই আপনার ছেলেকে এতো কষ্ট পেতে হলো |

আমাকে আমার অপারগতার জন্য ক্ষমা করে দিন | আপনি ক্ষমা না করলে আমি নিজেকে পুলিশের হাতে তুলে দেবো |

পরাশর বাবু : আচ্ছা , আপনাদের বাড়ি থেকে যে হটাৎ আপনার ভাইয়ের বৌ আর মেয়ে উধাও হয়ে গেলো , তারজন্য প্রতিবেশী বা ভাইয়ের শশুরবাড়ি থেকে কেউ কোনো খোঁজ করেনি ?

প্রীতমবাবু : আমার ভাইয়ের বৌ অনাথা , অসহায় মহিলা ছিলেন , তাই ওর বাপেরবাড়ি বলে কিছুই ছিলোনা | সেই জন্যেই হয়তো আমার ভাই এতটা নির্ভয়ে এইসব পাপ কাজ করতে পেরেছে |

প্রতিবেশীরা প্রথম প্রথম খোঁজ খবর নিতো , আমরা বলেছি ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ওদেরকে আমার ভাই বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে | কিছুদিন পর থেকে সকলের স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে ওরা হারিয়ে গেলো |

পরাশর বাবু : আপনাকে আমি ক্ষমা করতে পারি , কিন্তু আপনি কি নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারবেন ? সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে মরবেন , কারণ আমরা সবাই জানি কবিগুরুর লেখা সেই প্রবাদবাক্যটি কত সত্যি , অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তবে ঘৃণা তারে যেস তৃণসম দহে | আপনি এখন আসতে পারেন |

প্রীতমবাবু আজ সত্যিই খুব অনুতপ্ত | পরাশরবাবুর ক্ষমা করাটা ওনার অন্তরাত্মাকে পাপের গ্লানিতে আরো কলঙ্কিত করে তুললো | 
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

.............. সমাপ্ত ..............







১৬টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লিখেছো গল্পটি। পড়ে খুব ভালো লাগলো। 👌👌👌👌👌

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লিখেছো গল্পটি। পড়ে খুব ভালো লাগলো। 👌👌👌👌👌

    উত্তরমুছুন
  3. দারুণ! চমৎকার। 👌🤎💫💫💥💥💯💯

    উত্তরমুছুন
  4. বাহ্@চমৎকার। ধন্যবাদ। 👌💫💫💥💥💯💯

    উত্তরমুছুন
  5. খুব ভালো হয়েছে। একটা টান টান উত্তেজনা আছে ।

    উত্তরমুছুন
  6. গল্পের প্লট খুব মজবুত।শিহরণ জাগানো অনুভূতির সঙ্গে একটা যন্ত্রণাদায়ক সমাপ্তি।খুব ভাল

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...