সৌগত মুখোপাধ্যায়
"মা আমরা সরকার বাড়ির পুজো দেখতে যাবো নি।এবার জানতো কেয়া বলছিলো ওর দাদু বলেছে ওখানে শহর থেকে পুতুল নাচ হবে।যাত্রা হবে।সারাদিন অনেক ভালো ভালো খাওয়া হবে।মা আমরা যাবো নি"কেকার কথায় সার্বানীর বুকটা কেঁপে উঠলো।আজ আট বছর ধরে এই দিনটার আতঙ্কে সার্বানি ত্রস্ত থাকে।কমলপুর গ্রামে এই একটাই পুজো সরকার বাড়ির পুজো।এখানে একচালার দুর্গা অষ্টমীর দিন থেকে পুজো শুরু হয়।সেই কবে জমিদার শঙ্কর সরকার। সপ্নাদেশ পেয়ে এই গ্রামে প্রথম দুর্গা পুজো শুরু করেন।জমিদার শঙ্কর সরকার ওই দিন কটা প্রজাদের ঘড়ে চুলা জ্বালাতে দিতেন না।অষ্টমী থেকে দশমীর সিদ্দি খাওয়া অব্দি সমস্ত টাই হতো জমিদার বাড়িতে।মস্ত সামিয়ানার তলায় এই তিন দিন গ্রামের চাষা ভূষ, দিন দারিদ্র সমস্ত কাজ ভুলে ,উমার বাপেরবাড়ি আসার আনন্দে মেতে উঠতো।
সেই জমিদারি প্রথা স্বাধীনতার পড়ে উঠে গেলেও সরকার বাড়ির পুজো আজ হয়।তিনদিন না হলেও অষ্টমীর দিন আজো সারা গ্রাম ভেঙে পড়ে সরকার বাড়ির সামনের মাঠে,চলে মায়ের প্রসাদ খাওয়া,যাত্রা,নাটক দেখা।বর্তমানে সরকার বাড়ির প্রধান মানে দীপেন সরকার রাশভারী মানুষ,পেশায় উকিল,ওনার স্ত্রী কমলাদেবী পাশের গ্রামের ডাক্তার হিরেন বাবুর মেয়ে।ওদের একমাত্র সন্তান তাপস গত আটবছরের উপর ঘড় ছাড়া।কমলাদেবী প্রতিবছর মায়ের ১০৮ প্রদীপ জ্বালানোর সময় মায়ের কাছে প্রার্থনা করে তার ছেলে যেনো তার কোলে ফিরে আসে।স্বজল চোখে দেউড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে যদি সে আসে।দশমী শেষ হয়ে যায়।বাড়ির ঝাড় বাতি গুলো নেভার সাথে সাথে কমলা দেবীর আশার আলোটা আবার একবছরের জন্য অপেক্ষার অন্ধকারে ঢেকে যায়।
"বলো না মা আমরা কখন যাবো সরকার বাড়ির পুজো দেখতে"
সার্বানি বলে"এইতো মা যাবো খোন ,আজ আমরা দিলু চাচার নাওয়ে চড়ে ,ওই পচ্চিম দিগন্তের ঝিলটায় যাবো।কতো মাছ খালু তে ভরে লিয়ে আসবো।তারপর মা বিটিতে মিলে আচ্ছা করে লঙ্কা দিয়ে ঝাল বানাবো।"
না আমি ঝিলে যাবো নি,আমি মাছ খাবো নি।আমি সরকার বাড়ির পুজোয় যাবো।কোনোদিন তুমি আমায় নিয়ে যাও নি ,এবার আমায় নিয়ে যেতেই হবে---কেকা বায়না জোরে।
প্রতিবছর সার্বানি এই অষ্টমীর দিন মেয়ের চোখে জল দেখে।মায়ের মন বুকটা হুঁ হুঁ করে ওঠে,ওকে বোঝাতে পারে না সরকার বাড়ির পুজোয় ওদের যাওয়া নিষেধ।প্রত্যচ মেয়েটাকে বুঝিয়ে না পেরে এই পুজোর দিন ঘা কতক দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখে।কতবার ভাবে পুজোর দিন কোথাও মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে ।কিন্তু কোথায় যাবে তার যাবার জায়গা কোথাও নেই।যাঁরা আপনজন তারা আর কেউ নেই।গরিব দিলু চাচা ছাড়া এ পৃথিবীতে সে আর তার মেয়ে একা
সরকার বাড়ির নহবতের সুর ভেসে আসছে।কেকা আরো বেশি চঞ্চল হয়ে উঠছে,সার্বানি আজ কিছুতেই কেকা কে সামলাতে পারছে না।চুলার গরম কাঠ নিয়ে তেড়ে যায় কেকার দিকে।দিলু চাচা হা হা করে ছুটে আসে করো কি করো কি,আমার উমা মায়ের চোখে জল।কেকা কে কোলে তুলে নেয় ।লিছয় যাবে বেটি, আমি তোমায় লিয়ে যাবো।
সার্বানি বলে ওঠে"কি বলছো চাচা তুমি ওখানে ওকে নিয়ে যাবে,তুমিকি পাগল হয়েছো"
দিলু চাচা বলে ওঠে"হয়েছি আমি পাগল হইছি বটে।আমি প্রতিবছর আমার উমা মায়ের চোখের জল দেখতে পারবো নি।আমি দিলবার মহম্মদ চুরি ডাকাতি করে অনেক মার খেয়েছি আমার কষ্ট হয় লাই।কিন্তু ও সব ছেড়ে দিছি বটে।কিন্তু উমা মায়ের কান্না আমি সইতে লারি।তু ওকে ঈদের দেওয়া নতুন জামাটা পড়ায় দে।আমি ওরে লিয়ে যাবো।
কেকা আনন্দে দু চোখ মুছে দিলু চাচার গলাটা ছোটো ছোটো হাতে জড়িয়ে বলে"সত্যি কৈছো নানা তুমি লিয়ে যাবে" ছোট্ট প্রাণটার যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না তাকে নিয়ে যাবে।
"হ রে বিটি হ তোরে আমি লিয়ে যাবো অহনী।আল্লাহ কসম।" দিলু অভয় দেয়।
কেকা একছুট দিয়ে ঘরে ঢুকে তার জামা নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসে।
দিলু চাচার কাঁধে চড়ে কেকা তারা দেয় ও নানা চলো না।সার্বানীর বুক কেঁপে ওঠে আবার কি অঘটন ঘটতে চলেছে ওই আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে ওঠে ।সে হাতজোড় করে বলে"দিলু চাচা গো ওরে তুমি অকানে লিয়ে জেওনি গো, তুমি তো জানো চাচা ও ছাড়া এ জগতে আমার আর কেউ নাই গো।"
দিলু চাচা অভয় দেয়"কিছু চিন্তা লয় বিটিয়া,ই তোর চাচা বাঁচি থায়কতে মুর মা ডারে হাথ লাইগতে দিবেক না।আল্লাহ কসম খুন পি যাবে তোর ই চাচা।ইকিদম চিন্তা লয়।আমার উমারে ওর ইতোদিনের সব ইচ্ছা আমি পূরণ করবো।"
কেকা দিলু চাচার কাঁধে চড়ে চলে যায়।সার্বানি দূর দূর আল যত দূর দেখা যায় সেদিকে তাকিয়ে থাকে।বুকের ভিতরে ভয় টা এখন যেন গলার কাছ অব্দি উঠে আসছে।কিন্ত আজ থেকে কিছু বছর আগে ওই সরকার বাড়ির পুজোর দিন গুনত কিশোরী সার্বানি।বাবা সরকার বাড়ির মালি ছিলো।সরকার বাড়ির বাগানের পাশে একটা ছোটো ঘড়ে মা বাবার সঙ্গে ছোট্ট সার্বানি বড়ো হচ্ছিলো।ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে বাগানে ছুটে গিয়ে পুজোর ফুল তুলতো।বরোমা সকাল বেলা পুজোয় বসত।কি সুন্দরী দেখতে বরোমা,সদ্য স্নান করে এলচুলে যখন পুজোয় বসত,দোরে বসে সার্বানি অপলক দৃষ্টিতে দেখতো।বড়বাবু কে ভীষণ ভয় লাগতো,কিন্তু বরোমা খুব ভালো ছিলো।সার্বানি কে খুব ভালোবাসত।কত ভালো ভালো কথা বলতো।বলতো তোর চোখ দুটো ঠিক মা দুর্গার মতো।তুই বোরো মিষ্টি মেয়ে।ছোট দাদাবাবু কলকাতায় হোস্টেলে থাকত পড়াশোনা করতো।ছুটিতে যখন বাড়ি আসতো সার্বানীর সঙ্গে কতো খেলতো।দিলু চাচা যেদিন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বরবাবুর হাতে পায়ে ধরে গ্রামে থাকতে দেবার অনুরোধ করছিলো।সেইসময় বড়ো বাবু কিছুতেই রাজী হচ্ছিলো না সেই সময় ছোট দাদাবাবু বড়ো বাবুর কাছে বায়না করে সেবারে দিলু চাচা কে গেরামে থাকার অনুমতি আদায় করে নেয়।তারপর কতো দিন দিলু চাচার ডিঙি চেপে ওরা কানা নদীতে মাছ ধরা দেখতে যেত।মহালয়ের দিন সকালে ছোড় দা গ্রামে চলে আসত।খুব আনন্দে কাটাতো।পুজোর শেষ ছোড় দা যখন ফিরে যেতো সার্বানীর খুব কষ্ট হতো।বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতো।
শৈশব ছেড়ে যেদিন কিশোরী হলো সার্বানি,ছোঁয়া ছুঁইর পাঁচদিন যখন প্রতিদিনের ফুল তোলায়, ঠাকুর ঘরে যাওয়ার বাধা এলো।তারপর থেকে ছোড় দা কে দেখে কিসের একটা সংকোচ তাকে ঘিরে ধরলো।এখন আর আগের মতো খেলতে পারেনা, ছোড় দা হাত ধরলে শরীরে কিরকম শির শির করে।স্বাস প্রশ্বাস অনিয়মিত হতে থাকে।সার্বানি বুঝতে পারে সে আর আগের মতো নেই।ছোড় দা বাবুর চোখের ভাষাও যেনো কিরকম পাল্টে গেছে।কি যেনো বলতে চায় কি যেনো খুঁজে বেড়ায়।
সেদিন আড়াল থেকে যখন মা আর বড়মার কথা শুনেছিল,সেদিন লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল।বড়মা শহর থেকে সেবার পুজোর আগে সবার জন্য নতুন পোশাক আনতো, সার্বানি কে আগে ডেকে তারজন্য আনা নতুন পোশাকটি তার হাতে তুলে দিত।সেবার মাকে ডেকে নতুন পোশাক তুলে দেবার সময় ওরা যে কথা বলছিল সার্বানি আড়াল থেকে সব শুনেছিল।বরোমা বলছিলেন।
"বলি ও সর্বর মা মেয়ে তো এবার বড়ো হচ্ছে,পাটোর টাতোর দেখছো নি,বলি বীজ বুনবে নাকি,দেখো ভালমানুসের ঝি,সর্ব আমারও মেয়ে বই অন্য কিছু লয়।ট্যাকা পয়সার কথা চিন্তা করবে না,খোকার বাপ কে বলে ওটা আমরাই করে দিবো খনি"।
সার্বানীর মা সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে পানের বাটায় পান সাজতে থাকে।
বরোমা নতুন কাপড়ের প্যাকেট খুলে ওর বাপের জন্য ধুতি,ফতুয়া,মায়ের জন্য শাড়ি বার করে,সার্বানি অধীর আগ্রহে খুঁজতে থাকে তার জন্য কি এনেছে।সবশেষ একটা লাল ডুরে কাপড় ,সায়া,ব্লাউজ ওর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে এটা আমার সর্বর জন্য।সার্বানি আশা হতো হয় তাহলে এবারের পুজোয় তার ফুলঝুরি করা ফ্রক পড়া হবে না।চমক ভাঙে বরোমা যখন দুটো ছোটো প্যাকেট ওর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে এটা ভিতরের জামা ।এবার থেকে প্রতি পড়তে বলবে।বড়ো হয়েছে দৌড় ঝাঁপ কম করতে বলবে।ছেলে ছোকরার নজর ভালো নয়------ বাকি কথা আর শোনা হয়নি।লজ্জায় লাল হয়ে ঘড়ে চলে এসেছিল।
আজকাল সার্বানি ঘড় থেকে কম বেরোয়।তাপসের ফাইনাল ইয়ার সামনে তাই এবারের পুজোতে বেশিদিন থাকতে পারবে না।বাড়ি এসে সার্বানীর খোঁজ করে।দুদিন হলো সে এসেছে সার্বানি একদিন তার সঙ্গে দেখা করলো না কেনো।তাপস ওদের বাড়ী যায় ওর খোঁজে।সার্বানীর বাবা তখন কাজে,মাও বড়ো বাড়ির রান্না সামলাতে ব্যাস্ত।কাল রাত থেকে সার্বানীর জ্বর সে একাই বিছানায় শুয়ে ছিলো।তাপস ঘড়ে ঢোকে "সর্ব কি হয়েছে তোর ,আমি এসেছি তুই একবার দেখা করতে এলিনা যে"
সার্বানি ধড়পড় করে উঠে বসতে চায় পারেনা
ছোড় দা তুমি এসেছ।
তাপস হা হা করে ওঠে"সামলে সামলেকি হয়েছে তোর(হাতটা ধরে নেয়)একিরে তোর গা তো পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, ওষুধ খেয়েছিস ,ডাক্তার দেখিয়েছিস।"
সার্বানি বলে ওঠে ব্যাস্ত হয়ো না ছোড় দা ও কিছু না,একটু পরেই ছেড়ে যাবে।তুমি আমাদের বাড়ি এলে।দাঁড়াও একটু চা করে আনি।
তাপস বলে ওঠে থাক তোকে আর চা আনতে হবে না চুপটি করে শুয়ে থাক।আর ছোড় দা ছোড় দা করিস কেনো আমার কি কোনো নাম নেই।
সার্বানি বলে ওমা তুমি ছোড় দা ,ছোড় দা কে আর কি বলে ডাকবো।
তাপস:কেনো তুই আমার নাম ধরে ডাকতে পারিস না।তাপস ওর হাত ধরে।
সার্বানীর সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে,বুকের ভিতর সহস্র হাতুড়ি পিটতে থাকে,কুল কুল করে ঘামতে থাকে।জড়ানো কণ্ঠস্বরে বলে ওঠে না ছোড় দা আমি ডাকতে পারিনা,আমায় ডাকতে নেই।
তাপস আরো নিবিড় হতে চায়।সার্বানীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে"সর্ব আমি তোকে ভালোবাসি,তুই কি আমায় ভালোবাসিস না
----তাপসের আলিঙ্গন আরো দৃঢ় হতে থাকে।সার্বানীর শরীরের সমস্ত বাঁধন ছেড়ে যেতে থাকে। তাপস দু হাতে ওর দুটি গাল ধরে কাছে আরো কাছে আসতে চায়,ওর গরম নিঃস্বাস সার্বানীর সাড়া শরীরে আগ্নেয়গিরির গরম লাভের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।অস্ফুট স্বরে বলে এটা হয়না ছোড় দা আমি তোমার যোগ্য নই, আমরা তোমাদের আশ্রিত ,আমরা গরিব।
"সর্ব মা সর্ব ,এখনো উঠিস নাই মা"বাইরে বাবার কণ্ঠস্বরে সার্বানি চমকে ওঠে,তাপস খনিকে সার্বানি কে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।সার্বানি বাবাকে বলে"হ বাবা উঠশি, ই দেখো বাবা কে আসিছে আমাদের বাড়ি।
সার্বানীর বাবা ঘরে ঢুকে একমুখ হাসি নিয়ে বলে"আরে ছোটো কত্তা যে বড়ো, কি সৌভাগ্য আমার।হ্যাঁ রে মা কত্তারে খারায় রাকচ,বসতে কও নাই।'সসবাস্ত হয়ে একটা কুশন ঝেড়ে তাপস কে বলে"বসেন কত্তা" তাপস বলে"কাকা তুমি আমায় কত্তা বলবে না।তুমি আমায় কোলে পিঠে করে বড়ো করেছ,তুমি আমার বাবার থেকে কম নয়।সবার মতো তুমি আমায় তপু বলে ডাকবে।আজ আমি বসবো না,সর্বর খবর নিতে এসেছিলাম ,আবার পরে আসবো।সর্ব ভালভাবে থাকিস,আর আমি যেটা বললাম ওটা ভেবে দেখিস।তোর কোনো না আমি শুনবো না।"
তাপস চলে গেছে অনেক্ষন দুটো গালে এখনো তার পরশ সার্বানি এখন অনুভব করছে।সেই অনুভুতির রেশ শরীরের প্রতিটি রোম কূপ এখনো বহন করে চলেছে।সার্বানি আজ কাল আর বাড়িথেকে খুব একটা বেরোয় না ,তাপস তারপরেও দু তিনবার এসেছিলো।সার্বানি ওকে ফেরাতে পারেনি।ছেলেবেলার খেলার সাথী কখন যে তার কুমারী মনটাকে জয় করে নিয়েছিলো ও বুঝতে পারে নি।তাপস শহরে চলে যাবার দিন ও সজল চোখে ওকে বিদায় দিলেও ,বিছানায় বালিশ চাপা দিয়ে অশ্রু প্লাবনে ভেসে গিয়াছিল।দুটো চোখ সর্বদা রাস্তার দিকে তৃষিত দৃষ্টিতে অপেক্ষা করতো কবে সেখানে দেখা দেবে তাপসের ফেলে যাওয়া সেই হাঁসি মুখ।একেই কি বলে ভালোবাসা।
তাপস পড়া শেষ করে পাকা পাকি ভাবে গ্রামে ফিরে আসে।সার্বানীর মনে শরতের শিউলির সুগন্ধে ভোরে ওঠে।ওরা এখন ও ঘুরে বেড়ায় ছেলেবেলার মতো,তবে ছেলেবেলা পিছনে ফেলে এক সংকোচ ভয় পেয়ে হারানোর অনিশ্চয়তার পথে।মা সেদিন হাত ই ওকে বলেবসল যখন তখন ছোট কত্তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর বয়েস তার নেই ।সে বড়ো হয়েছে ,গ্রামের লোকজন আড়াল আবডালে কু কথা বলছে।বড়মার কানে গেলে ভালো লাগবে না। সার্বানি প্রতিবাদ করে না,নিজের ঘড়ে ঢুকে চোখের জলে নিজেকে শান্ত করে।
ভাগ্য সর্বদাই অশনি সংকেত শোনাতে থাকে।যা ঘটার ছিলোনা হয়তোবা ছিলো তাই ঘটে গেলো।বড়মার মায়ের শরীর খারাপের খবর পেয়ে,চঞ্চল বরোমাকে নিয়ে ছোড় দা তার মামার বাড়ি যাবার উদ্যোগ করলো,বরোমা সার্বানিকে সঙ্গে যেতে বললো।মামার বাড়িতে দুদিন যমে মানুষে টানা টানির পর একটু সুস্থ হতে বড়মা সার্বানি কে ডেকে বললো"মারে এই ছোট্ট শরীরে এই কদিন তোর ভারী ধকল গেলো।আমি ভাবছি আর দুদিন থেকে তারপর ফিরবো।তপু কে বলছি তোকে নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে।তোরা গ্রামে ফিরে যা।তোর মা ওদিকে তোর বড়ো বাবু একা রয়েছেন।"সার্বানি সম্মতি সূচক ঘাড় নারে।মনে মনে প্রফুল্ল হয় এই ঘন্টা তিনেকের পথ ছোড় দা বাবুর সাথে একসঙ্গে থাকা যাবে।দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর ওরা বেরোলো।আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ আকাশে আলো ছায়ার খেলা।বরোমা একটু পা চালিয়ে যেতে বলে দিল।ক্রোশ দুয়েকের মেঠো পথ।ছোড় দা অভয় দেয়,তুমি কোনো চিন্তা কোরোনা আমরা পৌঁছে যাবো।সবুজ ধানে রোযা মেঠো পথ ,দুপাশে বর্ষার জমা জলে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, মাঝে মাঝে ব্যাঙের ডাক।দুই প্রেমী হৃদয় কাছে থেকে আরো কাছে আসতে চায়।তাপস সার্বানীর হাত ধরে দুজনের মুখে ভাষা নেই কিন্তু হৃদয়ের জমা অনেক কথা একসাথে বেরিয়ে আসতে চায়।তাপস শুরু করে দুটি শৈশব মিশে যেতে থাকে কৈশোরের মোহনায়।
হঠাৎ আকাশ কালো করে আসে বৃষ্টির ফোঁটা ,শুরু হয় দামাল হওয়া বুড়ো বটের তলায় ওরা আশ্রয় নেয়।অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে দুজনেই ভিজতে থাকে।আসে পাশে মাথা গোঁজার জায়গা দেখা যাচ্ছে না।কিছুদূর একটা পোড়ো মন্দির ,পাশেই আটচালা প্রায় ভগ্ন প্রায়।বৃষ্টির তান্ডব থেকে বাঁচতে ওরা সেদিকে দৌড়োয়।আজ যেনো প্রলয় শুরু হয়েছে,সব বাঁধন ভেঙে প্রকৃত মুক্ত আকাশের নিচে নর্তকীর বেশে।
ওরা যখন আটচালায় পৌঁছুল দুজনে আপদ মস্তক ভিজে গেছে সন্ধ্যা আগত প্রায়।ভিজে কাপড় আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরেছে ষোড়শী সার্বানীর অঙ্গ লতা।সেই আলো আঁধারীতে তাপসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ইলোরা সুন্দরী কিংবা মেনকা,বা এরই নাম রতি।সার্বানি দুহাতে কি ভাবে আগলে রাখবে নিজেকে,তাপসের সুদূর প্রসারী দৃষ্টির মাঝে অসহায় তার সমস্ত লজ্জা।গভীর থেকে গভীর আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতে থাকে সার্বানি।অঝোর প্লাবনে প্লাবিত হতে থাকে ষোড়শী তনু।বিদ্যুৎ তের ঝলকানি আকাশে শরীরে বয়ে যেতে থাকে তার উত্তাপ।
শান্ত হয় বাইরের তুফান,বাঁধ ভাঙে সার্বানীর চোখে।।এ কি হয়ে গেলো ছোড় দা আমার তো আর বাঁচার উপায় রোইলনা।তাপস ভালোবাসার আলিঙ্গনে ওকে বুকে টেনে নেয় ।গভীর ভালোবাসায় মাথায় হাত বুলিয়ে বলে"এখন তুই আর এক নয় ,আমরা দুজন একসঙ্গে বাঁচব,একসাথে স্বপ্ন দেখবো,আমরা ঘড় বাঁধবো, আজ এই আকাশ বাতাস আর এই মন্দিরের দেবী সাক্ষী করে তোকে আমি আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে সঙ্গী করলাম"।মন্দিরের ঘটের লাল সিঁদুরের তিলক সার্বানীর কপালে তুলে দিয়ে আলিঙ্গনে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিলো কিশোরী সার্বানীর তনু মন।এক বাল্য ভালোবাসা পরিণতি পেলো জীবন পথের পথিক হয়ে।
----সেদিন সার্বানীদের বাড়ী ফিরতে অনেক রাত হয়েছিল।যে রাত আর কোনোদিন ভোরের আলো দেখলো না।তাপস ওকে বলেছিলো গ্রাম ওদের মেনে না নিলে ওকে নিয়ে সে শহরে চলে যাবে।শহুরে মানুষের মাঝে ওদের ভালোবাসার ঘড় বাঁধবে।সেইমত তাপস শহরে কাজ নেবার মনস্থির করে।সার্বানিকে পুজোয় আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাপস শহরে চলে যায়।সার্বানীর সাড়া শরীরে তাপসের ছোঁয়া অনুভূত হতে থাকে।লজ্জা ভয় সংকোচ তাকে গৃহবন্দি করে ফেলে।আগের মতো আর সবকিছু ভালো লাগে না।দিনে দিনে চোখের কোলে কালি পড়তে থাকে।মা তাকে প্রশ্ন করেছিল কি হয়েছে জানতে সে এড়িয়ে গিয়েছিল।বরোমাও প্রশ্ন করেছিলেন সে এতো শুকিয়ে যাচ্ছে কেনো।সেখানেও সে মিষ্টি হেঁসে কাটিয়ে দিয়েছিল।এইরকম ভাবে মাসখানেক কেটে যায়।শরতের মেঘ মুক্ত আকাশে সূর্যের হাসিমুখ দেখা দিয়েছে।কিন্তু সার্বানীর মুখে কালো আঁধার নেমে এসেছিলো, ঋতুমতীর দিন পেরিয়ে গেছে।তবে কি কি হবে,যা ভাবছে তাই যদি হয় এ মুখ কি করে দেখাবে, আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ তার কাছে খোলা থাকবে না।দিন যায় কম্পিত বুকে সর্বানী এক অশনি সংকেত তার শরীরের ভিতর শুনতে পায়।তার খিদে কমে গেছে ,চোখের ঘুম চলে গেছে,যত দিন গড়াতে থাকে সে অনুভব করতে থাকে ভালোবাসার ছোট বীজ কখন বুক থেকে নেমে বিকশিত হবার প্রচেষ্টায় গর্ভ আঁধারে পথ খুঁজে চলেছে।কবে আসবে তাপস তবে কি শেষ রক্ষা হবে না।
অশ্বিনের আকাশ বাতাস পুলকিত হয়ে উঠেছে আগমনীর সুরে,আনন্দে মেতে উঠেছে ধরণী।হঠাৎ একদিন সব গোপনতা ভঙ্গ হয়ে গেলো সর্বানী বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলো, কবিরাজ এলো।নারি পরীক্ষা হলো,একই নারি তে দুই স্পন্দন নেবে এলো সর্বানী র জীবনে প্রলয়ের মতো।এক অসহ্য যন্ত্রণার মাঝে বাবা মায়ের সামনে পরিচয় দিতে হলো অপরিচিত অথচ একান্ত নিজের আর এক সাত্তার পরিচয়।গরিব মালির ঘড়ে নেবে এলো শ্মশানের স্তব্ধতা,কোথায় যাবে কে বিশ্বাস করবে এই নিষ্ঠুর সত্য টাকে।বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়লো এই সত্য অন্দরমহলে।ডাক পড়লো অভাগীর।শুরু হলো সত্যের উপর কদর্য ইঙ্গিত।দীপেন বাবু দুদে উকিল একলহমায় বুঝে গেলেন বংশ মর্যাদা য় কালি ছিটিয়ে এই গরিবদের অর্থ লালসার উপাখ্যান।শুরু হলো মানুষ কেনা বেচার প্রহসন।কাঠগড়ায় সর্বানী একা আর তার ভুলণ্ঠিত লজ্জা।বাইরে দালানে তখন পটুয়া ব্যাস্ত মাকে কাপড় দিয়ে লজ্জা ঢাকতে,সাজিয়ে তুলতে মাতৃ সাজে।সার্বানীর চোখের জল যখন বুকের রক্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে,তাপস তখন তার নতুন চাকরির খবর নিয়ে ছুটে আসছিল তার সর্বর কাছে।অন্দরমহলে তখন সাজা শোনাবার শেষ পর্ব চোলছিলো, সরকার বাড়ির মর্যাদা হননের দায়ে অভিযুক্ত তিনটে নিরীহ মানুষ।তাপস আগলে ধরলো তাদের।দীপ্ত কন্ঠে স্বীকার করলো সার্বানিকে সে বিয়ে করেছে।সর্বানী আজকের পরিচয় তার পরিচয়।কমলা দেবী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।তার গর্ভ আজ তার সঙ্গে নিজের পরিবারের সন্মান নিয়ে এই মারণ খেলা খেলছে এ তিনি বিশ্বাস করতে পারছে না।দীপেন বাবু ছেলের মুখের কথা শুনে স্থির পাথরের মত হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন"সরকার বাড়ির একটা নিয়ম আছে নিরাপরাধ কখন শাস্তি পায় না।এক্ষেত্রে তাপসের স্বীকারোক্তি সার্বানিকে নির্দোষ প্রমান করেছে।যেহেতু বংশের সুনাম এর সঙ্গে জড়িত তাই আজকের সমস্ত ঘটনা এই অন্দরমহলের মধ্যেই যেনো সীমাবদ্ধ থাকে এটা আমার আদেশ,শম্ভু(সার্বানীর বাবা)তুমি আজকে থেকে যতদিন না পর্যন্ত এর একটা বিহিত হচ্ছে সরকার বাড়ির মালির কাজ করবে না।চিন্তা করবে না তোমাদের খরচ যে রকম সরকার বাড়ী থেকে যাচ্ছিল সেরকমই পাবে।আজ থেকে সরকার বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যে ঘরখানা আছে ওটাতে তোমরা থাকবে।আর মায়ের পুজো,এবং পারিবারিক কালী পুজোর আগে এ বিষয়ে আর কোনো কথা হবে না।যে কদিন তাপস,সর্বানী তোমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা কিংবা কথা বলতে পারবে না" তাপস বলে ওঠে"কিন্তু বাবা"দীপেন বাবু হাত তুলে তাপসকে থামিয়ে বলে"আর কোনো কথা হবে না।শম্ভু নতুন বাড়িতে যাবার জন্য গোচ গাছ শুরু করে দাও,দুঘন্টার মধ্যে তোমাকে এ বাড়ী ছাড়তে হবে।এবার তোমরা সবাই আসতে পারো"
নতুন খড়ের চালের ঘড়ে দুর্গাপূজার সরকার বাড়ির নহবতের সুর সার্বানীর কানে পৌঁছয়,মায়ের বোধন আজ।একা বাড়িতে তিনটে শুকনো মুখ ,পুজোর আনন্দ যাদের কাছে আজ নিরর্থক।সরকার বাড়িতে ওদের যাওয়া নিষেধ।তাপস এসেছিলো লুকিয়ে সার্বানীর সঙ্গে দেখা করতে ,ও সামনের অগ্রান মাসে শহরে একটা ঘড় নিয়ে সর্বানী কে নিয়ে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে বলে গিয়েছে।
নতুন ঠান্ডা পড়ছে লক্ষী পুজোর পর থেকেই শম্ভুর শরীর টা খারাপ।চিন্তা ভাবনা তাকে আঁকড়ে রেখেছে, কি আছে তার কপালে কে জানে।কালিপুজোর দিন সকাল থেকে তার ধুম জ্বর ,বেলা যত বারে শম্ভুর জ্বর তত বারে, সর্বানী আর তার মা জলপটি হওয়া দিয়ে জ্বর নামাতে চেষ্টা করে।কবিরাজ মশাই ওষুধ দিয়ে গেছেন,বলে গেছেন খুব বার বারি হলে পাশের গাঁয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করতে হতে পারে।অমাবস্যার নিশি রাত,রাত তখন দশটা শম্ভুর স্বাস কষ্ট শুরু হয়।সর্বানী মাকে বাবার কাছে থাকতে বলে কবিরাজ মশায়ের বাড়ি দৌড়োয়।কবিরাজ মশায়ের হাতে পায়ে ধরে তার বাবা কে দেখতে যেতে রাজি করায়।কবিরাজ মশাই তার হাতে দুটো বটিকা দিয়ে বলে এখুনি গিয়ে খাইয়ে দিতে,উনি আসছেন ওর পিছনে।সর্বানী ওই মিশ কালো অন্ধকারে আবার দৌড়োয় ওর বাড়ির দিকে।কিছুটা আসার পর ও চমকে ওঠে ও কি অন্ধকারের বুক চিরে লেলিহান আগুনের শিখা, রাতের অন্ধকার খান খান করে দীপাবলির আলোর খেলায় মেতেছে।জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে তাদের ঘড়।আর্ত চিৎকার করে উদ্ভ্রান্তের মতো সর্বানী ছুটে যায় ওদের বাড়ির দিকে।একটা লোমশ বলিস্ট হাত ওকে আঁকড়ে ধরে।মুখের মধ্যে চেপে ধরে একটা গামছা একটা মিষ্টি গন্ধে ঘুমের গভীরে ঢলে পড়ে সর্বানী।
----- "নানু দুর্গা ঠাকুরের দশটা হাত ,তালে ভাতু খায় কোন হাতে।অসুর টা ওতো মোটা কেনো, ওর তুমার মতো দাড়ি লাই কেনো"ছোট্ট কেকা দিলুর কাঁধে চড়ে হাজারো প্রশ্ন করতে করতে সরকার বাড়ির ঠাকুর দেখতে চলে।এই প্রথম ওর সরকার বাড়ির ঠাকুর দেখতে যাওয়া ।এর আগে বন্ধু দের মুখে অনেক শুনেছে,ওখানে খুব মজা হয়,ভালো ভালো খাওয়া হয়।ওদের ঘরে কেবলই ভাত ,নানুর ধরে আনা মাছের ঝোল,আর বাগানের গুটি কতক সব্জি ছাড়া আর কোনো ভালো খাবার ও খাইনি।একবার নানু ঈদের সময় নুচি হালুয়া কুতা থেকে পেয়েছিলো ওর জন্য লিয়ে এসেছিলো।কি সুন্দর খেতে ও সব চেটে পুটে খেয়ে লিয়াছিলো।ও আবার দিলু কে জিজ্ঞাসা করে"নানু ও নানু ওহানে নুচি দেবে।আমার অনেকদিন খেতে ইচ্ছা করে" দিলু বলে"হ রে মা ,ওহানে নুচি হবে,মন্ডা হবেক, পুলাউ হবে,কত্ত কি হবেক,দিখবি খন"।কেকা বলে"উড়া এট্টু আনতে দিবে তো,মাটার জন্য লিয়ে যাবো হ,আর এট্টু কাল বাসী খাবো হ"।
"হ রে মা উরা দিবেক বটে।লিয়ে আসবো তোর মায়ের লগে"দিলু জোর পা চালায় ,ঢাকের শব্দ একটু একটু করে জোরালো হয়।
সরকার বাড়ি সেজে উঠেছে মায়ের আগমনে,গ্রামের চাষা ভূষ সম্প্রদায় তাদের ছেলেপুলে নিয়ে বড়ো মাঠের সামিয়ানার তলায় জমা হতে থাকে।প্রধান মন্দিরে সকাল থেকে স্নান করে কমলা ঠাকুরের জোগারে বাস্ত,সঙ্গে দাসী মানদা হাতে হাতে এগিয়ে দিচ্ছে।মায়ের ১০৮ সাজ,১০৮পদ্ম সব গুছিয়ে রাখতে হচ্ছে।পাশেই আরাম কেদারায় শুয়ে দীপেন বাবু।এই এত বছরে সরকার বাড়িতে অনেক কিছু ঘটে গেছে।বছর পাঁচেক আগে দীপেন বাবুর স্ট্রোক হয়েছিলো,শরীরের একদিকটা পরে গেছে,মুখের ভাষা হারিয়েছেন।নির্বাক অসহায়ের ,কমলার মত দেউড়ি দরজার পানে চেয়ে থাকেন।নির্লিপ্ত দৃষ্টি কাকে যেনো খুঁজে ফেরে।কমলা পদ্ম ফোটাতে ফোটাতে আঁচলের খুটয় চোখ মোছে এবছর ও সে এলোনা,মায়ের দিকে চেয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন মনে মনে করে।আর কত শাস্তি বাকি আছে মা,ছেলে নেই ,স্বামী থেকেও নেই,আমার কি দোষ ছিলো মা কি অপরাধের শাস্তি দিচ্ছ।মনে পরেযায় আজথেকে আটবছরের আগে কালী পুজোর দুদিন আগের ঘটনা ,সেদিন ঠাকুর ঘরে যাবার সময় বাইরের ঘরে কত্তার ফিস ফিস করে বলা সেই কথা গুলো কাজ ঠিক মতো শেষ করতে পারলে আরো দু হাজার নগদ পাবি।আর মনে রাখিস কথাটা যেনো পাঁচ কান না হয়।কমলা ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারেনি কত্তা মারণ খেলায় মেতেছেন।তাপসের কাজে তিনি অখুশি ছিলেন ঠিকই কিন্তু এই মারণ যজ্ঞ তিনি তো কল্পনাও করেন নি।সেই ভয়ানক কালী পুজোর রাত আজো তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।পরদিন থানার বড় দারোগা এসেছিলো, ভস্মের মধ্যেথেকে কিছু মাংসের দলা হাড় নিয়ে পঞ্চনামা করে,কত্তার সঙ্গে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে চলে যায়।বিকালে তাপস আসে পোড়া বাড়ির সামনে অনেক্ষন বসে থাকে।কমলা তাকে বুঝিয়ে ঘরে আনতে গিয়েছিল, সে আসে নি শুধু শেষ কথা একটাই বলেছিলো"মা ওদের মেরে ফেলা হলো কেনো, ওরা তো কোনো দোষ করে নি।আমিতো সর্ব কে গ্রাম থেকে নিয়ে চলে যেতাম।তোমাদের বংশ মর্যাদায় আঁচ লাগতে দিতাম না।তবে কেনো মা কেনো এত বড় শাস্তি পেতে হলো"সে রাতের পর তাপস কে আর কেউ দেখেনি।দীপেন বাবু শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলে কিন্তু তাপস কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল, আর তাকে কেউ খুঁজে পায়নি।
কমলা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে কান্না চাপতে চায়।মানদা বলে"মাগো আজকের দিনে কাঁদতে নাইগ মা ঠাউরুন মার কাছে পরান ভরে ভিককা চাও,মা লিসচয় তোমার ব্যাটারে ফিরায় দেবে।"
দিলু যখন সরকার বাড়ির সামনে পৌঁছল তখন সেখানে গ্রামের অনেক লোক এসে গেছে।দিলু নিজের মুখটা আগেই ভালো করে গামছা দিয়ে মুড়ে নিয়েছিলো।যদিও সে মুখে দাঁড়ির জঙ্গলে তাকে চেনা দায়।তবুও চোখের তলার কাটা দাগটা অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে।দেউড়ির সামনে থেকে কিছুটা দূরে ঠাকুর দালান এখানে সবার প্রবেশ নিষেধ।তাই কাঁধের উপর থেকে যতটা সম্ভব উঁচু করে দিলু কেকা কে মার দর্শন করবার চেষ্টা করে।ছোট্ট কেকা ভালো করে দেখতে পায় না।জীবনের প্রথম সরকার বাড়ির ঠাকুর দর্শন তাও অধরা থেকে যায়।ওদিকে মাঠে জলখাবারের পাত পড়ছে।দিলু কেকা কে সেখানে নিয়ে যায়।কেকা জিদ ধরে সে কিছুতেই খাবে না যতক্ষণ না ভালো করে ঠাকুর দেখতে পাবে।দিলু অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করে।তার সব চেষ্টা ছোট্ট কেকার কাছে বিফলে যায়।এখন কি করে।সামনের দেউড়ি দিয়ে ঢোকা অসম্ভব সেখানে পাহারা আছে।আর একটা পথ সে চেনে কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে ওটা সরা সরি ঠাকুরদালানে উঠে গেছে,ওটা মায়ের ভোগ নিয়ে আসার পথ, পুজোর আগে যদিও সেখান দিয়ে কেউ যাতায়াত করে না।কিন্ত তবুও যদি কেউ এসে পড়ে।দোটানা মনকে শান্ত করে দিলু কেকা কে বলে"ঠিক আসে তোরে মার দর্শন করবো,কিন্তু কথা দে একটিবার দেখেই পলায় আসবি"কেকা সায় দেয় দিলু আবার বলে খবরদার ঠাউরু দূর থেকে লুকায় লুকায় দেখ বা,সামনে যাবা না কিন্তু।তোমার মারে আমি কথা দিসি তোমায় সুস্থ ঘরে ফিরায় দেব।কেকা ঠাকুর দেখার আনন্দে সবে তে সায় দেয়।
"মানদা আর একবার ভালো করে দেখে নে মা,মায়ের পুজোর আয়োজনে কোনো ত্রুটি নাইত।পুরুত আসার আগে একবার সব ভালো করে দেখে নে"কমলা মানদা কে কথা গুলো বলে দীপেনের দিকে যায়,দীপেনের হাতটা ধরে বলে"আর একটু দৈর্য ধরো পুরুত এলো বলে,মায়ের অঞ্জলি টা দিয়ে কিছু খেয়ে নেবে"দীপেন কিছু বলতে পারে না ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।শুধু কোটরে ঢুকে থাকা দুটো চোখ চিকচিক করে ওঠে জলে।
কেকা সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে অবিচল হয়ে দেখতে থাকে মা দুগ্গা কে,কি সুন্দর দেখতে ঠিক তার মায়ের মতো মুখের হাঁসিটা,কত গয়না পরে আছে মা।এত ভালো করে সে এর আগে কখনো দুগ্গা ঠাউরু দেখেনি।মন্ত্র মুগ্ধের মত পায়ে পায়ে সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকে মাকে আরো কাছ থেকে দেখবে।
"মানদা এই মানদা বাউন বাড়ি কে গেছে এবারে কুমারী পুজোর কুমারী এখন এলোনা কেনে" কমলা প্রশ্ন করে।মানদা তখন অবাক বিস্ময়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।কমলা বিরক্তি হয়ে বলে"আরে এই হতভাগী হা করে ওদিকে কি দেখো,কি জিগাইছি তার উত্তর দাওনা কেনে।কুমারী পুজোর কুমারী কই।"মানদা সম্মোহিতের মতো হাত টা সামনের দিকে তোলে মুখ দিয়ে একটাই কথা বেরহয়"ওই দেহেন মা"কমলা ফিরে তাকান সিঁড়ির দিকে বিষ্ফোরিত নয়নে দেখেন এক পা এক পা করে উঠে আসছেন যেনো মা নিজেই বালিকা রূপে,একরাশ কালো চুল পিঠ অব্দি নেমে এসেছে,টলো টলো দুটি দীঘল চোখ,ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাঁসি।কে ও ওই চোখ ওই হাসি কমলা আগে কোথায় দেখেছে কেনো মনে করতে পারছে না"কে তুই মা"কমলা জিজ্ঞাসা করে ওঠে।
মেয়েটা ভিতরে ঢুকলো অনেকক্ষন হয়ে গেলো।এখনো বেরোচ্ছে না কেনো।দিলু চঞ্চল হয়ে ওঠে ,তবে কি বিটিয়ার কিছু হল কেউ কি ধরে রাখলো।কি হবে এখন সর্ব মাকে কি উত্তর দেবে।ও জাতিতে মুসলমান নাট মন্দিরে ঢুকতেও পারবে না,কাউকে যে জিজ্ঞাসা করবে তারও উপায় নেই এখন ও কি করবে।দিলুর চাবুকের মতো হাত পা অবস হতে থাকে।
"এই কে রে ওখানে,কে কোথায় আছো ইদিকে এসো চোর পড়েছে"রান্নার লোকেদের কেউ দিলু কে দেখে ফেলেছে তার চিৎকার চেচামেচি শুনে সদরের পাহারাদার গুলো ছুটে আসে,দিলু পালাতে পারে না।ওরা এসে ওকে ধরে ফেলে।শুরু করে গণ প্রহার।দিলু যতই বোঝাতে চায় ও চোর নয়।ওর নাতনি ভুল করে ইদিকে চলে এসেছে তাই তাকে খুঁজতে এসেছে।কেউ মানতে চায় না,জাতিতে মুসলিম জেনে জাত ক্রোধে মারের পরিমান বাড়তে থাকে।ওকে পিছমোড়া করে বেঁধে শুরু হয় লাঠি,লাতির বৃষ্টি।
কমলার প্রশ্নে কেকার হুঁশ ফেরে,সে বুঝতে পারে তার ভুল হয়ে গেছে সে ছুটে বেরিয়ে আসতে যায় বাইরে তখন তার নানু কে সবাই মিলে মারছে।ভয়ে ছোট্ট বুকটা পাখির মতো কাঁপতে থাকে, সে কান্নায় ফেটে পড়ে,চিৎকার করে বলতে থাকে ওগো তোমরা আমার নানু কে ছেড়ে দাওনা গো ।আমরা আর ঠাকুর দেখবো না গো আমার নানু কে ছেড়ে দাও আমরা বাড়ি চলে যাবো।
বাইরে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজে কমলা বলে মানদা দেখতো বাইরে কি হচ্ছে,কারা চেচামেচি করছে।মানদা দৌড়ে গিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দৌড়ে এসে বলে মা শিগগিরি এস একটা লোককে সবাই মিলে চোর বলে মারছে,আর ওই বাচ্চাটা কেঁদে মরছে।কমলা বাইরে আসে ক্রোধিত কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে,এখনি ওকে ছার, মায়ের পুজোর দিনে তোমরা মার ধর করছো, এখুনি ছার।পাহারাদাররা দিলু কে ছেড়ে দেয়।রক্তাক্ত দিলু উঠে বসে কেকা কাঁদতে কাঁদতে দিলু কে জড়িয়ে ধরে।ও নানু আমি আর ঠাকুর দেখতে চাইনা ,চলো আমি মার কাছে যাবো,আমায় বাড়ি নিয়ে চলো।
কমলা প্রশ্ন করে কে তুমি,এই বাচ্চাটা কার।দিলু তাড়াতাড়ি মুখটা গামছার আড়ালে লুকোতে চায়,কমলার দৃষ্টি এড়ায় না ,তীক্ষ চাহনি দিয়ে দিলুর দিকে তাকিয়ে বলে তুমি তুমি দিলবার মোহম্মদ না।
--------কমলা দেবীর প্রশ্নে দিলু চমকে ওঠে,ভয়ে আতঙ্কে বলে ওঠে"আমাগো ছাইড়া দেন মা ঠাউরুন আমরা আর কয়ণ এহানে আইবো না"সজল নয়নে কেকাকে বুকে আঁকড়ে দিলু মিনতি করতে থাকে।
কমলাদেবীর কণ্ঠস্বর আরো কঠিন হয়"এটা আমার প্রশ্নের উত্তর লয়, তুই দিলবার মোহাম্মদ কি না।এই বাচ্চাটা কে"দিলু কেকাকে আঁকড়ে ধরে কয় "হ মা আমি দিলবার,কিন্তু আমি চুরি করতে আসিনি মা,এইডা আমার নাতনি,ঠাউরু দেখতে বায়না করেছিলো, উহান থিকে ঠাওর হতিছিলো না তাই এহানে চলে এইছিলো।ইবারের মতো ক্ষমা করি দাও মা,আর কোনো দিন হবে না।"
কমলা সবাইকে চলে যেতে বলে দিলু কে ভিতরে ডাকে।দিলু থতমত খেয়ে যায়।কমলা আবার বলে"কি হলো ভিতরে আসতে বললাম তো"দিলু বলে কিন্তু মা আমি যে মুচুলমান আমি যাবো কেমনে ঠাউরের সামনে।
কমলা খানিকটা থামে"তুই ভিতরে আয়, আজ মা চেয়েছে তাই তোর নাতনী নাটমন্দিরে উঠেছে।মায়ের উপরে আমি নয়।ভিতরে আয়"
দিলুকে ভিতরে বসিয়ে কমলা প্রশ্ন করে"এবার সত্যি করে বল ,তুই কার বাচ্ছা চুরি করে এনে তোর কাছে রেখেছিস।আমি জানি তোর সাতকুলে কেউ নেই।সত্যি করে বল না হলে ,দারোগা বাবু একটু পরেই আসবেন ।তারে ডেকে বলা করাবো সেটা পুজোর দিন ঠিক হবে"
দিলু কাঁদতে থাকে"আমায় জোর কোরো না মা জননী আমি বলতি পারবো না"
কমলা চিৎকার করে বলে ওঠে"বলতে তোকে হবেই,কোন নোংরা রক্তের ছোঁয়ায়,আমাদের এতো দিনের পবিত্র নাটমন্দির অপবিত্র হলো,আমাকে জানতেই হবে।"
দিলু হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে"মা জননী আর বলোনি,এই বাচ্চাটা কে নোংরা রক্ত বলোনি মা,এ যে এবাড়ীর রক্ত মা,এ কে নোংরা রক্ত বলো নি।"দিলুর কথা সারা বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হয়ে কমলার কানে ফিরে এলো।কমলার সারা পৃথিবী টলতে লাগলো,মনে হতে লাগলো পুরো নাটমন্দির ঘুরতে লাগলো।দিলুর কাধটা খামচে ধরে বলল"কি বললি, তুই কি বললি ,এই বাচ্চাটা----"
দিলু শুরু করলো আট বছর আগে ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা।কালী পুজোর দিন পাঁচেক আগে দীপেন বাবু একদিন দিলুর বাসায় এলো।অনেক টাকা আর দু বিঘা ধান জমি তাকে দেবে বললো।বিনিময়ে একটা ছোট্ট কাজ তাকে করতে হবে।কালিপুজোর রাতে সর্বানীরা যখন ঘুমাবে তখন ওদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ওদের তিনজনকে মেরে ফেলতে হবে।দিলু পারেনি এ কাজ করতে তার জন্য সে রাতেই দিলুর বাড়ী লেঠেল পাঠায় দীপেন বাবু দিলুকে মেরে ফেলার জন্য, ভাগ্য ক্রমে দিলু পালিয়ে বাঁচে,সেই রাত্রে গ্রামের বাইরে নদীর পাড়ে দিলু গা ঢাকা দেয়।দিলু পালিয়ে গেলেও শান্তি পায়না সে জানতো দীপেন সরকার যেটা ভেবেছে সেটা করেই ছাড়বে।তার চোখের সামনে সার্বানীর নিরাপরাধ সরল মুখটা ভাসতে থাকে।
অমাবস্যার ঘন কালো অন্ধকারে দিলু গা ঢাকা দিয়ে আবার ফিরে আসে গ্রামে।দুর থেকে লক্ষ রাখে সার্বানীদের বাড়ির দিকে।রাত তখন দশটা মতন সারা গ্রাম নিস্তব্দ দূরে সরকার বাড়ির কালী পুজোর ঢাকের আওয়াজ আসছিলো ,হটাৎ দিলু দেখে সর্বানী দিদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে দৌড়ে কোথায় যেনো যাচ্ছে।দিলু ওর পিছু নেয়।কবিরাজ খুড়োর বাড়ি থেকে খানিক্ষণ বাদে যখন সর্বানী হন্ত দন্ত হয়ে বেরোয় তখনও দিলু তার পিছু নেয়।সর্বানী দের বাড়ির কাছা কাছি আসতেই দিলু দেখে যা সর্বনাশ হবার তা হয়ে গেছে।দাউদাউ করে পুড়ছে সর্বানী দের বাড়ী, সর্বানী পাগলের মতো দৌড়তে থাকে বাড়ির দিকে।দিলু আর থাকতে পারেনা সে পিছন থেকে সর্বানী কে আঁকড়ে ধরে।ওকে অজ্ঞান করে সেই রাতেই গ্রাম ছাড়ে।দিলু জানতো না সর্বানী অন্তঃস্বতা,কয়েক মাস পরে জানতে পারে,এও জানতে পারে বাচ্চাটার বাবা কে।সর্বানী নির্ধারিত দিনে জন্ম দেয় এক শিশু কন্যার,আল্লার মেহেরবানী দিলুর মতো পাপীর কাছে মা এসেছেন মনে করে দিলু তাকে বুকে আঁকড়ে নতুন স্বপ্নে ভেসে যায়।
গল্পের শেষ দিলু হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে বলে মাগো সবই তো বললাম,এবার আমাদের ছেড়ে দাও কথা দিচ্ছি আমি আমার নাতনি কে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো।কখন কেউ জানতে পারবে না কেকার পরিচয়,গরিব দিলুর নাতনি হয়েই ওকে বাঁচতে দাও মা।ওকে তোমরা কিছু করো না।
শান্ত কমলার দুগাল বেয়ে ঝরে চলেছে অশ্রুধারা দুহাত বাড়িয়ে কেকাকে বুকে টেনে নেয়,চিবুকে হাত বুলিয়ে পরশ পায় তাপসের ,অশ্রু সজল চোখ দুটি মনে করিয়ে দেয় সর্বর কথা।
দিলু চাচা আর কেকা গেছে তো অনেকক্ষন এখনো কেনো এলোনা,সার্বানীর বুক কাঁপতে থাকে তবেকি ওদের কোনো বিপদ হলো।ভাগ্য তো আজ অব্দি ওকে সুখ দিলো না।পাশের বাড়ির কাজলের মা দৌড়ে দৌড়ে এসে সর্বানী কে খবর দেয় তার দিলু চাচা চুরি করতে গিয়ে সরকার বাড়িতে ধরা পড়েছে,ওরা ওকে বেঁধে রেখে দিয়েছে।সার্বানীর মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে সে জানে চাচা কে ওরা কেনো বেঁধে রেখেছে।তার ছোট্ট মেয়েটা,আর কিছু ভাবতে পারছে না সে বোধহয় জ্ঞান হারাবে।না না তাকে কিছু করতেই হবে,কিছুতেই সে তার মেয়েকে হারাতে পারবে না। সর্বানী পাগলের মতো দৌড়তে থাকে সরকার বাড়ির দিকে।উঁচু নিচু আলের পথে উর্ধস্বাসে ছুটতে থাকে সর্বানী, আলের ধারে কাঁটায় রক্তাক্ত তার দুটো পা,শাড়ির আঁচল ভুলণ্ঠিত ঝোপের কাঁটায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পুরোনো শাড়িটা।পথ যেনো শেষ হতে চায় না,বাঁধ ভাঙা অশ্রু দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে।তপ্ত রৌদ্র মাথা ঝিম ঝিম করছে, চোখের সামনে থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে সরকার বাড়ি,ঢাকের আওয়াজ ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে,সর্বানী আছড়ে পড়বার আগে কাউকে ধরে ফেলে।কতক্ষণ সর্বানী পরে ছিলো সে জানেনা দূর থেকে একটা চেনা স্বর সে শুনতে পায়।সর্ব সর্ব কোথায় কোথায় সে যেনো এর আগে সে শুনেছে,সর্বানী আসতে আসতে চোখের পাতা খোলে,তার মুখের কাছে ঝুকে রয়েছে এক মুখ দাড়ি ছিন্ন বসনের একটা মানুষ ,কিন্তু তার চোখ দুটো তার খুব পরিচিত, সর্বানী চিনতে পারে,বুক ফাটা কান্নায় মানুষটার গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে বলে তাপস--------
ছোট্ট কেকা ভয়ে আতঙ্কে কাঁদতে ভুলে গেছে।কমলা দেবী কেকা কে কোলে নিয়ে দীপেন বাবুর কাছে নিয়ে যায়,দীপেন বাবুর সামনে দাঁড় করিয়ে বলে"দেখো চিনতে পারছো না তো মা উমা আমাদের কাছে এসেছেন,সব পাপের মুক্তি দিতে,এটা আমাদের নাতনি,আমার তাপসের বিটি গো, আমার তাপসের বিটি"কমলা দেবী অঝোরে কাঁদতে থাকে।নির্বাক দীপেন বাবুর চোখের কোন দিয়ে জলের ধরা বইতে থাকে,ঠোঁটের কোন গুলো থর থর করে কাঁপতে থাকেকি যেনো বলতে চেয়েও বলতে পারে না।নিশ্চল হাতের আঙ্গুল গুলো একটু একটু কাঁপতে থাকে।কমলা দেবী বলে"মানদা কুমারী পুজোর আয়োজন এবারে অন্য সব বারের থেকে আলাদা করে তোল।আমার মা আজ কুমারী বেসে আমার কাছে ধরা দিয়েছে সাজিয়ে তোল আমার মাকে আমি আর তোর বড়ো বাবু নিজে হাতে মায়ের পুজো করবো।"সরকার বাড়ির ঢাক বেজে ওঠে,মায়ের মুখ ঝলমলে হয়ে ওঠে ঝাড় বাতির আলোয়,ধুপ,ধুনোর ধোঁয়ায় ভরে ওঠে মন্ডপ,পুজো শুরু হয় মাতৃ আরাধনার মন্ত্রে।অলংকারে সজ্জিতা কেকা কে বসানো হয় রুপার গদি মোরা কেদাড়ায় গোলাপ দুধ গোলা জলে ধোয়ান হয় তার ছোট্ট পদ্মের মতো চরণ দুটি।লাল আলতায় রাঙিয়ে তোলা হয় পায়ের পাতা।জ্বলে ওঠে ১০৮ প্রদীপ শুরু হয় কুমারী পুজো।মায়ের মুখে উজ্জল হাসি।দীপেন বাবুকে ধরে ধরে আনা হয় কুমারী মায়ের সামনে ।অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখে কম্পিত হাতের আঙ্গুল গুলো একটু একটু করে সচল হচ্ছে,কোন মায়াবলে তাতে যেনো প্রাণসঞ্চয় ঘটছে।দীপেন বাবুর কম্পিত হাত দুটো পুষ্পাঞ্জলির ফুল তুলে নেয়,অস্ফুট জড়ানো কণ্ঠস্বরে বলে ওঠে মা আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দে মা,আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দে।কুমারী মায়ের চরণে ফুল পরে।১০৮প্রদীপের জাজ্বলমান দীপ শিখা মায়ের তৃনয়ন যেনো স্পর্শ করে।কমলা শুনতে পায়"মা আমি এসেছি মা"অবাক বিস্ময়ে কমলা পিছন ফিরে দেখে তাপস আর সার্বানি দাঁড়িয়ে আছে।আনন্দ অশ্রু ধারায় কমলার চোখের বাঁধ ভেঙে যায়।বেজে ওঠে ঢাক,নাগরা, বাঁশি,আরতির ঘন্টা বেজে ওঠে।আজকে সরকার বাড়ির পুজো গ্রামের লোকেদের কাছে শুধু অষ্টমীর নয়।আজ এই আনন্দ উৎসব চলবে তিনদিন ধরে,ওরা সবাই এই মিলনের সাক্ষী হিসাবে থাকবে বিসর্জনের দিন অব্দি।
আপনারও সবাই মেতে উঠুন আনন্দময়ী র আনন্দ উৎসবে বিসর্জনের দিন অব্দি।
সমাপ্ত
নমস্কার আমার সমস্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে যারা এতদিন আমার সঙ্গে থেকে আমাকে উৎসাহ দিয়ে আমার এই কুমারী পুজোর এক সুন্দর মিলন রূপের ছবি আঁকতে সাহায্য করেছেন।অষ্টমীর পূর্ন প্রভাতে আমার তরফ থেকে রইলো শুভেচ্ছা ভালোবাসা।সবাই খুব খুব ভালো থাকুন,আনন্দ করুন।

অসাধারণ! ধন্যবাদ। 👌👌💫💫💥💥💯
উত্তরমুছুনধন্যবাদ😊😊😊😊
উত্তরমুছুন