#বিষয় - 'মণীষী স্মরণে'
#নাম - 'সাগর সঙ্গমে'
যাবৎ জগৎ,যাবৎ বঙ্গদেশ ও তার সমাজ-সংস্কৃতির ধারা,তাবৎ বিদ্যাসাগর।
বিদ্যাসাগর (১৮২০- ১৮৯১) কে বলা হয় বঙ্গীয় নবজাগরণের প্রাণপুরুষ। নবজাগরণের পথিকৃত রাজা রামমোহন রায়(১৭৭৫- ১৮৩৩) ও সাহেব ইংরেজ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৯০৯ -১৯৩১)। ডিরোজিও যখন চলে গেলেন বিদ্যাসাগরের বয়স তখন এগারো,আর রামমোহন রায়ের যাওয়ার সময় বিদ্যাসাগর তের। সঙ্গী বলতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কিছুটা ছোটো, বঙ্কিমচন্দ্র আরো ছোটো। আর রবীন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, জগদীশ চন্দ্র বসু তো পুত্রপ্রতীম।
রামমোহন রায় চলে যাওয়ার পর পুরো দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। নবজাগরণের যে ধারায় নিজেকে তুলে ধরেছিলেন, সেই মহান মণীষী সম্পর্কে মধুসূদন দত্ত বলেছিলেন - "তাঁর মধ্যে প্রাচীন ঋষিদের প্রজ্ঞা, পাশ্চাত্যের উদ্যম,আর বাঙালি মায়ের হৃদয় ছিল।"
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে কথোপকথন হচ্ছিল এমনিভাবে, ঠাকুর বলছেন - "অনেক খাল-বিল নদী পেরিয়ে এবার সমুদ্রে পড়লাম।" তখন বিদ্যাসাগর বলছেন - "এ সাগরে কেবল লোনা জল।" তখন ঠাকুর বলছেন - "না গো না,এ সমুদ্র ক্ষীর সমুদ্র।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন - "বিধাতা বাঙালি গড়তে গড়তে যে কি করে একটা ঈশ্বরচন্দ্র বানিয়ে ফেললেন সেটা অতীব আশ্চর্যের..."
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন - "সমগ্র উত্তর ভারতে আমার বয়সী এমন কোনো মানুষ নেই,যার উপর ওনার প্রভাব পড়েনি।"
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেছিলেন - "অনুবীক্ষণ নামে একপ্রকার যন্ত্র আছে,যাহাতে ছোটো জিনিসকে বড় করিয়া দেখানো হয়.... কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত বড় জিনিসকে ছোটো করিয়া দেখাইবার জন্য নির্মিত যন্ত্রস্বরূপ।"
এই নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ প্রায়ই তাঁর প্রিয় গল্প খুব করে বলতেন। একদিন বড়লাটের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেছেন প্রিয় পোশাক ধূতি,চাদর ও চটি পরে। এ হেন অদরবারী পোশাক দেখে তাঁকে গেটে আটকে দেওয়া হলে, তিনি নাটকীয় ভঙ্গীতে বলেছিলেন - "কেন আ- মা-কে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়নি!" আসলে বিদ্যাসাগর বোঝাতে চেয়েছিলেন আমার পোশাককে নয়, আমি মানুষটাকে ডাকা হয়েছিল, না হয়নি!
এই মানুষটি শুধু ধুতি,চাদর ও চটি নিয়ে পরিচিত ছিলেন না,পরিচিত ছিলেন বড়বাজারের বাসাবাড়িতে মাতৃতুল্য স্নেহময়ী বিধবা রাইমণির থেকে পাওয়া করুনার সাগর তিনি। এছাড়া দায়িত্ব, দান ও দয়াশীলতা পেয়েছিলেন মায়ের বড় মামা রাধামোহন বিদ্যাভূষনের থেকে। আর দৃঢ় পৌরুষকার লাভ করেছিলেন পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কাছ থেকে।
পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় জোড়াসাঁকোর পেতল ব্যবসায়ী রামসুন্দর মল্লিকের কর্মচারী হিসেবে বেতন পান দশটাকা। খদ্দেরদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা আদায় ছিল কাজ। এই সামান্য রোজগার সত্ত্বেও ঈশ্বরকে আনলেন কলকাতায়। সংস্কৃত কলেজে মেধাবী ছাত্র বলে ঈশ্বর পান পাঁচটাকা জলপানি। শত দুঃখে এ যেন একচিলতে সুখের ধন!
দেখতে দেখতে ঈশ্বর সতেরোয় পা দিলেন। 'ল' কমিটির পরীক্ষায় পাশ করলেন। সঙ্গে জুটল ত্রিপুরায় 'ল' পন্ডিতের চাকরি। কিন্তু ঠাকুরদাস ছেলেকে পাঠাতে দিতে নারাজ। সে অনেক দূর বলে।
১৮৪১ এ কলেজ পাশ করলেন। পেলেন 'বিদ্যাসাগর' উপাধি। সেই সঙ্গে ফৌর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান পন্ডিতের চাকরি। আর এখান থেকেই শুরু ইংরেজি শেখা। সে শেখায় মনোযোগ বলতে মনোযোগ! সাহেবরাও পর্যন্ত অবাক,আর হাতের লেখা দেখে সাহেবরা বড়ই ঈর্ষান্বিত হতেন।
এবার শুরু হলো পরহিতব্রতের যাত্রা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্যাতি যখন মধ্যগগণে তখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান করণিকের চাকরি পাইয়ে দিলেন বন্ধু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে( সুরেণ বাড়ুজ্জের বাবা)। সেই সঙ্গে তাঁর ম্যাডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগও করে দিলেন। আর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সংস্কৃত ভাষায় অবসর প্রাপ্ত রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ক সংস্কৃত ভাষা শেখার সহজ পথ তৈরি করে দিতে রচনা করলেন 'সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা(১৮৫১) ও 'ব্যাকরণ কৌমুদী'( ১৮৫৩- ১৮৬২)।
এবার আসা যাক ঈশ্বরচন্দ্রের সমাজ ধারণের কথায়।
মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে ঘরে বাইরে হলেন প্রবল বাধার মুখোমুখি। স্বয়ং ঈশ্বর গুপ্ত,যিনি নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী, ঈশ্বরচন্দ্রের বন্ধুস্থানীয় ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীতে সহকর্মী, তিনি তো উঠতে বসতে সাহেব বেথুন ও ঈশ্বরচন্দ্রকে তীব্র কটাক্ষ করে নাজেহাল অবস্থা সৃষ্টি করতে কিছুই বাকি রাখছেন না। বেথুন ও ঈশ্বরকে একাসনে বসিয়ে ঈশ্বর গুপ্তের তীব্র কটাক্ষ - " আগে মেয়েগুলো ছিল ভালো ব্রতধর্ম কর্তো সবে/একা বেথুন এসে শেষ করেছে আর কি তাদের তেমন পাবে।/ যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে/ তখন এ বি শিখে বিবি সেজে বিলেতি বোল কবেই কবে।"- তা অক্লেশে তোয়াক্কা না করে ঈশ্বর চলেন আপন গতিতে।
মেয়েদের শিক্ষার জন্যই নাকি সংসারের যত অমঙ্গল। এই মতাবলম্বীদের দেখে ঈশ্বরের তো গা পিত্তি জ্বলে যায়। একরোখা মেজাজে আরো জেদ চেপে যায়, মেয়েদের জন্য চাই আরো শিক্ষার উন্নয়ন। সমাজ রে রে করে তেড়ে আসে আসুক, ছোটোবেলা থেকে ভয় জিনিসটা তাঁকে কাবু করতে পারেনি। তাই কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন। নানা কাজের ফাঁকে পালকিতে চড়ে শিক্ষা কেমন চলছে পরিদর্শনের ফাঁকে পথে চলতে চলতে লিখে ফেললেন 'বর্ণপরিচয়'(১৮৫৫)। আর বইটি থেকে যা অর্থ এলো তাই দিয়ে শিক্ষার পরিকাঠামো ও শিক্ষকের বেতন খাতে খরচ দিব্যি চলল। সেই সঙ্গে প্রমাণিত হল মেয়েদের দিয়ে কিছু একটা যে হতে পারে তাই রামমোহনের আশা বিদ্যাসাগরের হাতে পেল অনেকখানি পূর্ণতা।
কিন্তু রামমোহন রায় যে সতীদাহ প্রথা রদ করে বিধবাদের সংখ্যা হু হু করে বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন তার কি হবে! অগত্যা সেই পর্বতপ্রমাণ সমস্যা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। কেননা মা ভগবতী দেবী যে বলছেন - "তুই এতদিন এত শাস্ত্র পড়লি তাহাতে বিধবার কি কোনো উপায় নেই?" এ তো প্রশ্ন নয়,যেন আদেশের নামান্তর।
অগত্যা বিধবাদের হয়ে পথে নামলেন। একেই নারী-শিক্ষা নিয়ে দিকে দিকে সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছেন,তার উপর বিধবাবিবাহ! সর্বশক্তি একদিকে বিপরীতে একা ঈশ্বরচন্দ্র। প্রথা চালু নিয়ে বড়ই গোলে পড়েছেন বড়লাট ডালহৌসি। বড়লাট ঈশ্বরচন্দ্রকে বোঝালেন চারদিকে এত যখন আপত্তি,সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। না হলে প্রমাণ দিতে হবে শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের কথা আছে কোথায়। একটা অন্তত সাপোর্ট চাই।
তখন ঈশ্বরচন্দ্র শাস্ত্রের পর্বতে সওয়ার হলেন। এ যেন পল গাদায় সূঁচ খোঁজার অবস্থা। পেয়েও গেলেন। ঐ তো পরাশর সংহিতার চতুর্থ অধ্যায়ের শ্লোকে বলছে - "নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পাততে পতৌ।/ পঞ্চস্বাৎসু নারীনাং পতিরন্যোবিধীয়তে।।"- যদি স্বামী মারা যান,সন্ন্যাস নেন, নিখোঁজ হন, সন্তান গ্রহণে অক্ষম হন,অত্যাচারী হন,স্ত্রী আবার বিয়ে করতে পারেন। এই প্রমাণ থেকে তিনি লিখলেন 'বিধবা বিবাহ চলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব'(১৮৫৫)।
চোদ্দ মাসের মধ্যে চালু হল বিধবা বিবাহ আইন। আর প্রথম বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় ৭ ডিসেম্বর,১৮৫৬।
এর ঠিক দশ মাস আগে ১৮৫৬ র ফেব্রুয়ারীতে 'সম্বাদ প্রভাকর' পত্রিকায় এক বিধবার মুখ দিয়ে বলানো হয়েছিল - "যাবজ্জীবন দুঃখানলে দগ্ধ হওয়া অপেক্ষা এক দিবস দগ্ধ হইয়া প্রাণ বিনাশ করা আর কতই ক্লেশকর বল?" আর ঈশ্বরগুপ্ত বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ঈশ্বরচন্দ্রকে কটাক্ষ করে লিখলেন - "অগাধসাগর বিদ্যাসাগর তরঙ্গ তায় রঙ্গ নানা ।/ তাতে বিধবাদের কুলতরী অকূলেতে কূল পেল না।/
বিধবারাও প্রথম প্রথম নিজেদের দুর্দশা-মুক্তি নিয়ে আহ্লাদিত হলেও ফলশ্রুতিতে খুব একটা সুরাহা তাঁরা দেখতে পেলেন না। তাঁদের বড়ই করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তার থেকে বেশ্যা জীবন অনেক স্বাধীন ও সম্মানের। নিদেনপক্ষে কাশীবাসও অনেক সুখের। কিন্তু কাশীবাস চাইলেই বা সেখানেও স্থান পেলে তো - বঙ্গীয় বিধবাদের সংখ্যা তো আর কম নয়! এই সময় বিধবা বিক্রিরও ব্যবসা বেশ জমে উঠেছিল। এর জন্য বিধবারা দায়ী করেন সিপাহী বিদ্রোহকে। সিপাহী বিদ্রোহে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রচারে ও দেশ সেবার নামে, ধরে ধরে বিধবাদের কাজে লাগানো হতো। এই সুযোগ বুঝে ইংরেজ সাহেব বিধবাদের ভোগ্যপন্য হিসেবে ইচ্ছা পূরণ করতেন। শুধু ইংরেজ সাহেবগণ কেন,এদেশীয় জমিদার,গোমস্তাকুলও কম যেতেন না।
তার উপর গন্যমান্যদের মধ্যে অন্যতম রাধাকান্ত দেব ও তাঁর সম্প্রদায়ের বিধবাদের বিরুদ্ধে বিরোধিতায় বিধবারা আরো বিপদে পড়লেন। বঙ্কিমচন্দ্রও তলে তলে বিরোধিতায় সামিল। বিধবাদের শোচনীয় অবস্থা দেখে,রাণী রাসমণি তাঁর স্বামী রাজচন্দ্রকে বলেছিলেন - "সহমরণ প্রথায় আমাদের অনেক সুবিধাও ছিল,অসুবিধাও ছিল।.... বড়লাট সাহেব সহমরণ প্রথা উঠাইয়া দিলেন ভালই বটে কিন্তু বঙ্গ বিধবাদের পরিত্রাণের অন্যবিধ উপায় রহিল না। তাহারা যে কত কলঙ্করাশিতে কলঙ্কিত হইবে বলা যায় না।"
এরপর ঈশ্বরচন্দ্র বড়লাটকে বোঝালেন যত নষ্টের গোড়া ঐ বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ। ওটা রদ করা চাই। রদ করতে দেখালেন অকাট্য যুক্তি বিষয়ক গ্রন্থ - 'বহুবিবাহ রহিত হওয়া এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব'(১৮৭১ ও ১৮৭৩)। আর 'বাল্য বিবাহের দোষ' নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন 'সর্ব সুখকর পত্রিকা'য়।
চতুর্দিক থেকে কেবল তির্যক মন্তব্য, নিন্দা,গালমন্দ বই
ভাল বলার লোক নেই বললে চলে। তারই জবাবে
কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য ছদ্মনামে একটি বই 'অতি
অল্প হইল'(১৮৭৩),অপর একটি বই কস্যচিৎ উপযুক্ত
ভাইপো সহচরস্য ছদ্মনামে 'আবার অতি অল্প
হইল'(১৮৭৩) লিখলেন।
এইভাবে ঈশ্বরচন্দ্র সমাজের জন্য যে লৌহ কঠিন ছাদ
নির্মাণ করে গেছেন নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য
রেখে, বাঙালি জাতির দায়িত্ব শুধু তাকে সংস্কার ও
নবীকরণ করা শুধু। তাই তিনি এত সব কর্মকান্ডে
বাঙালি হৃদয়ে চির গৌরবময় স্থানের অধিকারী হয়ে
আছেন ও চিরকাল থাকবেন।
( শার্ধশতবর্ষে বিদ্যাসাগরের জন্মদিন স্মরণে)
# কলমে - মৃদুল কুমার দাস।
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.
দারুণ....অনবদ্য রচনা ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।🌻🌻💐💐
উত্তরমুছুনবিদ্যাসাগরের এক সুন্দর আখ্যান..💐👌
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💐💐🌻🌻
মুছুন