শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০

#বিষয় - ছোটগল্প -'কুহুকিনী'

 

# বিষয় - ছোটগল্প

# নাম - 'কুহুকিনী'
   

দীঘল চোখ। পটলচেরা। কেশবতী কন্যা। কেশ যেন একরাশ ঘন অন্ধকার। কোমর পর্যন্ত ছেয়ে আছে। সেই চুলকে বিনুনি দিয়ে বোঝায় তাই যেন চরিত্রের দৃঢ়তা।
অপূর্ব সৌষ্ঠব। চিত্রপটে আঁকা নীরব প্রতিক্রিয়া। রোগাটে, আবার তাও নয়। গাত্রবর্ণ দুধে আলতা।
মুখের শ্রীতে ভ্রু জোড়া যেন তলোয়ারের খাপ। নাক যেন বাঁশির মতো। ওষ্ঠযুগল যেন নিখুঁত দাড়িম্ব ফলের মতো। গাল দুটো কামরাঙার মতো টইটম্বুর। কোনোদিন পিঙ্ক কালার শোভিতা তো, পরের দিন বাসন্তিশোভিতা। নীলাম্বরী কখনো কখনো। পাশে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ ঝুলিয়ে ঠিক হনহনিয়ে চকিতা হরিণীর মতো চলে। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বলে ঐ আসে ঐ ক্ষিতি সৌরভী হরষে। নাম হিরণ্ময়ী সেন।
দিঘির পাড়ে তাল তমালের সারি, মেহগনি,মহানিম। তাদের শরীরের ফাঁক খুঁজে রৌদ্র যেমনভাবে দিঘির জলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি কিংশুক বসুর মন সময়ের ফাঁক গলে হিরণ্ময়ীতে আছড়ে পড়তে মন উতলা হয়। যেন কোন যুগ হতে এযুগে হেঁটে হেঁটে এসেছে আকুল আকূতি নিয়ে।
  দিঘির পাড় ধরে হিরণ্ময়ী রোজ আসে দশটা দশে। কিংশুকও ঐ সময় ঘরের গেট থেকে বেরয়। অবশ্য আগে সময় এদিক ওদিক হতো। এখন হয়না। একদম পাঙ্কচুয়াল। হিরণ্ময়ীকে নাহলে মিস করতে হবে। আগেও হয়ে যায়,ঘন ঘন ঘড়ি দেখে,আর গেটের মধ্যে গোলাপ, রজনীর সাথে আলগোছে আপন মনে এটা ওটা বলে সময়টা কভার করে।
কিংশুক বাড়ির গেট খুলবে, আর দেখবে সামনে রোজ ছাতিম গাছটা বাসন্তি হাওয়ায় যেন চামরের-দোলায় দুলছে। কিংশুক গাছটা গেটের ভেতর। তারও আহ্লাদ কম নয়। ছেলে কিংশুকের জন্মের সময় গেটের মধ্যে কিংশুক গাছ ও গেটের বাইরে ছাতিম গাছ মা নীলিমা দেবী লাগিয়ে ছিলেন। বাপের বাড়ি থেকে ভাই প্রমথ মজুমদার এনে লাগিয়ে দিয়েছিল, ছেলের নাম তাই কিংশুক। এ নীলিমা দেবীর বাপের বাড়ির রেওয়াজ। ছেলে কিংশুক বসু নয় নয় করে ত্রিশটি বসন্ত পেরিয়েছে, কিংশুক ও ছাতিমের সাথে।
  হিরণ্মময়ী দিঘির ওপার দিয়ে ত্র্যস্ত পায়ে হাঁটছে,আর এপারে কিংশুক যাবে হিরণ্ময়ীর ঠিক উল্টো পথে। কিংশুক ও হিরণ্ময়ী সমান্তরাল বিশ ত্রিশ মিটার হাঁটার পর দু'জনের পথ দু'দিকে হয়ে যায়। যখন আলদা হতো কিংশুক মনে মনে বলতো সময় তুমি এতো নিষ্ঠুর কেন? পথ তুমিই বা আলাদা হয়ে গেলে কেন?কিংশুকের নিজেকে খুব বেহায়া বেহায়া লাগে। লোভীর মতো চেয়ে থাকতে ইচ্ছে হয় বলে। ভাবে মেয়েটা তার এই বেহায়াপনার জন্য কিছু ভাবছে না তো।
তাই ইদানিং ঘর থেকে বেরনোর সময় মনে মনে ঠিক করে হিরণ্ময়ীর দিকে তাকাবে না। কিন্তু কিছুতেই পারে না। ইদানিং কিছু লিখতে গিয়ে কি কবিতা,গল্প,বা ছবি শুধু মুখ ভেসে ওঠে। অফিসে বসে লিখতে গিয়ে কেবল হিরণ্ময়ী সমুদ্রের ঢেউয়ের মত হয়ে মনের উপর আছড়ে পড়ে। 'প্রগতিশীল' পত্রিকার লেখক কিংশুক। গল্প,কবিতা শুক ছদ্মনাম দিয়ে বেরয়। বাইরে ততটা এখনো কিংশুক বিখ্যাতদের পঙক্তিতে নেই, তাকে কারো জানার কথাও নয়। এরি মধ্যে তার গল্প যেভাবে হিট করেছে ভাগ্যিস ছদ্মবেশে আছে। মেয়েটা কি জানে আমার লেখা ঐ নামকরা পত্রিকায় বেরয়। নিশ্চয় নয়।
হিরণ্ময়ী দ্রুত পা ফেলে চলে। স্কুলে পৌঁছতে এখনো পনর মিনিট সময় লাগবে। সাড়ে দশটায় গেট বন্ধ হয়ে যাবে। যেতে যেতে দিঘির বাতাস তাকে সঙ্গ দেয়। আঁচল যতই গুছিয়ে চলার চেষ্টা করে মাতাল বাতাস ঠিক টলে টলে আঁচলে আছড়ে পড়ে। আঁচল এলোমেলো করে। আর টুপটাপ শব্দ করে পাতারা ঝরে। মেহগণি,মহানিমও এক ঠ্যাঙা হয়ে দাঁড়িয়ে বাতাসে দোল খায়। হিরণ্ময়ীর আঁচল সামলাতে সামলাতে দিঘির ওপাড়ে দৃষ্টি চলে যায়। কিন্তু একটা ঢং তাকে বজায় রাখতে হয়। ওপারে কিংশুককে নজরে রেখেও না রাখার ভান করে। তাকে যে করতেই হবে। সে না প্রকৃতির অংশ।  মনে মালুম হয় তাকে নিয়ে কিংশুক খুব কৌতূহল। হওয়াই স্বাভাবিক ও না পুরুষ।
দেখোনা তাকাচ্ছে, আবার ভান করছে ভাঙবে তবু মচকাবে না। বাছা তোমাকে মচকাতে হবে। পুরুষের বেহায়া হওয়া সাজে, একটা মেয়ের লজ্জার দর কি বোঝো না বাছাধন। বুঝতে তোমাকে হবেই। না হলে তুমি পুরুষ নও। এই তো বৎস লাইনে তুমি আছো। তাকানোটা যতই লুকিয়ে লুকিয়ে হোক ধরা তুমি দিয়েছ মশাই। মেয়েরা ছেলেদের তাকানোটার মধ্যে যে অনেক কিছু বুঝে ফেলে। সে বোঝার ক্ষমতা ভগবান তোমাদের দেয়নি। যদি দিত মেনকার তেজ বৃথা হতো। তাহলে বিশ্বামিত্র থেকে শকুন্তলা আসতো না। আর নারীর জন্য ব্যাসদেবের মহাভারত রচিত হতো না।
কিংশুক আবেগ আর ধরে রাখতে পারছে না। তার নামটা অন্তত জিজ্ঞেস করা যেতে তো পারে। রাস্তা ভুল করে একদিন চলে গিয়ে মুখোমুখি হলে মন্দ হতো না। রাস্তা ভুল করে এসে পড়েছি  এই নাটকটা মিশিয়ে দিলেই তো হলো। আবার মনে মনে ভাবে নাটকটা নিখুঁত হবে তো। যদি ধরা পড়ে যায়! লজ্জার শেষ থাকবে না। তখন কি ভাববে মেয়েটা। ধ্যাৎতেরিকা তোর পুরুষ মনের এতো দ্বন্দ্বের নিকুচি করেছে। ঐ উত্তর গোলার্ধের জন্য এতো কৌতূহলেরই বা কি আছে। জয় করতে পারাই তো পুরুষের কম্ম। তাই তো অজেয় পৌরুষ। আবার পরক্ষনে ভাবে যদি প্রত্যাখ্যান করে। তখন লজ্জার শেষ থাকবে না। যদি কারো বাগদত্তা হয়। এতদিনেও কি ভ্যাকেন্সি আছে? 
কিংশুক দিবারাত্রি ভেবেই যাচ্ছে। আর তাই নিয়ে আস্ত একটা গল্পও 'প্রগতিশীল'-এ বেরিয়ে গেছে। গল্পের শেষ নায়ক নায়িকার বিচ্ছেদ দিয়ে। বিচ্ছেদ দিয়ে করতে হয়েছে কিংশুক যাকে নিয়ে গল্পটা লিখেছে তার মনের তলাতলের সন্ধান পায়নি বলে, শেষে নিজের হাতে নায়ককে ফেরার করেছে,আর নায়িকাকে কাশিতে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। মামারা নিয়ে গেছে। ওখানে বিয়ের কথা পাকা করতে। এরকম একটা সম্ভবনা দিয়ে গল্পের কাহিনি শেষ করেছে কিংশুক। তাই নিয়ে কিংশুক ক'দিন খুব মন মরা। কারণ দিঘির ওপাড়ে তার অন্তরে নিত্য আনাগোনা কুহুকিনীর যদি এমন পরিণতি হয়। না এ টেনশন নেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে হিরণ্ময়ী জেনে ফেলে শুক ছদ্মনামের আড়ালে কিংশুক, আর ঐ কিংশুক তাকে ঘিরে গল্পটা ছকেছে। হিরণ্ময়ী যে ঐ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। আর শ্রীময়ী ছদ্মনামে তার পত্র বিভাগে মাঝে মাঝে যেতে হয়। পত্র পৌঁছে দিতে। পত্র বিভাগে রেনুকাদি যে তার দূর সম্পর্কের মামাতো বোনের ননদ। সেই বলেছে।
এই হলো সব জানতা নারী। বাছাধন নারীর তল এতো সহজে ধরা যায় না। পুরুষ তুমি নারীর হাতের পুতুল। তুমি যে ভাব ভোলা। ভিখিরি। পথে পথে অন্ন চাইবে ঘরে অন্নপূর্ণা থাকা সত্ত্বেও। শেষে সেই অন্নপূর্ণার হাতে অন্ন নিয়ে তোমার ঘরণীর শক্তি চেনা শেষ হবে। পথের ভবঘুরে হওয়ার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে  গৃহমুখী হবে। যত দূরেই যাওনা পুরুষ, নারীর হাতের লাটাইয়ে তোমাকে বাঁধা যে পড়তেই হবে।
কিংশুক আর আবেগ ধরে রাখতে পারেনা। একদিন তো হিরন্ময়ীর যাতায়াতের পথে গিয়ে মেশে। অপেক্ষা করতেই থাকে। কিন্তু হিরণ্ময়ীর দেখা নেই। এরকম দু'দিন হয়েছে। তৃতীয় দিন যথারীতি পূর্ববৎ এপাড় ওপাড় মাঝখানে দিঘি।
কিংশুক মনে মনে বলে যা হতভাগা তোর এমনি কপাল? তোর কপালে মেয়েটা নেই বোধ হয়। তোর গল্পের নায়িকা ও হতে চলেছে।
আবার একদিন চেষ্টা করলো কিংশুক। এবার সফল হলো। কিন্তু কেউ কাউকে দিশা দিচ্ছে না। এভাবেই দু'দিন চলার পর তৃতীয় দিনে কিংশুক নাম জিজ্ঞেস করল। উত্তর ছোট্ট করে,ও নিচু গলায় -'হিরণ্ময়ী।'
'আমি কিংশুক।'
ওহে কিংশুক আরো কিছু বলো। ব্যাশ ওইটুকু বলার জন্য এতো দিন এভাবে সময় দিলে!
না আজ যা হয়েছে ওটা কম কিসে। নামটা জানা গেল। কি সুন্দর নাম! হিরণ্ময়ী।
ভয়ে ভয়ে বললাম না। যদি এনগেজ থাকে। হিরণ্ময়ীতো কিছু বলল না।
  দূর বোকা! আস্ত পাঁঠা। তোর দ্বারা প্রেম হবে না। তোর বুকের পাটা নেই। তোর ঐ বাইরে থেকে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি দেখাচ্ছে, আসলে তুই প্রেমের অনুপযুক্ত।
ঠিক আছে পরের দিন হবে। একটা কথা বলবো যতক্ষন হিরণ্ময়ীর পাশে হেঁটেছি ওর এই যে রহস্যময়ী ভাবটাকেই আমি মন দিয়ে ছুয়েছি। একটা মেয়ে কি কি তাই পাওয়ার যতটা তাই পেয়েছি। তাই হল আমার এই গল্পের রসদ। আমার গল্পে বিচ্ছেদ দিয়ে নয়,পরের গল্পে থাকবে মিলন। সেদিন যেখানে শেষ করেছি সেখান থেকে শুরুর নায়িকা কুহুকিনী হিরণ্ময়ী।🌻🌻🙏🙏

    # কলমে ~ মৃদুল কুমার দাস

Copyright reserved for Mridul Kumar Das 


১৩টি মন্তব্য:

  1. দারুণ খুব ভালো লাগলো👌👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ এক গল্প পড়লাম। কিংশুক ও হিরন্ময়ীর এই প্রেম যেন পরিণতি পাই, সেটাই কামনা করি🙏

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...