রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

যেতে দেবো না (পিয়ালী চক্রবর্তী)





তার আঁচলের প্রতিটি ভাঁজে, লুন্ঠিত হৃদয়ে স্পৃহাহীন আমি  সজল চোখে দেখি তার নীরবে চেয়ে থাকা । মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন ওই পদ্মফুলের পাপড়ির মত ওই কাজল কালো চোখ মেলে প্রথমবার তাকিয়েছিল আমার দিকে । 


সকাল আটটার বাসেও কি ভীড় । শরীরটাও খুব দুর্বল স্নেহাশিষের । সবেমাত্র টাইফয়েড থেকে উঠেছে । কিন্তু, বসের জরুরী তলব । অফিস যেতেই হবে আজকে ।  ভীড় ঠেলে বাসে উঠে কোনোমতে ওপরের রডটা ধরে দাঁড়িয়ে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে বেচারা । এমনসময় সামনের লেডিস সিটে বসা একটি মেয়ে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, "আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? এখানে বসুন ।" 

স্নেহাশিষ : না, না, আপনি বসুন ম্যাডাম । আমি ঠিক আছি ।

মেয়েটি : বসতে বলছি চুপচাপ বসে পড়ুন, অতো কথার দরকার নেই । আমার সিট, আমি বসতে বলছি, এতে কারোর আপত্তি থাকলে আমি বুঝে নেবো । 

এই প্রথমবার এক অজানা, অচেনা মেয়ে এত আপন করে কথা বললো । মা - বাবা হারানো স্নেহাশিষ দূর সম্পর্কের কাকার কাছে মানুষ । কেউ কোনোদিন ওর ওপরে এতটা অধিকার দেখিয়ে কথা বলেনি । এক লহমায় মনটা যেন ভালো হয়ে গেল তার । সিটে বসে ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলো, বেশ সুন্দরী, একমাথা বাদামী খোলা চুল ও কাজল কালো চোখ । দেখেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে এমন এক রূপের অধিকারিণী । মেয়েটির নাম রূপসা । স্নেহাশিষকেও দেখতে যথেষ্ট  সুপুরুষ । চওড়া বুক ও কাঁধ । পেশীবহুল চেহারা । 

রোজই একই বাসের সহযাত্রী তারা । দুজনের মধ্যে শুরু হলো কথা । ধীরে ধীরে কথা থেকে ভালো লাগা এবং ভালোলাগা কোনদিন তাদের অজান্তেই ভালোবাসার রূপ নিলো । অফিস সেরে একে অপরের জন্য অপেক্ষা এবং এক এক দিন গঙ্গার ধার, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল ঘুরে যে যার বাড়ি ফিরে যেতো । একে অপরের হাতে, কাঁধে, ঠোঁটে, বুকে হারিয়ে যেতো তারা । পরস্পরের উষ্ণ সান্নিধ্য উপভোগ করে ভরে থাকতো তাদের মন প্রাণ । 

একদিন, স্নেহাশিষ বাসে উঠে দেখলো রূপসা আসেনি । মনটা খারাপ হলো । তৎক্ষণাৎ ফোন করে সুইচ অফ পেলো । চিন্তিত হয়ে পড়লো ও । তড়িঘড়ি বাস থেকে নেমে সোজা রূপসার বাড়ি গিয়ে পৌঁছলো । দরজা খুলে দিল রূপসার বাবা । যেন  তিনি আগে থেকেই জানতেন যে, স্নেহাশিষ আসবে । উনি স্নেহাশিষকে ভিতরে আসতে বললেন না । ওনার রাগত দৃষ্টিতে ওর প্রতি অবহেলা ও ঘৃণা ঝরে পড়ছে । উনি বললেন, "রূপসার আগামীমাসে বিয়ের ঠিক হয়েছে । তোমার মত অনাথ, নামগোত্রহীন ছেলেকে যেন আর কোনোদিন ওর ধারেবাড়ে না দেখি । কেটে পড়ো ভালোয় ভালোয়, নাহলে আমার অন্য উপায় জানা আছে ।" রূপসা ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে ওর বাবার সব কথা শুনছে, কিন্তু সামান্য প্রতিবাদটুকুও করলো না । মাথা নীচু করে চলে গেল স্নেহাশিষ । আজ প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেছে, সে না গেছে অফিস, না আছে খাওয়া দাওয়ার ঠিক, না রাত্রে ঘুমোতে পারে । যন্ত্রনা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে । 

আগামীকাল বিয়ে রূপসার । ওকে তো কিছু উপহার দিতেই হবে । প্রাণের চেয়ে দামী আর কি হতে পারে!!! সন্ধ্যেবেলা, নির্জন গঙ্গার ঘাট । সাঁতার জানেনা স্নেহাশিষ । ধীরপায়ে নেমে যাচ্ছে একটা একটা করে সিঁড়ি । শেষ ধাপে এসে পৌঁছলো । মোবাইলটা বের করে রূপসার ছবিটা বুকে আঁকড়ে ধরে ঝাঁপ দিতে যাবে,  দুটো হাত শক্ত করে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে । রূপসার গলা, "আমি তোমার ছিলাম, আছি, থাকবো । যেতে পারবেনা তুমি ।"

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

২২টি মন্তব্য:

  1. আহা লেখনীর কি সাংঘাতিক ধার।
    তোর জোড়া খুঁজে পাওয়া ভার। 👌🏻👌🏻😘😘💘💘💘🌹🌹

    উত্তরমুছুন
  2. সত্যি ভালোবাসা এভাবেই ফিরে আসে...যে নিজের, সে তোমার কাছে ফিরে আসবেই, কোনো শক্তি কোনো বাধা তাকে আটকাতে পারবে না...মনের মানুষের মধ্যে পুনর্জীবন ফিরে পাওয়ার এই অসাধারণ লেখনী এক মুগ্ধতার রেশ রেখে গেলো... খুব সুন্দর👌👌👌❤️❤️

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. শেষে মিল না হলে সেটা শেষই নয় । অনেক ধন্যবাদ❤️❤️

      মুছুন
    2. অপূর্ব লেখনী।প্রত্যেকের জীবনে যেন ভালোবাসা এভাবেই ধরা দেয়।

      মুছুন
  3. খুব সুন্দর লিখেছ....👌👌👌👌🌹🌹🌹🌹🌹

    উত্তরমুছুন
  4. দারুন দারুন , খুব ভালো লাগল দি 👏👏👏

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...