শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - আধ্যাত্মিক - পর্ব- ৭ মৃদুল কুমার দাস।

#নাম-  ' যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি"
                     (পর্ব- ৭)

    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       নরেন্দ্রনাথের মধ্যেও যে গীতি-সত্তার অলৌকিকতা বিরাজ করছে তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অল্প-স্বল্প খবর ছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজের জগত নিয়ে ছিলেন মসগুল। নিজস্ব ঘরানায় গান লিখছেন,সুর দিচ্ছেন,সুরেলা কন্ঠে গাইছেন। প্রেম ও পূজার গানে সর্বাধিক দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।
    রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গান নরেন্দ্রনাথের ভালো লাগত। কন্ঠ্যস্থও ছিল।যেমন, 'তোমাকেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা...' - গানটি বিভোর হয়ে প্রায় গাইতেন নরেন্দ্রনাথ। মা ভূবনেশ্বরী শোনেন আর কাঁদেন। আর জিজ্ঞেস করেন - "কার গানরে?"
নরেন বলেন -
      "ঠাকুর বাড়ির ছোট ছেলে রবীন্দ্রনাথের লেখা।"
মা ভুবনেশ্বরী বললেন- "শুনেছি কবিতা লেখার হাতও বেশ! একদিন বড় কবি হবে। ভূবনজোড়া খ্যাতি হবে।"
  "তবে জমিদার বাড়ির ছেলে। ওদের সঙ্গে আমাদের ভাব-ভালবাসা হওয়ার কথা নয়। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ারও নয়, কেননা ওর সব গান ভালো লাগে না। অনেক গান কেমন হতাশ করে। যেমন ভক্তির গানেও পূজার সঙ্গে মিশে যায় শৃঙ্গার। ও ভোগী। আর আমার মুক্তি তো বৈরাগ্য সাধনায়। ওর নয়। আমার সন্ধান একরকম,ওর আরেক রকম। আমরা ভিন্ন পথের পথিক।" ওদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা মা ভূবনেশ্বরী দেবী পাড়তেই নরেন্দ্রনাথ এত কথা গড়গড়িয়ে শুনিয়ে দিলেন।
     কিন্তু উভয়ের অগোচরে উভয়ের মুখোমুখি সাক্ষাতের সুযোগ করে দিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।
      ঘটনার সময় ১৮৮১। জুলাই মাস। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঋষি রাজনারায়ন বসুর চতুর্থ কন্যা লীলাবতীদেবীর বিয়ে। পাত্র কৃষ্ণ কুমার মিত্র। বিয়ে শ্রাবণের ১৫ তারিখে। অনুষ্ঠানটি হবে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে। খুব ধুমধাম সহকারে। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ তিনটি গান বাঁধেন। নিজেই সুর দিলেন।
      প্রথমটি সাহানা ঝাঁপতালে- 'অবশেষে জীবনের মহাযাত্রা ফুরাইলে/তোমারি স্নেহের কোলে যেন গো আশ্রয় মিলে,/দুটি হৃদয়ের সুখ দুটি হৃদয়ের দুখ/দুটি হৃদয়ের আশা মিলায় তোমার পায়।'
   দ্বিতীয়টি খাম্বাজ একতালে- 'জগতের পুরোহিত তুমি...',
   তৃতীয়টি বেহাগ তেতালে- 'শুভ দিনে এসেছ দোঁহে...'।
  সমস্যা হল কাকে দিয়ে গাওয়াবেন। হতে হল বৌঠান কাদম্বরী দেবীর দ্বারস্থ। বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনকে দিয়ে গান গাওয়াতে বললেন। নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনের অনেক পরিচয় দিলেন-
   "নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রায়শই আসে বাবা মশায়ের কাছে। বাবা ম'শায়কে গানও শোনায়। বাবা ম'শায় ভারি স্নেহ করেন ওকে।আর বলেন,যেমন গান-বাজনায়, তেমনি লেখা-পড়ায়। তাছাড়া নানা আধ্যাত্মিক সংশয়ের মধ্যে রয়েছে ছেলেটি। কী যেন খুঁজছে সারাক্ষণ।কি ভরাট কন্ঠ্যস্বর! আর কি ব্যক্তিত্ব!"
রবীন্দ্রনাথের মনে পড়ল নরেন্দ্রনাথের মুখ। প্রায়ই ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে গায় বটে! নরেনকে পেতে দ্বীপেন্দ্রকে বলা হল বাড়িতে নিয়ে আসতে।   গানের তালিম নিতে হবে যে।
    জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে নরেন্দ্রনাথ হাজির। দক্ষিণের বারান্দায় মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে ও রসবাণীর সূক্ষ্ম জ্ঞানে প্রথম গানটি গাইছেন। আর নরেন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আশ্বস্থ করছেন দু'একবার প্র্যাকটিস করলেই গানটি উঠে যাবে।
         মুহূর্তে নরেন্দ্রনাথ বললেন তার আর দরকার নেই। শুনে শুনেই গানটি আয়ত্বে এসে গেল। নরেন্দ্রনাথ গানটিকে অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে রবীন্দ্রনাথকেও ছাপিয়ে গাইলেন। রবীন্দ্রনাথতো শুনে থ'। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এক বোদ্ধা আরেক বোদ্ধার দিকে।
        ঠাকুর বাড়ির দুটি গানে খুব শান্তি পেতেন নরেন্দ্রনাথ। একটি দ্বীজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা-
    'অনুপম মহিম পূর্ণ ব্রহ্ম কর ধ্যান।'
    আর অপরটি রবীন্দ্রনাথের। যেমন,
   'মহাসিংহাসনে বসি শুনিছ হে বিশ্ব পিতা/তোমার রচিত ছন্দে মহান বিশ্বের গীত।/মর্ত্যের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কন্ঠ্য লয়ে।/আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপণীত।/কিছু নাহি চাহি দেব, কেবল দর্শন মাগি।/তোমারে শোনাব গীত, এসেছি তাহারি লাগি।...' - এই গান গাইতে গাইতে নরেন্দ্রনাথ খুব কেঁদে উঠতেন। গভীর ধ্যানের সঙ্গে এই গান মিশে যেত। এই গানেই নরেন্দ্রনাথ খুঁজে পেতেন, প্রাচীন ভারতের ঋষি-মন্ত্র। কি প্রত্যয়! কি ভক্তি, প্রেম,ও আত্ম সমর্পণের আকূতি!
  ব্রাহ্মসমাজই তাঁদের মিলন সেতু ছিল। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবেরও ব্রাহ্মমমাজে যাতায়াত ছিল। ব্রাহ্মসমাজ মতবিরোধ থেকে ত্রিখন্ডিত হলেও নরেন্দ্রনাথের যাতায়াত ছিল সর্বত্রগামী। উপণিষদের উপাসনা মন্ত্র ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের ব্রহ্মোপাসনার একমাত্র উপায়। ব্রাহ্মসমাজ সেঁতু।
    ইতিমধ্যে নরেন্দ্রনাথের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে পৌঁছে যাওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনা নিয়ে পরের পর্ব।                                 
                ( চলবে )

    @ copyright reserved for Mridul Kumar Das. 


১০টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো বিষয় নিয়ে লিখছো।চালিয়ে যাও ভাই।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...